Logo
Logo
×

Advertisement

স্বাধীনতা দিবস সংখ্যা

মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠকের পরিণতি

Advertisement

Icon

একেএম শামসুদ্দিন

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠকের পরিণতি

ফাইল ছবি

Advertisement

ইতিহাস আমাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ধারা বুঝতে সাহায্য করে। ইতিহাসের সঠিক মূল্যায়ন তাই অপরিহার্য। তবে এ কথা ঠিক, তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন ছাড়া ইতিহাসচর্চা অর্থহীন। তাই, নিরপেক্ষ এবং বস্তুনিষ্ঠ গবেষণার মাধ্যমে ইতিহাসের নিয়মিত মূল্যায়ন হওয়া উচিত। এ পরিপ্রেক্ষিত বলা যায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস নিয়েও বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা হওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম উপকৃত হয়। গবেষণা যে হচ্ছে না তা নয়। স্বাধীনতার পর থেকে যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় এসেছে, তারা তাদের ভাবাদর্শের ব্যক্তিদের দিয়েই গবেষণার কাজটি করানোর চেষ্টা করেছে। তাতে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। এ কারণে অর্ধ শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস রচনা আজও হয়নি। ব্যক্তিগত পর্যায় এর চর্চা যে হয় না তা নয়। অনেকেই সে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তবে তা যথেষ্ট নয়। এজন্য স্বাধীনতার চুয়ান্ন বছর পরও অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধ কি অনিবার্য ছিল? নাকি, এটি পাক জান্তাদের চাপিয়ে দেওয়া একটি যুদ্ধ! বাংলাদেশের স্বাধীনতার যেমন ধারাবাহিক দীর্ঘ ইতিহাস আছে, তেমনই যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে আগে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে অনুষ্ঠিত ইয়াহিয়া ও শেখ মুজিবের বৈঠক তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

একাত্তরের সেই অগ্নিঝরা মার্চের ১৬ তারিখ, ইয়াহিয়ার সঙ্গে শেখ মুজিবের বৈঠকটি শুরু হয়। পরে আরও কয়েকদফা বৈঠক হয়েছে। তবে প্রথম কয়েকদিন ছিল রুদ্ধদ্বার বৈঠক। বৈঠকে ইয়াহিয়া ও মুজিব ছাড়া আর কেউ ছিলেন না। আলোচনার বিষয়বস্তু তখন অজানা ছিল। প্রথমদিনের আলোচনা শেষে শেখ মুজিব জানিয়েছিলেন, ‘আলোচনা দুই-এক মিনিটের ব্যাপর নয়, যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন। আলোচনা চলবে।’ তবে পত্রিকা মারফত জানা গেছে, প্রথম দিনের বৈঠকে চলমান রাজনৈতিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দ্বিতীয় দিনের রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে শেখ মুজিবকে গম্ভীর দেখা গিয়েছে। আলোচনা সফল হয়েছে কিনা সাংবাদিকরা জিজ্ঞেস করলে তিনি এড়িয়ে যান। এভাবে আরও চার দিন মুজিব-ইয়াহিয়া শীর্ষ বৈঠক চলে। আলোচনার পঞ্চম দিনে জানা যায়, দেশের শাসনতন্ত্র নিয়েও আলোচনা হয়েছে; তবে তখন পর্যন্ত কোনো সমাধান আসেনি। এদিকে যখন আলোচনা চলছে, তখন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিমানযোগে পাকিস্তানি সেনাসদস্য ও শিপিং করপোরেশনের বাণিজ্যিক জাহাজ ‘সোয়াত’-এ করে ভারী অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ আনার খবর পাওয়া যাচ্ছিল। অপরদিকে সেনানিবাস থেকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেনা সদস্যদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে ভাগ করে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে দিয়ে ব্যাটালিয়নগুলোর কমান্ড স্ট্রাকচার ভেঙে দেওয়া হচ্ছিল। এখানেই শেষ নয়, জয়দেবপুরসহ রংপুর ও সৈয়দপুরে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গুলি করে অসহযোগ আন্দোলনকারীদের হত্যা করে। এ ছাড়া ‘সোয়াত’ জাহাজে করে আনা ভারী অস্ত্র ও গোলাবারুদ বাঙালি শ্রমিকরা খালাস করতে অস্বীকার করে প্রতিরোধ গড়ে তুললে পাক সৈনিকরা গুলিবর্ষণ করে কয়েকজন শ্রমিককে হত্যা করে।

‘সোয়াত’ থেকে অস্ত্র খালাসের ঘটনার পর ২৪ মার্চের পূর্ব নির্ধারিত মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক বাতিল হয়ে যায়। মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক চলাকালে অসহযোগ আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী যুব-ছাত্রনেতারা আলোচনায় সব ধরনের আপস-মীমাংসার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেন এবং তাদের চাপের ফলে; পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ করার পরিবর্তে শেখ মুজিব নতুন করে কনফেডারেশন প্রতিষ্ঠার জন্য ইয়াহিয়াকে চাপ দেন। ফলে শঙ্কা তৈরি হয়, ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠক ভেঙে যেতে পারে। তবে এ শঙ্কা মুজিব নিজেই দূর করেন। তিনি সেসময় সাংবাদিকদের জোর দিয়ে বলেন, ‘যথেষ্ট অগ্রগতি না হলে তিনি ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বৈঠক চালিয়ে যেতেন না।’ শেখ মুজিবের এ বক্তব্যের পর আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা অতিউৎসাহী হয়ে দাবি করতে থাকেন, সামরিক সরকার তাদের কনফেডারেশনের প্রস্তাব প্রায় মেনেই নিয়েছে অথবা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। লেখক, সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা মঈদুল হাসান তার লেখা ‘উপধারা একাত্তর মার্চ-এপ্রিল’ বইয়ে উপরোক্ত ঘটনা নিয়ে লেখেন, ২৩ মার্চ ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের এক বিশাল যৌথ সমাবেশে শেখ মুজিব নিজেই বলেন, ‘যে নেতা বিনা রক্তপাতে তার দাবি আদায় করে নিতে পারেন, তিনিই শ্রেষ্ঠ নেতা।’ এর বেশি তিনি সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলেননি। তার সেই বক্তব্যে পরিষ্কার ইঙ্গিত ছিল যে, ইয়াহিয়ার সঙ্গে মুজিবের সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে এবং তা শুধু স্বাক্ষরের অপেক্ষায় আছে। মুজিবের এ বিবৃতি ২৪ মার্চ দৈনিক ইত্তেফাকসহ দেশের প্রায় সব প্রধান সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। পাবলিক লাইব্রেরির আর্কাইভে এসব পত্রিকা এখনো সংরক্ষিত আছে। কেউ ওই দিনের পত্রিকা দেখতে চাইলে সহজেই তা দেখে নিতে পারেন।

শেখ মুজিবের উপরোক্ত বক্তব্যের আলোকে বলা যায়, তিনি যে আলোচনার মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে চেয়েছিলেন, তা বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল আমীন আহম্মেদ চৌধুরী বীরবিক্রম-এর লেখা ‘১৯৭১ ও আমার সামরিক জীবন’ বইয়ের কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা থেকেও আভাস পাওয়া যায়। তিনি তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন, একাত্তরে তিনি চট্টগ্রামে অবস্থিত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সেন্টারে (ইপিআরসি) কর্মরত ছিলেন। তখন ইবিআরসি’র কমান্ড্যান্ট ছিলেন ব্রিগেডিয়ার এম আর মজুমদার। তিনিই ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ। ব্রিগেডিয়ার মজুমদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের একটি গোপন অপারেশন পরিকল্পনা হাতে ধরিয়ে দিয়ে ১৪ মার্চ; তারই অধীনস্থ তৎকালীন ক্যাপ্টেন আমীন আহম্মেদ চৌধুরীকে ঢাকায় তৎকালীন কর্নেল ওসমানীর কাছে পাঠিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, কর্নেল ওসমানী, সত্তরের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকিটে নির্বাচিত সংসদ-সদস্য ছিলেন। অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন সামরিক, আধাসামরিক, পুলিশ ও আনসারে কর্মরত বাঙালি সশস্ত্র সদস্য এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও ইপিআরে কর্মরত অবাঙালি সদস্যদের একটি তুলনামূলক তালিকাও তিনি ক্যাপ্টেন আমীনের সঙ্গে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তুলনামূলক তালিকার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে পাকিস্তানি প্রায় ৮ হাজার সশস্ত্র সদস্যের বিপরীতে পুলিশ ও আনসার সদস্য বাদেই বাঙালি সশস্ত্র সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ১৭ থেকে ১৮ হাজার। এ ছাড়া রংপুরে অবস্থিত ২৯ ক্যাভালরী রেজিমেন্টের (ট্যাংক রেজিমেন্ট) ৫৫টি ট্যাংকসহ পঞ্চাশ শতাংশেরও বেশি বাঙালি সেনাসদস্য ছিলেন। ক্যাপ্টেন আমীন ১৪ মার্চ ঢাকায় কর্নেল ওসমানীর সঙ্গে দেখা করেন। তখন পর্যন্ত পাকিস্তান থেকে বিমানে যে সৈনিক ঢাকায় পৌঁছেছিল তাদের সঙ্গে শুধু নিজস্ব ক্ষুদ্রাস্ত্র ছিল; তাও আবার মাত্র প্রথম সারির অ্যামুনেশনসহ। এসব পাক সেনা সদস্যদের গোলাবারুদ ও ভারী অস্ত্রশস্ত্র মজুত ছিল চট্টগ্রাম বন্দরে ভেড়ানো ‘সোয়াত’ জাহাজে।

ব্রিগেডিয়ার মজুমদারের পরিকল্পনা ছিল, হালিশহরে অবস্থিত ইপিআরের সহায়তায় ইবিআরসি সেনাদের দিয়ে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত পাকিস্তান নৌসেনাদের নিরস্ত্র করা এবং একই সঙ্গে সোয়াত জাহাজ দখল করে পাকিস্তান থেকে আনা ভারী অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিজেদের কব্জায় নিয়ে আসা। তাহলে পাকিস্তানিরা ভারী অস্ত্রের ঘাটতিতে পড়ে যেত। ষোলশহর থেকে অগ্রসর হয়ে ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট চট্টগ্রাম সেনানিবাস আক্রমণ করে সেখানে অবস্থানরত ২০ বেলুচ রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করা হবে। ওদিকে, শুভপুর ব্রিজ উড়িয়ে দিয়ে ফেনী নদী বরাবর ডিফেন্স নেওয়া হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামকে ‘ফার্ম বেইজ’ করে বার্মা সীমান্ত খুলে দেওয়া হবে। বিশাল সমুদ্র ও নদীপথে নিরাপদ ‘লাইন অব কমিউনিকেশন’ বা ‘এল অব সি’ নিশ্চিত করে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে এক দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া। চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরও তখন বাঙালি সৈনিকদের অধীনেই থাকত। তাতে এ বন্দর ব্যবহার করে বৈদেশিক সাহায্যের পথ সহজতর করা সম্ভব হতো। এভাবে ক্রমাগত যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জনের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। তবে এজন্য রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার প্রয়োজন আছে। শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা চালানোর জন্য আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড নেতাদের চট্টগ্রামে অবস্থান করারও প্রযোজন আছে। জেনারেল আমীন তার বইয়ে আরও উল্লেখ করেন, সব শোনার পর কর্নেল ওসমানী আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বের (শেখ মুজিব) সঙ্গে কথা বলে তাকে জানান, “তিনি বাঙালি সেনাদের দুশ্চিন্তার কারণগুলো চিহ্নিত করতে পারছেন, তাদের পরিকল্পনার সারবত্তাও উপলব্ধি করতে পারছেন। কিন্তু সংগত কারণেই তিনি আলোচনায় বসে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানে বিশ্বাসী। তিনি মনে করেন, বিশ্ব জনমত বাংলাদেশের পক্ষে রাখার জন্য আলোচনার কোনো বিকল্প নেই। তা ছাড়া চট্টগ্রাম হলো ‘কর্নার সিটি’। সেখানে তারা গিয়ে কী করবেন।” কর্নেল ওসমানী আরও যোগ করেন, নির্বাচনে বিজয়ী দলের নেতা হিসাবে বঙ্গবন্ধুর কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত না হওয়ার পক্ষেও মত দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করতে পারবেন। এমতাবস্তায়, বাঙালি সেনাদের ‘অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো কার্যক্রমে’ জড়িত না হওয়ার জন্য ওসমানী নির্দেশ দেন। এই যখন পরিস্থিতি তখন, ব্রিগেডিয়ার মজুমদার চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এমআর সিদ্দিকীকে একই অনুরোধ করে শেখ মুজিবের কাছে পাঠান। এমআর সিদ্দিকী দেখা করে এসে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু বলেছেন, সামরিক জান্তার সঙ্গে আলোচনা চলছে। ব্রিগেডিয়ার মজুমদার যেন ধৈর্য ধারণ করেন।’ ২৪ মার্চ পাকিস্তান সামরিক কর্তৃপক্ষ ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে বদলি করে ঢাকায় নিয়ে আসার পরপরই তিনি কর্নেল ওসমানীর সঙ্গে দেখা করেন। কর্নেল ওসমানী সেদিন সন্ধ্যায় ধানমন্ডিতে শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করে টেলিফোনে ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে জানান, ‘বঙ্গবন্ধু বলেছেন, আওয়ামী লীগ ইয়াহিয়ার সঙ্গে একটা সমঝোতায় এসেছে। তিনি তাকে ধৈর্য ধরতে বলেন।’

২৪ মার্চ সকাল পর্যন্ত আলোচনার অগ্রগতির কোনো খবর না পাওয়া গেলেও সেদিন দুপুরের পর বিভিন্ন সূত্র থেকে খবর আসতে থাকে, আওয়ামী লীগের তরফ থেকে তিনটি মৌলিক বিষয় প্রেসিডেন্টের কাছে উত্থাপন করা হয়েছে এবং আলোচনার ওপর প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে যে ঘোষণাপত্র তৈরি করা হবে, তাতে এ তিনটি মৌলিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়। মৌলিক বিষয় তিনটি হলো- ১) সামরিক আইন প্রত্যাহার করা, (২) নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা এবং (৩) পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ব্যাপকভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন দেওয়া। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষে বলা হয়, প্রেসিডেন্টের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল পীরজাদা ২৫ মার্চ কোনো একসময় ড. কামাল হোসেনকে প্রেসিডেন্টের ঘোষণাসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের কথা টেলিফোনে জানিয়ে দেবেন। কামাল হোসেন ছিলেন আলোচনা কাজে শেখ মুজিবের নিযুক্ত তিন প্রতিনিধির একজন, যারা ইয়াহিয়া খানের পক্ষের আলোচকদের সঙ্গে আপসরফার মাধ্যমে কনফেডারেশনের ঐকমত্যের খসড়া প্রস্তুত করেছিলেন। ২৪ মার্চ সকালে জেনারেল পীরজাদা টেলিফোনে ড. কামাল হোসেনকে জানিয়ে দেবেন বললেও, তার ঠিক এক ঘণ্টা আগেই অর্থাৎ সেদিন বেলা ১১টার দিকে মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী শেখ মুজিবকে গ্রেফতারের আনুষ্ঠানিক আদেশ জারি করেন এবং পাশাপাশি ইস্টার্ন কমান্ড হেডকোয়ার্টার থেকে দেশের বিভিন্ন সেনানিবাসে ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে বাঙালি নিধনের নির্দেশও চলে যায়। আওয়ামী লীগ নেতারা ২৫ মার্চ সারা দিন ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা করলেও জেনারেল পীরজাদার সেই টেলিফোন কল আর আসেনি। এভাবেই মুজিব-ইয়াহিয়ার বৈঠক ব্যর্থতায় পরিণত হয়। আওয়ামী লীগ নেতারা তখনই উপলব্ধি করেন মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক ছিল স্রেফ সময়ক্ষেপণের প্রহসন মাত্র। এমতাবস্থায় শেখ মুজিব সেদিনই; দেশের বিভিন্ন স্থানে সেনাবাহিনী কর্তৃক সাধারণ জনগণের ওপর ভারী গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে ২৭ মার্চ দেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করেন।

মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক নিয়ে এখন যখন প্রশ্ন ওঠে, শেখ মুজিব এই সময়ক্ষেপণের আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন কেন? তখন অনেকেই এটিকে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক কৌশল ছিল বলার চেষ্টা করেন। তারা বলেন, শেখ মুজিব হয়তো আগেই টের পেয়েছিলেন, আলোচনা ব্যর্থ হতে পারে। কিন্তু তার লক্ষ্য ছিল বিশ্ববাসীর কাছে এ বার্তাটি পৌঁছে দেওয়া যে, তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদী নন। তিনি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা এবং তিনি আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান চেয়েছিলেন। বৈঠকে সাফল্য আসবে এ ব্যাপারে শেখ মুজিব এবং তার নেতারা যে আশাবাদী ছিলেন, তা মঈদুল হাসানের ‘উপধারা একাত্তর মার্চ-এপ্রিল’ বইয়ে উল্লেখিত ড. কামালের বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়। মঈদুল হাসান তার বইয়ে লিখেছেন, ২৪ মার্চ সন্ধ্যায় বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহানের গুলশানের বাসায় তারই উপস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকার-টোকিও প্রতিনিধি, নাম সম্ভবত সেলিগ হ্যারিস, তাকে কামাল হোসেন বলেন, ‘সেনাবাহিনীর উগ্র অংশটির চাপে পরিস্থিতি মাঝে-মধ্যে অনিশ্চিত হয়ে পড়া সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের সর্বশেষ প্রস্তাব মেনে নেওয়া ছাড়া ইয়াহিয়ার আর কোনো পথ খোলা নেই; তাকে সামরিক আইন তুলে নিয়ে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনসহ প্রদেশগুলোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।... অতঃপর এ সবকিছুর ভিত্তিতে আর এক-দুই দিনের মধ্যেই ইয়াহিয়া ও মুজিবের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে চলেছে।’ অথচ সেই স্বাক্ষর করা আর হয়নি। ইয়াহিয়া বাঙালি নিধনের সব প্রস্তুতি শেষ করে চুপিসারে ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় ঢাকা ত্যাগ করেন। এ সংবাদ জানার পর বাঙালি নিধন অপারেশন শুরু হওয়ার আগে পাঁচ ঘণ্টা সময় হাতে পেয়েও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে, সাধারণ মানুষ ও দেশব্যাপী মাঠ পর্যায়ের সংগঠনগুলো কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে, সে সম্পর্কে কোনো নির্দেশ পৌঁছানো হয়নি। নির্দেশ পাওয়ার জন্য যারা ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাড়িতে গিয়েছিলেন, তাদের সবাইকে শহর থেকে সরে যেতে বলা হয়েছিল। এমন পরিস্থিতে ২৫ মার্চ কালরাত থেকেই নিরস্ত্র লাখো লাখো বাঙালি গণহত্যার শিকার হন। প্রায় আড়াই লাখের বেশি মা-বোনের ইজ্জত লুণ্ঠিত হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, একাত্তরের ২৩ মার্চ ছাত্র ও স্বেচ্ছাসেবক লীগর সমাবেশে ইয়াহিয়ার সঙ্গে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ার আলোচনার সাফল্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শেখ মুজিব গর্ব করে বলেছিলেন, ‘যে নেতা বিনা রক্তপাতে তার দাবি আদায় করে নিতে পারেন, তিনিই শ্রেষ্ঠ নেতা;’ তিনি কি তার প্রমাণ দিয়েছিলেন? এখন যদি কেউ এ প্রশ্ন করেন, তাহলে কি খুব ভুল হবে?

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি প্রকৃত জনযুদ্ধ: স্পিকার

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি প্রকৃত জনযুদ্ধ: স্পিকার

মুক্তিযোদ্ধাদের মৃতদেহ দাফন ও সৎকারে বরাদ্দ সাড়ে ৯ কোটি টাকা

মুক্তিযোদ্ধাদের মৃতদেহ দাফন ও সৎকারে বরাদ্দ সাড়ে ৯ কোটি টাকা

মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় গেজেটভুক্তির আবেদনের শেষ সময় ৭ অক্টোবর

মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় গেজেটভুক্তির আবেদনের শেষ সময় ৭ অক্টোবর

ছন্দে ছন্দে গণহত্যার ইতিহাস

ছন্দে ছন্দে গণহত্যার ইতিহাস

মুক্তিযুদ্ধে নিজেদের ভূমিকা নিয়ে ৬ বার উদ্যোগ নিয়েও কেন ক্ষমা চায়নি জামায়াত?

মুক্তিযুদ্ধে নিজেদের ভূমিকা নিয়ে ৬ বার উদ্যোগ নিয়েও কেন ক্ষমা চায়নি জামায়াত?

মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আবুল কালাম আযাদের আপিল চলবে কিনা শুনানি ৩১ আগস্ট

মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আবুল কালাম আযাদের আপিল চলবে কিনা শুনানি ৩১ আগস্ট

আরও পড়ুন

মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠকের পরিণতি

মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠকের পরিণতি

একটি জাতির জন্ম

একটি জাতির জন্ম

স্বাধীনতা আর উপনিবেশায়ন

স্বাধীনতা আর উপনিবেশায়ন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম