সিপিডির সংলাপে বক্তারা
চার খাতে সংস্কার জরুরি
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সময়সীমা পিছিয়ে দিতে জাতিসংঘ যে ব্যতিক্রমী সুযোগ দিয়েছে, সেই অতিরিক্ত সময় কৃতিত্বের সঙ্গে কাজে লাগাতে হবে। অন্যথায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যেহেতু প্রধানমন্ত্রীর চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘ সাড়া দিয়েছে, তাই এটি যথাযথ বাস্তবায়ন করা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব। এ জন্য চার খাতে সংস্কার জরুরি। রোববার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ : জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত ও আমাদের পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক মিডিয়া সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত এ সংলাপে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ সভাপতিত্ব করেন। এতে সংস্থার সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান ও অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এলডিসি উত্তরণের সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ নয়; এটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ঝুঁকি, বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ বাড়তি সময় দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করেছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনে এককভাবে সময় বাড়ানোর কারণ ছিল না। অর্থনীতির দুর্বলতা ও বহিস্থ অভিঘাত মোকাবিলার সক্ষমতা কমে যাওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি বলেন, উত্তরণের মানদণ্ড শিথিল করা হয়নি; বরং নির্ধারিত মানদণ্ড ধরে রাখার মতো টেকসই সক্ষমতা তৈরির জন্য বাংলাদেশকে অতিরিক্ত সময় দেওয়া হয়েছে। ফলে এ সময়ের মধ্যে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার কাজ এগিয়ে নিতে হবে। এ দায়িত্ব শুধু অর্থ মন্ত্রণালয় বা অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। সরকারের সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সরকারের প্রতিশ্রুত সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নেতৃত্ব প্রয়োজন।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এলডিসি উত্তরণকে জাতীয় সংসদে নিয়ে যাওয়া উচিত। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরি করতে হবে। সর্বদলীয় সংসদীয় কাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাবও দেন তিনি। সংস্কারের চারটি ক্ষেত্রকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন। এগুলো হলো-সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা এবং পণ্য পরিবহণ ও সরবরাহব্যবস্থা। রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং সরকারি ব্যয়ের মান উন্নত করা জরুরি। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সীমাবদ্ধতা কাটাতে হবে। জোর দিয়ে তিনি বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের আগেই-রপ্তানির বিপরীতে নগদ প্রণোদনাসহ-স্বল্পোন্নত দেশ হিসাবে প্রাপ্ত বিশেষ সহায়তাগুলো চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে তা প্রত্যাহার করতে হবে। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচকে ভালো করলেও উন্নয়নের সুফল সবাই সমানভাবে পাচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ দেশের উচ্চমাত্রার বৈষম্য। তাই এলডিসি উত্তরণের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি প্রতিযোগিতামূলক রাষ্ট্র গড়ে তোলা-যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং সাধারণ মানুষও উন্নয়নের সুফল ভোগ করতে পারবে। প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং বিভিন্ন খাতে শিল্পায়ন বাড়াতে হবে।
অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এলডিসি উত্তরণকে শুধু বিদ্যমান বাণিজ্যসুবিধা ধরে রাখার বিষয় হিসাবে দেখলে চলবে না; বরং দেশের অর্থনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন আনার সুযোগ হিসাবে নিতে হবে। উত্তরণের পর যে সব বাণিজ্য সুবিধা কমে যেতে পারে, সেগুলোর প্রভাব মোকাবিলায় এখন থেকে প্রস্তুতি নিতে হবে। একই সঙ্গে নতুন বাজার তৈরি, পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং রপ্তানি সক্ষমতা উন্নয়নে উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি বলেন, তৈরি পোশাকের বাইরে রপ্তানি সম্প্রসারণে ম্যান-মেড ফাইবারভিত্তিক পণ্যসহ সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সেবা খাতের রফতানির সুযোগও কাজে লাগাতে হবে।
‘বাংলাদেশ রিফর্ম ট্র্যাকার’-এর মাধ্যমে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি পর্যবেক্ষণ শীর্ষক পৃথক মূল্যায়ন উপস্থাপন করেন সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এলডিসি উত্তরণ-সংশ্লিষ্ট ২৩টি সংস্কার প্রস্তাব বর্তমানে পর্যবেক্ষণ করছে সিপিডি। তিনি আরও বলেন, উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা ধরে রাখা, বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়ন, শ্রমমান উন্নয়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং শিল্প অবকাঠামো শক্তিশালী করা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
