জুলাইয়ে কুষ্টিয়ায় ৬ হত্যা
পলাতক হানিফের মৃত্যুদণ্ড
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
মাহবুবউল আলম হানিফ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই মামলার অপর তিন আসামিকে আমৃত্যু সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দণ্ডিত এই চার আওয়ামী লীগ নেতার অর্ধেক সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেওয়া হয়েছে।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ বৃহস্পতিবার এ রায় ঘোষণা করেন। এই ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন-বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
আমৃত্যু কারাদণ্ডে দণ্ডিতরা হলেন-কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান, জেলা সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী এবং সাবেক সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতা। দণ্ডিত চারজনই পলাতক রয়েছেন। রায়ে এক অভিযোগে হানিফকে মৃত্যুদণ্ড এবং দুই অভিযোগে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মামলার অপর তিন আসামিকে এক অভিযোগে আমৃত্যু সশ্রম কারাদণ্ড এবং দুই অভিযোগে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দণ্ডিতদের স্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করে তা বিক্রির মাধ্যমে পাওয়া অর্থ জুলাই ফাউন্ডেশন বা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ সংস্থার মাধ্যমে গণ-অভ্যুত্থানের হতাহতদের ক্ষতিপূরণ হিসাবে দিতে বলা হয়েছে রায়ে।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, আদালত এই রায়কে অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে মনে করেছেন। আমরা জুলাই শহীদদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছি। অন্যদিকে মাহবুবউল আলম হানিফসহ চারজনের রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সরকারি খরচে নিয়োগ পাওয়া আইনজীবী মো. আমির হোসেন।
এদিন দুপুর ১২টায় এ মামলার রায় ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল। এ সময় উভয়পক্ষে বিপুলসংখ্যক আইনজীবী, সাংবাদিক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন এজলাসে উপস্থিত ছিলেন।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ, ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের একদফা দাবিতে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে রাজপথে নামেন কুষ্টিয়ার বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। সকাল ১০টার দিকে হাজারও ছাত্র-জনতা শহরের হাসপাতাল মোড়ে জড়ো হয়ে চৌড়হাস থেকে মজমপুরের দিকে শান্তিপূর্ণভাবে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু হানিফের পরিকল্পনা ও নির্দেশনার ধারাবাহিকতায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালান আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
এ সময় তাদের ছত্রছায়া দেয় পুলিশ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশের সঙ্গে একত্রে গুলি চালান তারা। অভিযোগ অনুযায়ী, ৫ আগস্ট দুপুর দেড়টা থেকে বিকাল ৪টার মধ্যে কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন স্থানে গুলিতে ছয়জন নিহত হন। তাদের মধ্যে আশরাফুল ইসলাম বক চত্বরের প্রায় ৫০ গজ উত্তরে, সুরুজ আলী বাবু বার্মিজ গলিতে, আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন ও উসামা হরিপুরগামী সড়কে আড়ংয়ের সামনে, বাবলু ফরাজী তুলাপট্টির গলিতে এবং ইউসুফ শেখ ফায়ার সার্ভিসের বিপরীত দিকে সড়কে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। এসব হত্যাকাণ্ডে হানিফ, সদর উদ্দিন, আজগর ও আতাউরের সংশ্লিষ্টতা মিলেছে বলে দাবি প্রসিকিউশনের। আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, নির্যাতন, উসকানি, প্ররোচনা, সহায়তা ও হত্যার নির্দেশ দেওয়ার মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ২৫ মার্চ এই মামলার তদন্ত শুরু হয়েছিল। একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে তদন্ত সংস্থা। পরে ট্রাইব্যুনালে ৬ অক্টোবর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দেয় প্রসিকিউশন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ২ নভেম্বর এই মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। গত বছরের ৮ ডিসেম্বর সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে এই মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। সেদিনই সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।
চলতি বছরের ২৩ এপ্রিল এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। মোট ১৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ হয়। এ মামলায় যুক্তিতর্ক শেষ হয় ১০ জুন। সেদিনই ট্রাইব্যুনাল মামলাটি রায় ঘোষণার অপেক্ষায় রাখেন। পরে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আরও সাক্ষী ও নথিপত্র হাজির করা হয়। নতুন সাক্ষী, নথিপত্রের ওপর রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে। ৭ অক্টোবর যুক্তিতর্ক সমাপ্ত হয়। এরপর আবার মামলাটি রায় ঘোষণার অপেক্ষায় রাখা হয়। গত মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনাল-২ আদেশ দেন, বৃহস্পতিবার এ মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। সে অনুযায়ী রায় হলো।
আসামিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও বিলিবণ্টন প্রক্রিয়া সম্পর্কে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আসামিদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্তের সুস্পষ্ট আদেশ হয়েছে। এটি জুলাই ফাউন্ডেশন বা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ সংস্থার মাধ্যমে বিক্রি করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে বিলিবণ্টন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
রায় প্রকাশের পর আমরা সরকারের কাছে চিঠি লিখব, যাতে এই সম্পত্তিগুলো আয়ত্তে নিয়ে বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়। আসামিদের কার সম্পত্তি কোথায় আছে, সেটা সরকার খুঁজে বের করে দেখবে। আসামিরা বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, মামলার শুনানির সময় গ্রেফতারি পরোয়ানা ও পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, তারা দেশের বাইরে রয়েছেন। তাদের গ্রেফতার ও ফিরিয়ে আনার জন্য যাবতীয় আইনি প্রক্রিয়া বজায় রাখা হবে। মাহবুবউল আলম হানিফসহ চারজনের সরকারি খরচে (স্টেট ডিফেন্স) নিয়োগ পাওয়া আইনজীবী মো. আমির হোসেন
বলেন, ‘আপনারা (সাংবাদিক) সবাই উপস্থিত থেকে রায় শুনেছেন। রায় সম্পর্কে আমার কিছু বলার নেই।
তিন অভিযোগই প্রমাণিত: মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনা হয়। তিনটি অভিযোগই প্রমাণিত হয়েছে। প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৫, ১৭ ও ৩০ জুলাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে উপস্থিত থেকে তার (কাদের) উসকানিমূলক বক্তব্যকে সমর্থন করেন হানিফ। এ ছাড়া ২৯ জুলাই জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনা সভায় আন্দোলনকারীদের জামায়াত, সন্ত্রাসী, সাম্প্রদায়িক ট্যাগ দিয়ে হত্যা ও নির্যাতনের নির্দেশ, উসকানি, প্ররোচনা ও সহায়তা দেন তিনি।
দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, হানিফের নির্দেশে ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে সদর উদ্দিন খান, আসগর আলী ও আতাউর রহমানসহ অন্য আওয়ামী লীগের নেতারা সভা করেন। সে সভায় নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসাবে উল্লেখ করা হয়। সভা থেকে কুষ্টিয়া শহরে আন্দোলন দমনে সর্বোচ্চ বল প্রয়োগের জন্য আওয়ামী সন্ত্রাসীদের নির্দেশ দেওয়া হয়।
তৃতীয় অভিযোগ হলো, এই মামলার চার আসামির নির্দেশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গসংগঠনের সন্ত্রাসীরা ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালায়। তাদের গুলিতে সেদিন ছয়জন শহীদ হন। তারা হলেন আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী, আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, মো. উসামা, বাবুল ফরাজী ও ইউসুফ শেখ।
