Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

প্রবীণের প্রতি সম্মান ইসলামের অঙ্গীকার

Advertisement

Icon

মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

প্রবীণের প্রতি সম্মান ইসলামের অঙ্গীকার

Advertisement

একদিন যে হাত সন্তানকে ধরে হাঁটতে শিখিয়েছিল, বয়সের ভারে সেই হাতই হয়তো সন্তানের হাত খুঁজবে। যে মা-বাবা সন্তানের জন্য নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছেন, জীবনের শেষ অধ্যায়ে তাদের প্রয়োজন হয় একটু সময়, যত্ন ও সম্মানজনক আচরণ। বার্ধক্য জীবনের অনিবার্য বাস্তবতা। তাই প্রবীণের প্রতি দায়িত্ববোধ শুধু মানবিকতার দাবি নয়, ইসলামেরও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের সৃষ্টি করেছেন দুর্বল অবস্থায়; তারপর দুর্বলতার পর শক্তি দিয়েছেন; তারপর শক্তির পর দিয়েছেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য।’ (সূরা আর-রূম : ৫৪) আয়াতটি মানুষকে জীবনের পরিবর্তনশীল বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দেয়। আজ যে ব্যক্তি কর্মক্ষম ও স্বাবলম্বী, একদিন তাকেও অন্যের সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে।

ইসলাম প্রবীণের মর্যাদাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর সম্মানের অন্তর্ভুক্ত হলো বৃদ্ধ মুসলিমকে সম্মান করা।’ (সুনান আবু দাউদ : ৪৮৪৩) তাই বয়সের কারণে কাউকে তুচ্ছ করা, উপহাস করা কিংবা তার দুর্বলতাকে বিরক্তির কারণ হিসাবে দেখা ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং বয়স, অভিজ্ঞতা ও অবস্থানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা মুসলিম চরিত্রের অংশ।

প্রবীণের অধিকার প্রসঙ্গে সবচেয়ে জোরালো নির্দেশনা এসেছে বৃদ্ধ মা-বাবার ক্ষেত্রে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন, তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত না করতে এবং মা-বাবার প্রতি সদাচরণ করতে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের ‘উফ’ বলো না এবং তাদের ধমক দিও না; তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।’ (সূরা আল-ইসরা : ২৩)

এখানে শুধু ভরণপোষণের কথা বলা হয়নি; কথাবার্তা ও আচরণের প্রতিও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরের আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তাদের জন্য দয়ার সঙ্গে বিনয়ের ডানা নত করে দাও এবং বলো, হে আমার প্রতিপালক! তারা যেমন শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন, তেমনি আপনি তাদের প্রতি দয়া করুন।’ (সূরা আল-ইসরা : ২৪) অর্থাৎ সন্তানের অসহায় শৈশব যেমন মা-বাবা ধৈর্য ও ভালোবাসার সঙ্গে সামলেছেন, বার্ধক্যে তাদের দুর্বলতাকেও তেমনি মমতার সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে।

বৃদ্ধ মা-বাবার সেবা সন্তানের জন্য বড় নেক আমলের সুযোগ। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার মা-বাবা উভয়কে অথবা তাদের একজনকে বার্ধক্যে পেয়েও জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না।’ (সহিহ মুসলিম : ২৫৫১) তাই তাদের সেবাকে বোঝা নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সুযোগ হিসাবে দেখা উচিত।

বার্ধক্যে শারীরিক নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তির দুর্বলতা, অস্থি-সন্ধির সমস্যা, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস কিংবা চলাফেরায় অসুবিধা প্রবীণের জীবনকে কঠিন করে তোলে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, ওষুধ, পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা পরিবারের দায়িত্ব। অসুস্থ প্রবীণকে একা ফেলে রাখা কিংবা চিকিৎসার প্রয়োজনকে গুরুত্ব না দেওয়া মানবিকতার পরিপন্থি।

প্রবীণের প্রতি নির্যাতন শুধু শারীরিক আঘাত নয়। অপমান, ভয় দেখানো, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না দেওয়া, খাবার থেকে বঞ্চিত করা, সম্পদ কেড়ে নেওয়া কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে একাকী করে রাখাও অবহেলা ও নির্যাতনের মধ্যে পড়ে। পরিবারে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে প্রবীণ ব্যক্তি নিরাপদে নিজের প্রয়োজন ও সমস্যার কথা বলতে পারেন।

নতুন প্রজন্মের সঙ্গে প্রবীণদের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। দাদা-দাদি, নানা-নানির সঙ্গে শিশুদের সময় কাটানোর সুযোগ দিলে তারা পারিবারিক ইতিহাস, মূল্যবোধ ও জীবন-অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত হয়। একই সঙ্গে প্রবীণরাও পরিবারে নিজেদের প্রয়োজনীয় ও মর্যাদাপূর্ণ সদস্য হিসাবে অনুভব করেন। যারা শারীরিকভাবে সক্ষম, তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী পারিবারিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রাখাও প্রয়োজন।

বার্ধক্য অবহেলার নয়, মর্যাদার অধ্যায়। আজ যাদের হাতে আমরা দায়িত্ব তুলে নিচ্ছি, কাল সেই হাতই হয়তো আমাদের আশ্রয় চাইবে। ইসলামের শিক্ষা তাই স্পষ্ট-প্রবীণকে বোঝা নয়, সম্মানের মানুষ হিসাবে দেখতে হবে; তাদের দুর্বলতাকে বিরক্তির কারণ নয়, সেবা ও নেক আমলের সুযোগ হিসাবে গ্রহণ করতে হবে। একটি পরিবার ও সমাজ কতটা মানবিক, তার অন্যতম মাপকাঠি হলো-সে তার প্রবীণদের কতটা সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদা দেয়।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

বিভাজনের প্রাচীরে বন্দি মুসলিম উম্মাহ

বিভাজনের প্রাচীরে বন্দি মুসলিম উম্মাহ

স্মৃতিশক্তি আল্লাহর এক অনন্য দান

স্মৃতিশক্তি আল্লাহর এক অনন্য দান

প্রবীণের প্রতি সম্মান ইসলামের অঙ্গীকার

প্রবীণের প্রতি সম্মান ইসলামের অঙ্গীকার

সূরা আল-বাকারাহ’র আলোকে জীবনের নির্দেশনা

সূরা আল-বাকারাহ’র আলোকে জীবনের নির্দেশনা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম