স্বাধীনতা আর উপনিবেশায়ন
Advertisement
ড. মাহবুব হাসান
প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
এ দুটি শব্দের মধ্য সম্পর্ক কী রকম তা আমাদের বুঝে নেওয়া দরকার। আসলেই এ দুটি শব্দের মধ্যে কি কোনো মিল-মোহব্বত আছে কি নেই, চেতনাগত প্রেম আছে কি নেই, ঠিক যেমনটা আছে উপনিবেশায়িত দেশগুলোর মধ্যে কমনওয়েলথ পিরিতির বন্ধন। ১৯০ বছর ধরে শোষণের পরও কমনওয়েলথ হচ্ছে সেই প্রেমগাথা যা প্রমাণ করবে ঔপনিবেশিক শাসক আমাদের শুধু ডেভেলপমেন্ট দিয়ে আমাদের উন্নত করেছে। আবার উপনিবেশ ছেড়ে দেওয়ার পরও যাতে শোষণ করা যায় সেই গিট্টুর নাম রেখেছে কমনওয়েলথ। ওই শব্দের মানে হচ্ছে ‘একই সম্পদ’। অর্থাৎ তোমার বউ আমার বউ, আমার বউ আমার বউ। এ জন্যই প্রশ্নটি তুলেছি স্বাধীনতা আর উপনিবেশায়নের মধ্যে সম্পর্ক কী। আমরা কি স্বাধীন হতে পেরেছি?
২.
এই কমনওয়েলথ চিন্তার খেলাটি খেলেছে ভারত ১৯৭১ সালে, মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে শেষমেশ এসে যোগ দিয়ে বলেছে তোমার যুদ্ধ আমার যুদ্ধ। আর আমার যুদ্ধ আমার বিজয়। সেখানে আমাদের কোনো দালিলিক সত্য নেই। আমাদের মুক্তিসেনানি উপস্থিত থাকার পরও ভারতীয় লে. জে. অরোরা মুক্তিবাহিনীর কোনো চিহ্ন রাখেননি সিগনেটরি দলিলে। তার মানে তো এই দাঁড়ায় যে, তোমরা শুরু করনি। যুদ্ধ করেছে ভারতীয় বাহিনী। একটা মিথ্যাকে কেমন করে সত্যে পরিণত করতে হয়, সে ষড়যন্ত্র ১৯৭১ সালেই করেছিল ইন্দিরা গান্ধী ও তার সমর নায়কেরা। জেনারেল মানকশ, জেনারেল অরোরা, কর্নেল শ্যাম সিং বাবাজিসহ তার র্যাংকের অনেকেই। প্রশ্ন করতে পারেন তখন কেন মুক্তিবাহিনী প্রতিবাদ করেনি। এ প্রশ্নের উত্তর আছে মেজর জলিলের প্রতিরোধের মধ্যে। ভারতীয় বাহিনী হেন কোনো সম্পদ নেই যা লুট করেনি। সেই লুটের মালামাল আটক করাতে শেখ মুজিব তাকে জেলে পাঠায়। এ ইতিহাস সবারই জানা। যা জানা নেই তাহলো অর্থসম্পদ সামগ্রী সম্পদ লুটের হিসাব। গনিমতের মাল হিসাবে তারা লুটে নিচ্ছিল। এটাও লুটের অংশ, তাদের পাওনা অংশ, তারা নিয়ে যাচ্ছে তুমি জলিল ঠেকাবার কে? জেলে যাও। তিনি জেলে গেলেন। তার বীরউত্তম খেতাবও বাতিল করা হলো। এটাই হলো মুজিবীয় শাসনের সূচনা।
৩.
আমি মুক্তিসংগ্রামের মাঠের মানুষ। কিন্তু আমার লেখায়ও রেফারেন্স দিতে হয় বড় বা বীরপ্রতীক হাবিবুল রহমান তালুকদার খোকার। যুদ্ধাহত খোকা কিছুদিন আমার সঙ্গে কাটিয়েছেন। বাশাইল যাওয়ার পথে নথখোলা যুদ্ধে তিনি গ্রেনেড হামলার স্প্লিন্টারে মারাত্মকভাবে আহত হন। মুক্তিবাহিনীর হাসপাতালে তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরে তাকে হেড কোয়ার্টারে বদলি করা হয়। ‘খোকার চোখের তারায় ছিল পত পত করে উড়তে থাকা স্বাধীনতা’- লিখেছিলাম, সেই কোনকালে একটি কবিতায়। স্বাধীনতা শব্দটি খুব অবহেলার সঙ্গে ব্যবহার হতে দেখি। শব্দটি যেন খেলনা পুতুলের মতো- খেললে খেললাম, না হলে ভেঙে ফেললাম। না, ওই শব্দ তার তরঙ্গ নিয়ে এমনভাবে আমাদের অন্তর বেঁধে ফেলে যে আমরা এর কেন্দ্র থেকে নড়ে যেতে পারি না। উপনিবেশের দাঁত খুব মিহি ও নরম। মশার শুঁড় যেমন নরম হয়, কিন্তু ঠিকই আমাদের রক্ত শুষে নিতে পারে। ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল ওই মশার মতোই উড্ডীন প্রজাতির শোষক। তারা নানা কায়দায় আজও শোষণ করছে আমাদের। আমরা তো অনেকটাই সরলপ্রাণ মানুষ। যা বলে তাই বিশ্বাস করি। মনে কোনো প্রশ্ন জাগে না। এই মশক সদৃশ শোষকদের হাত থেকে কী করে মুক্ত হব, এবার সে চিন্তা করা যাক।
৪.
যদি কোনো শিশু ইংল্যান্ডে কয়েক বছর বাস করে, তাহলে সে ওই পরিবেশের শিশু হিসাবে বড় হবে। সেই বাংলাদেশি শিশু যখন বাবা-মার সঙ্গে দেশে আসে তখন সেই শিশু কুটকুট করে ইংরেজি বলে। এতে বিস্মিত হয় তার বাংলাদেশি আত্মীয়স্বজন। ওমা! কি জ্ঞানী! যেন পৃথিবীর সব জ্ঞান ইংরেজিতেই আছে। হ্যাঁ আছে-এটাই আমাদের পূর্বপুরুষদের শেখানো হয়েছিল। তোমাদের তো সংস্কৃতি নেই, ইংরেজি শেখ, জ্ঞানী হও, সংস্কৃতিবান হও। তার মানে আমাদের কোনো সংস্কৃতি (কালচার) নেই। আমরা তথাস্তু বলে মাথানত করে দিয়েছি। স্বাধীনতা বোধের উন্মেষ তখনো হয়নি আমাদের। আমরা মিথের মিথ্যা নিয়ে বাস করছি।
আমরা আনকালচার্ড-ব্রিটিশরা এটাই শিখিয়েছিল, যাতে ওই মিথ্যার ভেদ করে আমরা মাথা তুলতে না পারি। মাথা তুলতে পারলেই তো স্বাধীনতার কথা উঠবে। এজন্য তারা আরও কিছু দেশীয় শ্লোক সৃজন করেছিল। তারা হলো জমিদার, তালুকদার, মুৎসুদ্দি শ্রেণি। এসব শিখণ্ড দেশীয়দের কল্যাণ উপনিবেশিক রাজত্ব বহু বছর চালাতে পেরেছে। কিন্তু শাসকের পেট তো অনেক বড়। তার খাইও বড়। সেখানে উৎপাদক কৃষক শ্রেণি দরিদ্র থেকে হতদরিদ্র এবং সর্বহারায় পরিণত হয়েছিল। এরা স্বাধীনতা চাওয়ার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে। সেই দারিদ্র্যই আমাদের প্রথম পরাধীনতা। সেই শেকল ছিঁড়ে বেরিয়ে আমার ক্ষমতা তো অর্থবিত্তের। সেই বিত্ত তো লুটেপুটে চেটে নিয়ে গেছে ব্রিটিশরা।
১৯৭১ সালে আমরা প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু করেছিলাম সেই টানা লুটের বিরুদ্ধেই। লুটেরা গেছে চিরতরে-এমন মিথ্যা ভাবনাই আমাদের মনে আজও বহমান। কিন্তু লুটেরা কোনো এক প্রজাতির নয়, বহুজাতিক ও বহুরূপী। এ বহুরূপী লুটেরা এই স্বাধীন দেশেও আছে। এই লুটতরাজের উৎখাত করতে না পারলে দেশটি প্রকৃত প্রস্তাবে স্বাধীন হতে পারবে না। আমরা আষ্টেপৃষ্ঠে বাধা এক স্বাধীন জাতি।
