Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

পুরুষের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগের শরয়ি বিধান কী?

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০১ পিএম

পুরুষের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগের শরয়ি বিধান কী?

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

কোনো নির্দোষ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ আরোপ করা জঘন্য কবীরা গুনাহ। ইসলামে মানুষের ইজ্জত-আবরু ও সম্মান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোনো ব্যক্তি, পুরুষ হোক বা নারী, অন্য কোনো নির্দোষ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অপবাদ আরোপ করতে পারবে না। অপবাদের ধরন ও বিষয়ভেদে এর শরয়ি হুকুম ও শাস্তি ভিন্ন হয়।

কযফ বা ব্যভিচারের মিথ্যা অপবাদের শরয়ি বিধান

বিশেষত কোনো নির্দোষ, চরিত্রবান ব্যক্তির ওপর ব্যভিচার বা ধর্ষণের অপবাদ আরোপ করা শরিয়তের পরিভাষায় ‘কযফ’-এর অন্তর্ভুক্ত। ইসলামি আদালতে কযফ শরয়িভাবে প্রমাণিত হলে এবং তার নির্ধারিত শর্ত পূর্ণ হলে, কুরআন-সুন্নাহর বিধান অনুযায়ী এর জন্য ৮০ বেত্রাঘাত, সাক্ষ্য অগ্রহণযোগ্য হওয়া এবং ফাসিক সাব্যস্ত হওয়ার বিধান রয়েছে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন—

وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَدًا وَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ

‘আর যারা সতী-সাধ্বী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অতঃপর চারজন সাক্ষী উপস্থিত না করে, তাদেরকে তোমরা আশিটি বেত্রাঘাত কর এবং কখনো তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করো না। আর তারাই হলো ফাসিক।’ (সুরা আন-নুর: আয়াত ৪)

যদিও উক্ত আয়াতে বিশেষভাবে নারীদের প্রতি অপবাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, ফুকাহায়ে কেরাম পুরুষের প্রতি ব্যভিচারের অপবাদকেও কযফের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। সুতরাং কোনো নির্দোষ পুরুষের বিরুদ্ধে ব্যভিচার বা ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ আরোপ করাও কযফের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হবে, যখন শরয়িভাবে কযফের শর্তসমূহ পূর্ণ হয়।

অন্যান্য মিথ্যা অপবাদের বিধান

আর যদি কোনো ব্যক্তি চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, প্রতারণা ইত্যাদির মিথ্যা অপবাদ দেয়, সেগুলোও অত্যন্ত গুরুতর গুনাহ ও জুলুম; তবে এগুলোকে শরিয়তের পরিভাষায় ‘কযফ’ বলে ৮০ বেত্রাঘাতের একই হুকুম দেওয়া যাবে না। এসব অপবাদের হুকুম ও শাস্তি বিষয়, প্রমাণ ও পরিস্থিতি অনুযায়ী পৃথক হবে এবং বিচারিক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

সুতরাং সাধারণ নীতি হলো, কোনো নির্দোষ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ আরোপ করা হারাম ও মারাত্মক গুনাহ; আর ব্যভিচারের মিথ্যা অপবাদ বিশেষভাবে কযফ, যার জন্য শরিয়তে নির্ধারিত হদ (শাস্তির বিধান) রয়েছে।

ফিকহি ব্যাখ্যা ও দলিল

ইসলামি ফিকহের প্রামাণ্য গ্রন্থসমূহে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে—

দাবির প্রমাণপদ্ধতি: مرقاة المفاتيح-এ বর্ণিত আছে—

عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ مَرْفُوعاً: «لَكِنَّ الْبَيِّنَةَ عَلَى الْمُدَّعِي وَالْيَمِينَ عَلَى مَنْ أَنْكَرَ». قَالَ النَّوَوِيُّ: هَذَا الْحَدِيثُ قَاعِدَةٌ شَرِيفَةٌ كُلِّيَّةٌ مِنْ قَوَاعِدِ أَحْكَامِ الشَّرْعِ، فَفِيهِ: أَنَّهُ لَا يُقْبَلُ قَوْلُ الْإِنْسَانِ فِيمَا يَدَّعِيهِ بِمُجَرَّدِ دَعْوَاهُ، بَلْ يَحْتَاجُ إِلَى بَيِّنَةٍ، أَوْ تَصْدِيقِ الْمُدْعَى عَلَيْهِ.

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে মারফু সূত্রে বর্ণিত, ‘তবে প্রমাণের দায়িত্ববাদীর ওপর এবং অস্বীকারকারীর ওপর কসম বর্তাবে।’  ইমাম নববি (রহ.) বলেন, এটি শরিয়তের বিধানগুলোর একটি মহান ও সার্বজনীন মূলনীতি। এতে প্রমাণিত হয় যে, মানুষ তার দাবির পক্ষে শুধু মুখের কথা বললেই তা গ্রহণ করা হবে না; বরং এর জন্য সাক্ষ্য-প্রমাণ বা যার বিরুদ্ধে দাবি করা হয়েছে তার সত্যয়ন প্রয়োজন। (মিরকাতুল মাফাতীহ ৭/২৫০, কিতাবুল আকদিয়াহ ওয়াশ শাহাদাত, ইমদাদিয়া)

কযফের সংজ্ঞা ও শাস্তি: العناية شرح الهداية- (আল-ইনায়া শারহুল হিদায়াহ) এ বলা হয়েছে—

«الْقَذْفُ فِي اللُّغَةِ الرَّمْيُ، وَفِي اصْطِلَاحِ الْفُقَهَاءِ نِسْبَةُ مَنْ أَحْصَنَ إِلَى الزِّنَى صَرِيحًا أَوْ دَلَالَةً... وَعَجَزَ الْقَاذِفُ عَنْ إِثْبَاتِ مَا قَذَفَهُ بِهِ (حَدَّهُ الْحَاكِمُ ثَمَانِينَ سَوْطًا إِنْ كَانَ حُرًّا لِقَوْلِهِ تَعَالَى: {وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ}...»

‘ভাষাগতভাবে কযফ অর্থ নিক্ষেপ করা। আর ফকিহগণের পরিভাষায় তা হলো— কোনো সুরক্ষিত (সতী বা চরিত্রবান) ব্যক্তিকে স্পষ্ট বা ইঙ্গিতে ব্যভিচারের সঙ্গে অভিযুক্ত করা... আর অপবাদকারী যদি তার অপবাদ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়, তবে শাসক তাকে ৮০টি বেত্রাঘাত করবেন যদি সে স্বাধীন হয়। কেননা আল্লাহ তাআলার বাণী— আর যারা সতী-সাধ্বী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে...।’ (আল-ইনায়া শারহুল হিদায়াহ ৫/৩১৬, কিতাবুল হুদুদ, বাব হদ্দিল কাযফ, দারুল ফিকর)

তওবা ও মুক্তির উপায়

যে ব্যক্তি এ ধরনের মিথ্যা অপবাদে লিপ্ত হয়েছে, তার জন্য জরুরি হলো—

১. অবিলম্বে এ ধরনের মিথ্যা অপবাদ ও পাপ থেকে সম্পূর্ণরূপে ফিরে আসা।

২. যার ওপর অপবাদ আরোপ করা হয়েছে তার কাছে যথাসম্ভব ক্ষমা প্রার্থনা করা ও সম্মান ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা।

৩. নিজের দ্বারা সৃষ্ট ক্ষতি দূর করার চেষ্টা করা।

৪. আল্লাহ তাআলার দরবারে খাঁটি অন্তরে তওবা ও ইস্তিগফার করা।

মানবাধিকার ও ব্যক্তির সম্মান সুরক্ষায় ইসলাম অত্যন্ত কঠোর ও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। নির্দোষ পুরুষের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মতো গুরুতর ও জঘন্য মিথ্যা অভিযোগ কেবল সামাজিক অপরাধই নয়, বরং এটি ইসলামি আইনে অত্যন্ত মারাত্মক অপরাধ হিসেবে গণ্য। তাই সমাজে শান্তি ও ন্যায়বিচার বজায় রাখতে মিথ্যা অপবাদ থেকে সকলের দূরে থাকা অপরিহার্য।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

দাম্পত্য জীবনে স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসায় নবীজির (সা.) ৫ উপমা

দাম্পত্য জীবনে স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসায় নবীজির (সা.) ৫ উপমা

আরবি ১২ মাসের নাম এলো যেভাবে

আরবি ১২ মাসের নাম এলো যেভাবে

আয়াতুল কুরসির মর্যাদা কী ও আমলের সময় কখন?

আয়াতুল কুরসির মর্যাদা কী ও আমলের সময় কখন?

প্রতিদিনের যে ৮ নফল নামাজে বরকতময় হয়ে ওঠে মুমিনের জীবন

প্রতিদিনের যে ৮ নফল নামাজে বরকতময় হয়ে ওঠে মুমিনের জীবন

কেউ একজন থাকুক, যে ভালোবাসার ছায়ায় জান্নাতের পথে এগিয়ে নেবে

কেউ একজন থাকুক, যে ভালোবাসার ছায়ায় জান্নাতের পথে এগিয়ে নেবে

স্বামী-স্ত্রী একে অপর থেকে কতদিন দূরে থাকতে পারবে?

স্বামী-স্ত্রী একে অপর থেকে কতদিন দূরে থাকতে পারবে?

আরও পড়ুন

পুরুষের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগের শরয়ি বিধান কী?

পুরুষের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগের শরয়ি বিধান কী?

ব্যাংক থেকে সুদে ঋণ নেওয়া ব্যক্তির বাড়িতে খাবার খাওয়া কি জায়েজ?

ব্যাংক থেকে সুদে ঋণ নেওয়া ব্যক্তির বাড়িতে খাবার খাওয়া কি জায়েজ?

‘ডিভোর্স দিলাম’ বললে কত তালাক হয়?

‘ডিভোর্স দিলাম’ বললে কত তালাক হয়?

দাম্পত্য জীবনে স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসায় নবীজির (সা.) ৫ উপমা

দাম্পত্য জীবনে স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসায় নবীজির (সা.) ৫ উপমা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম