রম্য রচনা
হাসতে হাসতে মার্ক টোয়েন
Advertisement
সাঈদ বারী
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছেন, যারা হাসির গল্প লেখেন। আবার এমনও অনেকে আছেন, যাদের নিজের জীবনই একেকটি হাসির গল্প। মার্ক টোয়েন দ্বিতীয় দলের মানুষ। তিনি কৌতুক লিখতেন, ঠিকই; কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, তিনি কৌতুকে বাঁচতেন। তার জীবনের দিকে তাকালে মনে হয়, ঈশ্বর তাকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন মানুষকে হাসানোর জন্য। আর তিনি সুযোগ পেলেই সেই দায়িত্ব পালন করেছেন—কখনো কলম দিয়ে, কখনো মুখের কথায়, কখনো আবার নিজের বিপদকে নিয়েই।
মার্ক টোয়েনের আসল নাম স্যামুয়েল ল্যাংহর্ন ক্লেমেন্স। কিন্তু পৃথিবী তাকে চেনে ছদ্মনামে। নাবিকদের ভাষায় Mark Twain মানে নদীর গভীরতা দুই ফ্যাদম— জাহাজ চলার জন্য নিরাপদ। মজার ব্যাপার হলো, তার লেখাও ঠিক তেমনই। উপরিভাগে হাসি, ভেতরে গভীরতা। পাঠক প্রথমে হেসে ওঠেন, তারপর একটু ভেবে নেন— আরে, লোকটা তো কথার ছলে বড় সত্যি কথা বলে গেল!
মার্ক টোয়েন সম্পর্কে সবচেয়ে বিখ্যাত ঘটনাটি সম্ভবত তার মৃত্যুর গুজব নিয়ে। একসময় একটি সংবাদপত্র ভুল করে তার মৃত্যুসংবাদ ছাপিয়ে দেয়। অনেকেই শোক জানাতে শুরু করেন। টোয়েন অবশ্য শোক করার কোনো কারণ খুঁজে পেলেন না। কারণ, তিনি দিব্যি বেঁচে আছেন! পরে তিনি পত্রিকায় একটি ছোট্ট বার্তা পাঠালেন—‘আমার মৃত্যুর খবরটি অত্যন্ত অতিরঞ্জিত।’
মাত্র কয়েকটি শব্দ। কিন্তু সেই কয়েকটি শব্দই ইতিহাস হয়ে গেছে। অন্য কেউ হলে হয়তো ক্ষুব্ধ হতেন, মানহানির মামলা করতেন কিংবা দীর্ঘ প্রতিবাদপত্র লিখতেন। মার্ক টোয়েন বরং মৃত্যুকে নিয়েই রসিকতা করলেন। যেন বলছেন, মানুষ একবারই মরে; সংবাদপত্র চাইলে তাকে দু-তিনবারও মেরে ফেলতে পারে!
একবার এক ভদ্রমহিলা তাকে বললেন, ‘মিস্টার টোয়েন, আপনার সব বই আমি পড়েছি।’
এ ধরনের কথা শুনে অধিকাংশ লেখক আপ্লুত হন। কেউ কেউ আবেগে পাঠককে জড়িয়ে ধরেন। কিন্তু টোয়েনের মাথায় অন্য হিসাব চলছিল।
তিনি বিনীত মুখে বললেন, ‘তা হলে নিশ্চয়ই আপনিই সেই ব্যক্তি, যিনি আমার সব বই কিনেছেন!’
বাক্যটি শুনে উপস্থিত সবাই হেসে উঠল। কারণ, লেখকরা বই লেখেন ঠিকই, কিন্তু সব বই যে বিক্রি হয়, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। নিজের বইয়ের বিক্রি নিয়েও যে একজন লেখক এমন নির্মম আত্মবিদ্রুপ করতে পারেন, সেটাই তাকে আলাদা করে দেয়।
মার্ক টোয়েন বক্তৃতা দিতে খুব ভালোবাসতেন। তবে বক্তৃতার চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন শ্রোতাদের সঙ্গে খেলা করতে।
এক অনুষ্ঠানে তাকে বলা হলো, মাত্র পনেরো মিনিট কথা বলতে হবে। তিনি রাজি হলেন। কিন্তু কথা বলতে শুরু করে এমন গল্পের জাল বুনলেন যে সময় কখন পেরিয়ে গেল, কেউ টেরই পেল না। আয়োজকরা বারবার ঘড়ি দেখছেন। শেষে একজন সংকেত দিলেন।
টোয়েন হেসে বললেন, ‘চিন্তা করবেন না। আমার কাছে সময়ের অভাব নেই। অভাব আপনাদের।’
শ্রোতারা হেসে কুটিকুটি। আয়োজকরা একটু বিব্রত। কিন্তু টোয়েনের কাছে এই বিব্রতবোধও ছিল হাসির উপকরণ।
তার পোশাক-আশাক নিয়েও বহু গল্প আছে। একবার এক ভদ্রলোক মন্তব্য করলেন, ‘আপনার কোটটা তো বেশ পুরোনো!’
অন্য কেউ হলে নতুন কোটের অর্ডার দিতেন। টোয়েন দিলেন নতুন উত্তর।
বললেন, ‘কোটটা পুরোনো নয়। যারা আমাকে বারবার দেখছেন, তাদের চোখই পুরোনো হয়ে গেছে।’
এ উত্তর শুনে বোঝা যায়, তিনি কখনো সরাসরি আত্মরক্ষায় যেতেন না। বরং এমন একটি বাক্য বলতেন, যাতে সমালোচকও হেসে ফেলতে বাধ্য হন।
মার্ক টোয়েনের রসবোধের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল— তিনি নিজেকে কখনো অতিরিক্ত গুরুত্ব দিতেন না।
এক তরুণ লেখক একদিন এসে বললেন, ‘আমি আপনার মতো বড় লেখক হতে চাই।’
টোয়েন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, ‘তাহলে আমার মতো ভুল করতেও প্রস্তুত থাকুন।’
তরুণটি অবাক।
টোয়েন আবার বললেন, ‘মানুষ আমার বই দেখে আমাকে বিচার করে। আমি নিজেকে বিচার করি আমার ভুলগুলো দিয়ে।’
কথাটির মধ্যে হাসি যেমন আছে, তেমনি আছে জীবনের গভীর শিক্ষাও। বড় মানুষরা নিজেদের সাফল্য নিয়ে যতটা ভাবেন, তার চেয়ে বেশি ভাবেন নিজেদের সীমাবদ্ধতা নিয়ে।
মার্ক টোয়েনের জীবনে এমন অসংখ্য ঘটনা ছড়িয়ে আছে। তিনি যেন পৃথিবীর সব বিব্রতকর পরিস্থিতিকে হাসির অনুষ্ঠানে পরিণত করার এক অদ্ভুত ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছিলেন। কারও কটাক্ষ, কারও ভুল, এমনকি নিজের দুর্ভাগ্যও তার কাছে ছিল রসিকতার কাঁচামাল।
এ কারণেই তার কৌতুক আজও পুরোনো হয়নি। সময় বদলেছে, পোশাক বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে; কিন্তু মানুষ এখনো অহংকার করে, ভুল করে, গুজব ছড়ায়, অন্যকে ছোট করতে চায়। আর মার্ক টোয়েন সেই চিরন্তন মানুষকেই আয়নায় দেখিয়ে দেন—তবে আয়নাটিতে কাচের বদলে বসানো থাকে এক চিলতে হাসি।
তাই তাকে শুধু একজন রম্যলেখক বললে কম বলা হয়। তিনি এমন একজন শিল্পী, যিনি মানুষের হাসির ভেতরেই মানুষের দুর্বলতা, বোকামি আর আত্মঅহমিকাকে ধরে ফেলতেন। আর সে কারণেই তার জীবনের ঘটনাগুলো আজও গল্প নয়, জীবন্ত কৌতুক; রসিকতা নয়, সাহিত্য।
