স্মৃতিশক্তি আল্লাহর এক অনন্য দান
Advertisement
মুফতি মুহাম্মদ আনিসুর রহমান রিজভি
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মানুষের মস্তিষ্ক আল্লাহতায়ালার সৃষ্টির এক বিস্ময়কর নিদর্শন। আমরা যা দেখি, শুনি, পড়ি ও অনুভব করি-তার অনেক কিছুই কোনো না কোনোভাবে স্মৃতিতে সংরক্ষিত হয়। প্রয়োজনের সময় সেই স্মৃতি আমাদের চিনতে, বুঝতে, সিদ্ধান্ত নিতে এবং কাজ করতে সাহায্য করে। একটি শিশু তার মায়ের মুখ চিনতে শেখে। শিক্ষার্থী অক্ষর ও শব্দ শেখে। ধীরে ধীরে সে বাক্য পড়তে, অর্থ বুঝতে এবং জ্ঞান অর্জন করতে শেখে। একজন আলেম অসংখ্য আয়াত, হাদিস, মাসআলা ও জ্ঞান হৃদয়ে ধারণ করেন। এসবই মানুষের স্মরণশক্তির বিস্ময়কর ক্ষমতার প্রকাশ।
আল্লাহতায়ালা বলেন-‘তিনি তোমাদের মায়ের গর্ভ থেকে এমন অবস্থায় বের করেছেন, তোমরা কিছুই জানতে না; আর তিনি তোমাদের জন্য শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও অন্তঃকরণ দিয়েছেন, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও।’-সূরা আন-নাহল, ১৬:৭৮ এই আয়াত মানুষকে তার জ্ঞান ও উপলব্ধির উৎস সম্পর্কে চিন্তা করতে আহ্বান জানায়।
জ্ঞান অর্জনের অন্যতম চাবিকাঠি
স্মৃতিশক্তি না থাকলে শিক্ষা কার্যক্রম প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ত। একজন শিক্ষার্থী আজ যা শেখে, আগামীকাল তা মনে রাখতে না পারলে তার জ্ঞান কীভাবে বৃদ্ধি পাবে? ইসলামি জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রেও স্মৃতিশক্তির গুরুত্ব অপরিসীম। কুরআন হিফজ, হাদিস মুখস্থ করা, দোয়া ও মাসআলা শেখা-সবকিছুর সঙ্গে স্মৃতিশক্তির গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
রাসূল (সা.) বলেছেন-‘আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে দ্বীনের জ্ঞান দান করেন।’-সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭১; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০৩৭ তাই জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি সেই জ্ঞান সংরক্ষণ করার ক্ষমতাও আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ।
কুরআন হিফজ-স্মৃতিশক্তির অনন্য ব্যবহার
পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের মধ্যে অসংখ্য মানুষ পবিত্র কুরআন সম্পূর্ণ মুখস্থ করেছেন। শিশু থেকে বৃদ্ধ-বিভিন্ন বয়সের মানুষ বছরের পর বছর কুরআনের আয়াত হৃদয়ে ধারণ করে রেখেছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন-‘নিশ্চয়ই আমিই কুরআন নাজিল করেছি এবং অবশ্যই আমিই তার সংরক্ষণকারী।’-সূরা আল-হিজর, ১৫:৯
কুরআন সংরক্ষণের এ ঐতিহাসিক ধারায় মানুষের স্মৃতিশক্তি আল্লাহর হেফাজতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একজন হাফেজ যখন দীর্ঘ কুরআন দেখে না পড়ে নির্ভুলভাবে তেলাওয়াত করেন, তখন চিন্তা করলে বোঝা যায়-এটি মানুষের ওপর আল্লাহর কত বড় অনুগ্রহ!
ভুলে যাওয়াও কখনো রহমত
স্মৃতিশক্তি যেমন নিয়ামত, তেমনি কিছু বিষয় ভুলে যাওয়ার ক্ষমতাও আল্লাহর রহমত হতে পারে। জীবনের সব দুঃখ, কষ্ট ও বেদনা যদি প্রতিটি মুহূর্তে একই তীব্রতায় মনে থাকত, তাহলে মানুষের জীবন আরও কঠিন হয়ে যেত। সময় অনেক কষ্টের স্মৃতিকে ম্লান করে দেয়। মানুষ নতুন করে বাঁচার সাহস পায়। তাই আল্লাহর সৃষ্টি ব্যবস্থায় মনে রাখা ও ভুলে যাওয়া-দুটিই মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
স্মৃতিশক্তির প্রকৃত শোকর কী?
আল্লাহর দেওয়া কোনো নিয়ামতের শোকর শুধু মুখে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিয়ামতকে সঠিক কাজে ব্যবহার করাও শোকরের অংশ। তাই স্মৃতিশক্তিকে অশ্লীলতা, গুনাহ ও অনর্থক বিষয় দিয়ে ভারাক্রান্ত না করে কুরআন-হাদিস, জ্ঞান, নৈতিক শিক্ষা ও কল্যাণকর বিষয় স্মরণে রাখা উচিত। যে মস্তিষ্কে আমরা কুরআনের আয়াত ধারণ করতে পারি, সেখানে কেন অশ্লীল ও ক্ষতিকর বিষয় জমা করব? যে স্মৃতি আমাদের নেক কাজের কথা মনে করিয়ে দিতে পারে, তাকে কেন গুনাহের স্মৃতিতে ব্যস্ত রাখব?
কীভাবে স্মৃতিশক্তির যত্ন নেব?
স্মৃতিশক্তি ভালো রাখার জন্য নিয়মিত পড়াশোনা ও পুনরাবৃত্তির অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত ঘুম, পরিমিত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক ব্যায়াম, মানসিক প্রশান্তি এবং অতিরিক্ত অপ্রয়োজনীয় স্ক্রিন ব্যবহারে সংযমও উপকারী।
পাশাপাশি নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত, জিকির ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য কামনা করা উচিত। কারণ জ্ঞান ও স্মৃতিশক্তির প্রকৃত মালিক তিনিই। আল্লাহতায়ালা আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন-‘হে আমার রব! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন।’-সূরা ত্বহা, ২০:১১৪ এ ছোট অথচ গভীর দোয়াটি প্রত্যেক জ্ঞানপিপাসু মানুষের জীবনের অংশ হওয়া উচিত।
লেখক : প্রভাষক (আরবি) মাদ্রাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাজিল (ডিগ্রি), বন্দর, চট্টগ্রাম
