জাতীয় কন্যাশিশু দিবস আজ
তিমিরেই মেয়ের ‘নিরাপদ পৃথিবী’
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঘর কিংবা বাইরে-কোথাও নিরাপদ নয় কন্যাশিশু। অনেক ক্ষেত্রে আপনজনের কাছেই তারা যৌন নির্যাতনসহ নানা সহিংসতার শিকার হচ্ছে। ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, বাল্যবিবাহ, সাইবার সহিংসতা ও শারীরিক শাস্তি-সব মিলিয়ে দিনদিন তিমিরে ঘিরছে মেয়ের নিরাপদ পৃথিবী। তথ্য বলছে, প্রতিদিন গড়ে ২ দশমিক ১৫টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। অথচ শিশু সুরক্ষায় নানা আইন থাকলেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য এখনো অধরা।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের আগস্টে দেশে ২৫২ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার ৫৪ জনের ৩৬ জনই কন্যাশিশু। ৮ কন্যাশিশু সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে দুজনকে। ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ১১ জনকে। যৌন সহিংসতার শিকার ২৪ জন এবং সাইবার সহিংসতার শিকার হয়েছে চারজন।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আজ পালিত হচ্ছে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস। সরকার ২০০০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর দিবসটি পালনের ঘোষণা দেয়। দিবসটির মূল ভিত্তি কন্যাশিশুর সুরক্ষা। তবে এবার ১১ অক্টোবর দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়। ওইদিন বিশ্ব কন্যাশিশু দিবস। জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সঙ্গে যৌথভাবে দিবসটি পালন করা হবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রওশন আরা বেগম।
এছাড়া দিবসটি বেসরকারি বিভিন্ন নারী সংগঠন, মানবাধিকার সংস্থা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন পালন করবে।
দেশে ১৮ বছরের কম বয়সি শিশু ৫ কোটি ৮৭ লাখ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফ বাংলাদেশের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মোট শিশুর প্রায় অর্ধেকই মেয়ে। এ সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৯৩ লাখ। কিন্তু তাদের একটি বড় অংশই নিরাপত্তা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু হারিয়ে গেছে পুলিশের সাধারণ ডায়েরি অনুযায়ী। অর্থাৎ প্রতি ১৭ মিনিটে এক শিশু হারিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাওয়া শিশুদের মধ্যে অনেকেই মেয়ে। স্বজনরা পোস্টার লাগিয়ে খোঁজ করেন; দীর্ঘ সময় পর সেগুলো ঝাপসা হয়ে যায়, গুটিয়ে আসে পুলিশের তদন্তও।
শিশু নির্যাতনের চিত্রও উদ্বেগজনক। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, জুলাইয়ে শিশুহত্যার ঘটনা ছিল ৫২টি, আগস্টে তা বেড়ে হয়েছে ৯১টি। সংঘবদ্ধ ধর্ষণ সাত থেকে বেড়ে ১২টি, ধর্ষণ ও হত্যা তিন থেকে পাঁচটি এবং বলাৎকার পাঁচ থেকে সাতটিতে দাঁড়িয়েছে। জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ বেড়েছে ৭২ শতাংশ এবং হত্যা প্রায় ৭৫ শতাংশ।
কন্যাশিশুর আরেক বড় ঝুঁকি বাল্যবিবাহ। বিবিএস ও ইউনিসেফের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে অনুযায়ী, দেশে ১৮ বছরের কম বয়সি মেয়েদের বিয়ের হার ৫৬ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি দুই মেয়ের একজন বাল্যবিবাহের শিকার। বাল্যবিবাহের কারণে কিশোরী মাতৃত্বও বাড়ছে; কিশোরী মায়েদের সন্তান জন্ম দেওয়ার হার প্রতি হাজারে ৯২।
অপরাজেয় বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ওয়াহিদা বানু বলেন, ‘শিশু অধিকার ঘরে-বাইরে সর্বত্রই লঙ্ঘিত হচ্ছে।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুল ইসলাম খান বলেন, সমাজ-রাষ্ট্রে কন্যাশিশুর অধিকার বাস্তবায়নে বেশ উদাসীনতা রয়েছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, কন্যাশিশুর অধিকার বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
নারী উন্নয়ন শক্তির নির্বাহী পরিচালক ড. আফরোজা পারভীন যুগান্তরকে বলেন, কন্যাশিশুদের নিয়ে অভিভাবকরা বেশ চিন্তিত। তবে অভিভাবকদের পাশাপাশি কন্যাশিশুদেরও সাহসী হতে হবে। তাদের ‘না’ বলতে শিখতে হবে। যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে চিৎকার ও প্রতিবাদ করতে হবে। যে কোনো ধরনের নিগ্রহের শিকার হলে তা অভিভাবকদের জানাতে হবে।

