সূরা আল-বাকারাহ’র আলোকে জীবনের নির্দেশনা
Advertisement
সাব্বির রহমান
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পবিত্র কুরআনের দীর্ঘতম অধ্যায় ‘সূরা আল-বাকারাহ’ কেবল প্রাচীন কোনো ধর্মগ্রন্থের অংশ নয়; বরং মানুষের মনস্তত্ত্ব, পারিবারিক বন্ধন, সমাজভাবনা ও রাষ্ট্রপরিচালনার এক অমলিন দিকনির্দেশনা। মদিনায় অবতীর্ণ এ সূরার গহিন থেকে যদি আমরা আমাদের প্রতিদিনের পথচলার জন্য মূল অনুশাসন বেছে নিই, তবে তা আমাদের জীবনের ক্যানভাস এক নিমেষে বদলে দিতে পারে।
তাকওয়া : অন্তরের কম্পাস ও সংশয়হীন পথচলা
জীবনের কুয়াশাচ্ছন্ন মোড়ে দাঁড়িয়ে কোনটা ভালো, আর কোনটা মন্দ, তা চেনার একমাত্র অলৌকিক শক্তি হলো ‘তাকওয়া’ বা খোদাভীতি। অন্তরে পরম করুণাময়ের ভয় ও ভালোবাসা থাকলে জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে এক পরম স্থিরতা চলে আসে। আর কুরআনের আলো কেবল তাদের হৃদয়েই কার্যকর হয়, যাদের অন্তরে এই তাকওয়ার সলতে জ্বলছে। ‘এ সেই কিতাব, এতে কোনো সন্দেহ নেই; এটি মুত্তাকিদের (তাকওয়াবানদের) জন্য পথপ্রদর্শক।’ [সূরা আল-বাকারাহ : ২]
শয়তানের সূক্ষ্ম ফাঁদ ও তওবার আকুলতা
অন্যায় বা পাপ কখনোই এক লাফে এসে আমাদের গ্রাস করে না; শয়তান অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে ছোট ছোট মিষ্টতার প্রলোভন দিয়ে মানুষকে ভুল পথে টানে। ভুল করা মানবের স্বাভাবিক প্রবণতা, কিন্তু ইবলিসের মতো অহংকারে অন্ধ না হয়ে হজরত আদম (আ.)-এর মতো নতশিরে নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়াই মুমিনের প্রকৃত সৌন্দর্য। ‘হে মানবজাতি! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র রয়েছে, তা থেকে আহার কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কর না; নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’ [সূরা আল-বাকারাহ : ১৬৮]
ধৈর্য ও সালাত : ঝড়ের রাতে নোঙর ফেলার আশ্রয়
কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে মানুষ যখন দিগ্বিদিক হারিয়ে ফেলে, তখন ধৈর্য ও সালাতই তাকে অটল থাকার শক্তি দেয়। জীবনের বিপদ যতই পাহাড়সম হোক না কেন, সালাতের সেজদায় নিজের কষ্ট ঢেলে দেওয়া এবং পরম ধৈর্যের সঙ্গে সময়ের মুখোমুখি হওয়ার নামই আসল ইমান। ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর; নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ [সূরা আল-বাকারাহ : ১৫৩]
ক্ষয়ক্ষতির মুখে দাঁড়িয়ে অনন্ত শান্তির বিশ্বাস
প্রিয়জন হারানোর বেদনায় কিংবা ধনসম্পদের ক্ষয়ে হৃদয় যখন দুমড়ে-মুচড়ে যায়, তখন একটি গভীর বিশ্বাসই মানুষকে মানসিক ভারসাম্য ফিরিয়ে দেয়, এই দুনিয়ায় কিছুই চিরস্থায়ী নয়। আমাদের যা কিছু আছে এবং আমরা নিজেরাও এক পরম সত্তার দিকে ধাবমান। এ উপলব্ধি দুঃখের আগুনে পোড়া অন্তরে শীতল জল ঢেলে দেয়।
‘তারা কোনো বিপদে পতিত হলে বলে : নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই জন্য এবং নিশ্চিতভাবেই আমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।’ [সূরা আল-বাকারাহ : ১৫৬]
সম্পর্কের সম্মান ও বিচ্ছেদের মাঝেও সৌজন্য
দাম্পত্য জীবন হলো ভালোবাসার এক সুবাসিত বন্ধন। কিন্তু কখনো যদি অমিলের কারণে সেই বন্ধন ছিঁড়তেও হয়, তবুও ইসলাম তাতে কোনো কাদা ছোড়াছুড়ির অনুমতি দেয় না। বিচ্ছেদের বিষাদময় মুহূর্তেও একে অপরের প্রতি সম্মান, সৌজন্য ও উদারতা বজায় রাখার শিক্ষা দেয় সূরা আল-বাকারাহ। ‘আর তোমরা নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সহানুভূতি ও সৌজন্যের কথা ভুলে যেও না।’ [সূরা আল-বাকারাহ : ২৩৭]
শোষণহীন অর্থনীতি : সুদের অভিশাপ থেকে মুক্তি
অন্যের অসহায়ত্ব ও অভাবকে পুঁজি করে নিজের পকেট ভারী করা চরম এক সামাজিক অপরাধ। ইসলাম সুদের মতো শোষণমূলক ব্যবসাকে কঠোরভাবে বর্জন করে করজে হাসানা ও দানের মাধ্যমে এক মানবিক অর্থনীতি গড়ে তোলার তাগিদ দেয়। সম্পদ যেন কেবল অর্থশালীদের হাতে ঘুরপাক না খায়, তার চমৎকার সুরাহা এতে রয়েছে। ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম।’ [সূরা আল-বাকারাহ : ২৭৫]
লেনদেনের শতভাগ স্বচ্ছতা ও হিসাব
ভালোবাসা আর বিশ্বাসের সুতো দিয়ে সম্পর্কের ভিত গড়া যায়, কিন্তু আর্থিক লেনদেনের ভিতে চাই শতভাগ হিসাবের স্পষ্টতা। পরবর্তী সময়ে যেন কোনো ভুল বোঝাবুঝি, সন্দেহ বা অন্যায়ের সুযোগ তৈরি না হয়, সেজন্য যে কোনো ছোট-বড় দেনা-পাওনা লিখিত রাখা এবং সাক্ষী রাখার কঠোর অনুশাসন দেওয়া হয়েছে। ‘হে মুমিনগণ! যখন তোমরা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য পরস্পরের মধ্যে ঋণের লেনদেন কর, তখন তা লিখে রাখ।’ [সূরা আল-বাকারাহ : ২৮২]
