বিশ্ব ডাক দিবসের প্রতি সমর্থন জানিয়ে একটি অব্যবহৃত ও জরাজীর্ণ ডাকবাক্সের সাক্ষাৎকার
‘শরীর থেকে বাকি মরিচাগুলো ঝরে পড়লেই ভবলীলা সাঙ্গ হবে’
Advertisement
শফিক হাসান
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আগামী ৯ অক্টোবর বিশ্ব ডাক দিবস। এ উপলক্ষ্যে কচ্ছপ-খরগোশ প্রাণীগোষ্ঠী কর্মসূচি দিতে পারে। আবার না-ও দিতে পারে। সব তাদের মর্জি। কেমন আছে বর্তমানের ডাক বিভাগ? বিস্তারিত জানতে অকেজো ও জরাজীর্ণ একটি ডাকবাক্সের মুখোমুখি হয়েছে বিচ্ছু। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একদা বেয়ারিং চিঠি পাঠিয়ে মানুষকে উত্ত্যক্তকারী শফিক হাসান
* বিশ্ব ডাক দিবসকে সামনে রেখে ডাকবাক্স হিসাবে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
▶ প্রতিক্রিয়া নয়, জানাতে হবে অতি-ক্রিয়া। আমাদের কার্যক্রম বলতে গেলে এখন নেই-ই। ডাক বিভাগের মাধ্যমে চিঠি চালাচালি চলে গেছে বাতিলের খাতায়। আমি কত আগেই পরিত্যক্ত হয়ে গেছি। এখন শুধু দিনে দিনে ক্ষয় হচ্ছি। শরীর থেকে বাকি মরিচাগুলো ঝরে পড়লেই ভবলীলা সাঙ্গ হবে। বয়সজনিত কারণে নিজের পোস্টকোড নম্বরও মনে নেই। এমন প্রশ্ন করবেন না, যাতে অপমানিত বোধ করি।
* যৌবনের দিনগুলো কেমন ছিল?
▶ আহা, কী সব দিন কাটিয়ে এসেছি। ছেলেমেয়েরা পরস্পরকে চিঠি লিখত। তাদের মধ্যে প্রেম-বিরহ-খুনসুটিসহ কত মিষ্টি-মধুর সম্পর্ক ছিল। সব চিঠিই আমার বুকে টুপটুপ শব্দে আছড়ে পড়ত। সময় বাঁচানোর ইচ্ছা থেকে অনেকেই পোস্ট অফিসে না গিয়ে পোস্টবক্স ব্যবহার করত। যেমন চিঠিই আসুক, কী যে ভালো লাগত! অনেকটা আপনাদের পোলাও-কোরমা খাওয়ার ফিলিংস পেতাম।
* প্রেমপত্র বিলুপ্ত হওয়ার কারণেই কি মায়া-মমতা উঠে গেল?
▶ মানুষ এখন রস-কষহীন প্রেমশূন্য হয়ে পড়েছে। অন্যের প্রতি প্রেম বলতে গেলে শূন্যের কোঠায়। অথচ আশি-নব্বই দশকের ছেলেমেয়েরাও ভীষণ রোমান্টিক ছিল। পরস্পরকে ভালোবাসত। বন্ধুর প্রেমিকা কিংবা বান্ধবীর স্বামী ভাগিয়ে নেওয়ার পাঁয়তারা করত না। বর্তমানে অনেক জায়গায় বাবা-মায়েরই মূল্য নেই। অন্যদের কী সম্মান দেবে!
* পত্রমিতালি কেমন উপভোগ করতেন?
▶ পত্রমিতালিতে জব্বর মজা ছিল রে, ভাই। উপভোগ করতাম। কতজনের চিঠি পড়েও ফেলেছি। অবশ্য চিঠি বুকে-পেটে পড়া মাত্রই বুঝে যেতাম ভেতরে কী লেখা হয়েছে। তৃতীয় চক্ষুর ক্ষমতা ছিল প্রবল। পত্রমিতালি থেকে সরে এসে এ জাতি পত্রাঘাত দিতে শুরু করল। একটা সময়ে হুমকিপত্র দেওয়া শুরু হলো। নিরীহ মানুষকে চিঠি দিয়ে বলা হতো ‘অত টাকা রেডি রাখবি। নইলে তুই শেষ।’ আমরা নিষ্প্রাণ বস্তু। চাইলেও অসভ্যতা রোধ করতে পারিনি।
* চিঠির বিবর্তনকে কোন দৃষ্টিতে দেখছেন?
▶ অবশ্যই কুদৃষ্টিতে দেখব। চিঠির বিকল্প হয়ে এসেছে এসএমএস। সব বিবর্তন কল্যাণকর নয়। আগেকার লোকজন মনের মাধুরী মিশিয়ে লিখত। তাদের মনে কবিত্ব ভর করত। ভাষার মাধুর্য ছিল উপভোগ করার মতো। এখন বাংলিশ ভাষা আমদানি হয়েছে। তাও অনেকে এত শর্টকাটে লেখে লজ্জাই পেতে হয়। এখন কাউকে ধন্যবাদ দিলে সংক্ষেপে লেখা হয় tnx। গুড নাইট লেখা হয় gdn8। এগুলো সর্বনাশা দৃষ্টান্ত।
* বেয়ারিং চিঠির বিষয়টা কেমন ছিল?
▶ বেয়ারিং চিঠি বড় ধরনের ফাজলামি ছিল। পত্রপ্রেরক মাশুল পরিশোধ করত না। মাশুল গুনতে হতো প্রাপককে। দেখা যেত, প্রাপকের জন্য এ চিঠি অদরকারি। ‘আজাইরা আলাপ’ জুড়ে দেওয়ার জন্য কেউ কেউ এটা করত। অবশ্য সব বেয়ারিং চিঠি খারাপ ছিল, এমন নয়। এখন আপনারা মোবাইল ফোনে ব্যালেন্স না থাকলে রিকোয়েস্ট কল দেন না? বিষয়টা তা-ই।
* নাটকে সিনেমায় মঞ্চে চিঠি নিয়ে অনেক গল্প ছিল...
▶ শুধু কি গল্প-কাহিনি! মনজুড়ানো সব গানও ছিল। আমার প্রিয় দুইটা গানের কথা বলি— চিঠি দিও প্রতিদিন/চিঠি দিও/নইলে থাকতে পারব না...। নাই টেলিফোন নাইরে পিয়ন নাইরে টেলিগ্রাম/বন্ধুর কাছে মনের খবর কেমনে পৌঁছাইতাম...। চিঠি যেমন মানুষকে কাছে আনত আবার দূরেও ঠেলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখত। ওই সময়ের গানগুলো ছিল মন উথালপাথাল করা। বর্তমানের গানে তেমন আবেদন খুঁজে পাই না। বেয়ারিং চিঠির মতো পানসে মনে হয়!
* অতীতের কথা ভেবে খারাপ লাগে?
▶ মন ভালো হওয়ার মতো কিছু অবশিষ্ট আছে? মানবকুল এখন ইমেইল পাঠাতে শিখেছে। হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো, মেসেনজারসহ কত ধরনের কত অ্যাপস এসে গেছে! জন্মিলে মরিতে হবে/অমর কে কোথায় কবে! নিজের আসন্ন মৃত্যুর জন্য মন খারাপ করি না। ভাবছি মানবকুলের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা। এরা জানতেই পারবে না একেকটা চিঠিতে কী পরিমাণ আবেগ, মায়া-মমতা জড়ানো ছিল। পাঠাভ্যাসও উঠে গেছে। থাকলে প্রজন্মকে অন্তত ‘একাত্তরের চিঠি’ বইটা পড়তে বলতাম।
* আপনি অনেক ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী...
▶ অনাদরে-অবহেলায় পথপার্শ্বে পড়ে আছি, সাক্ষীগোপাল হয়ে। আগেরকার দিনের আন্দোলন-সংগ্রামেও চিঠির ব্যবহার ছিল প্রচুর। সেসব বলতে গেলে প্রবন্ধ হয়ে যাবে। কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছি এখনো। অবশ্য মানবসমাজে এখন কেউ সাক্ষী হতে চায় না। সাক্ষী মানেই বিপদ, হামলা ও মামলায় পড়ার আশঙ্কা। আমাদের মুখ নেই, তাই ভয়ও নেই।
* কোন ধরনের চিঠি আপনাকে আনন্দ দিত?
▶ অবশ্যই চাকরির চিঠি। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, এখন চাকরি হওয়া বা না হওয়ার ক্ষেত্রে চিঠির ব্যবহার নেই। সব ফোনেই হয়ে যায়। মোবাইল ফোন দিয়েছে বাগাড়ম্বরের ক্ষমতা, বিপরীতে কেড়ে নিয়েছে আবেগ-অনুভূতি। সত্য বলার সক্ষমতা। আমার শেষ কথা— অন্যকে চিঠি দিও, ইমেইল নয়!
