আদর্শ মা আদর্শ সন্তান
Advertisement
মো. লোকমান হেকিম
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সন্তানের চিন্তা-চেতনা, মূল্যবোধ ও আচরণ গঠনে মায়ের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। তাই সন্তানকে আদর্শ মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে হলে মাকে নিজেও সৎ, মার্জিত ও দায়িত্বশীল হতে হবে। কারণ, শিশুরা উপদেশের চেয়ে মা-বাবার আচরণ থেকে বেশি শেখে। শৈশব থেকেই সন্তানদের নামাজ আদায়, কুরআন তিলাওয়াত ও ইসলামের মৌলিক বিধান পালনে অভ্যস্ত করতে হবে। পাশাপাশি সত্যবাদিতা, আমানতদারি, শালীনতা ও মানুষের প্রতি সদাচরণের শিক্ষা দিতে হবে। মায়ের নিজের আমল-আখলাকও যেন এসব গুণের প্রতিফলন ঘটায়। এতে সন্তান উপদেশের পাশাপাশি বাস্তব জীবনের উদাহরণ থেকেও শিক্ষা পাবে।
ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি সন্তানদের বাস্তব জীবন পরিচালনার দক্ষতা অর্জনও জরুরি। ছেলেমেয়ে উভয়কেই বয়স ও সামর্থ্য অনুযায়ী রান্নাবান্না, ঘর গোছানো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজ শেখানো উচিত। ঘরের কাজ শুধু মেয়েদের দায়িত্ব-এমন ধারণা পরিহার করে পরিবারের সবার মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এতে সন্তানরা আত্মনির্ভরশীল হবে এবং পারিবারিক জীবনে সহযোগিতার গুরুত্ব বুঝতে শিখবে।
সন্তানদের মিথ্যা, গিবত, পরনিন্দা, অহংকার ও অশালীন কথাবার্তা থেকে বিরত রাখতে হবে। বড়দের প্রতি সম্মান, ছোটদের প্রতি স্নেহ, ধৈর্য, বিনয় ও সহমর্মিতা তাদের চরিত্রের অংশ হয়ে ওঠা প্রয়োজন। মা যদি নিজেই রাগের বশে অন্যকে অপমান করেন কিংবা অশোভন আচরণ করেন, তাহলে সন্তানের মধ্যেও সেই প্রবণতা তৈরি হতে পারে। তাই সন্তানকে সংশোধনের পাশাপাশি নিজের আচরণ সংশোধন করাও মায়ের কর্তব্য।
লালন-পালনে আদর ও শাসনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। অতিরিক্ত কঠোরতা সন্তানের মনে ভয় সৃষ্টি করতে পারে, আবার সীমাহীন প্রশ্রয় তাকে দায়িত্বহীন করে তুলতে পারে। ভুল করলে অপমান না করে বুঝিয়ে বলতে হবে, আর ভালো কাজের প্রশংসা করতে হবে। এতে সন্তানের আত্মবিশ্বাস বাড়বে এবং মা-বাবার সঙ্গে তার আস্থার সম্পর্ক দৃঢ় হবে।
সন্তানদের সুশৃঙ্খল জীবনযাপনে অভ্যস্ত করতে নিয়মিত সময়ে ঘুমানো ও ঘুম থেকে ওঠা, ফজরের নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, পড়াশোনা, শরীরচর্চা ও খেলাধুলার জন্য সময় নির্ধারণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের বিনোদন, বন্ধুবান্ধব ও সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও সচেতন থাকা প্রয়োজন। ক্ষতিকর বিনোদন ও অসৎ সঙ্গ থেকে দূরে রাখার পাশাপাশি শালীনতা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
অবসর সময়ে সন্তানদের নবী-রাসূলদের জীবন, সাহাবায়ে কেরামের আদর্শ, ইসলামের ইতিহাস ও নৈতিক শিক্ষামূলক ঘটনা শোনানো উপকারী। পাশাপাশি বয়সোপযোগী বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ঘরে নিয়মিত কুরআন-হাদিসের শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় মাসআলা নিয়ে আলোচনা করলে তাদের জ্ঞান ও মূল্যবোধ সমৃদ্ধ হবে।
সন্তানদের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্যও প্রস্তুত করতে হবে। ছেলেমেয়ে উভয়কেই শিক্ষা, কর্মদক্ষতা, আত্মবিশ্বাস ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে। মেয়েদের প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি কাজ শেখানোর পাশাপাশি তাদের আত্মনির্ভরশীল হতে উৎসাহিত করতে হবে। একইভাবে ছেলেদেরও ঘরের কাজে অংশগ্রহণ, পরিবারের সদস্যদের যত্ন নেওয়া এবং দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার শিক্ষা দিতে হবে। বিনয় শেখানোর অর্থ নিজের অধিকার বিসর্জন দেওয়া নয়; বরং নিজের ও অন্যের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা।
সন্তান বিয়ের উপযুক্ত হলে তাকে বিবাহিত জীবনের দায়িত্ব ও বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে। ছেলেমেয়ে উভয়কেই স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার, সহনশীলতা ও সুন্দর আচরণের শিক্ষা দিতে হবে। মেয়েকে শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং ছেলেকে স্ত্রীর প্রতি সদাচরণ ও উভয় পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল হতে শেখাতে হবে। সংসারের শান্তি একতরফা ত্যাগের ওপর নয়; বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও ন্যায়সংগত আচরণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। অন্যায়, অপমান কিংবা নির্যাতন নীরবে সহ্য করাই আদর্শ আচরণ নয়; প্রয়োজনে বিশ্বস্ত ব্যক্তির সহযোগিতা নিতে হবে।
