Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

আসছে ওয়াজ মাহফিলের মৌসুম

বয়ানের সুরে ছড়াক ইমানের নুর

Advertisement

Icon

ফিরোজ চিশতী

প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

শীতের রাত। গ্রামের মাঠে বাঁশের প্যান্ডেল, মাইকের ধ্বনি, দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসা মানুষ বাংলার ধর্মীয় সামাজিক জীবনে শীতকালীন ওয়াজ মাহফিল যেন এক চিরচেনা দৃশ্য। কুরআনের তিলাওয়াত, হামদ-নাত, দ্বীনি আলোচনা, দোয়া ও মানুষের হৃদয় নরম করে দেওয়া নসিহত এসবের মধ্যদিয়ে বহু যুগ ধরে ওয়াজ মাহফিল মানুষের ধর্মীয় চেতনা জাগ্রত করার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসাবে ভূমিকা পালন করে আসছে। একটি সার্থক মাহফিল মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতি, রাসূলপ্রেম, আখিরাতের চিন্তা, পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব, প্রতিবেশীর অধিকার এবং মানবিকতার বোধ জাগিয়ে তোলে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে কিছু কিছু বক্তার অতিরঞ্জিত কথার কারণে মাহফিল আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য এখন প্রশ্নের মুখোমুখি। বিশেষ করে ব্যক্তিগত আক্রমণ, গিবত, অপবাদ, কুৎসা, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, প্রতিপক্ষকে হেয় করা এবং যাচাই বাছাই ছাড়া যে কোনো সংবাদ প্রচার-এসব নসিহতের মঞ্চকে কখনো কখনো বিতর্কের মঞ্চে পরিণত করছে। মাহফিলের প্যান্ডেলে লোকজনের উপস্থিতি কমে যাচ্ছে।

আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমার প্রতিপালকের পথে প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে আহ্বান কর।’ (সূরা আন-নাহল : ১২৫)। এ আয়াতে সুস্পষ্টভাবে ওয়াজের পদ্ধতি সম্পর্কে একটি মৌলিক নীতি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। আহ্বানের ক্ষেত্রে হিকমত অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। সুতরাং ওয়াজের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষকে সত্যের দিকে আহ্বান করা; কাউকে অপমান করা নয়। ভুলের সংশোধন করা; ব্যক্তিগত বিদ্বেষ কিংবা ক্ষোভ প্রকাশ করা নয়। মানুষের হৃদয় জয় করা; প্রতিপক্ষ তৈরি করা নয়। গিবতের ব্যাপারে কুরআনের ভাষা অত্যন্ত কঠোর। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা একে অপরের গিবত কর না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা ঘৃণা কর।’ (সূরা আল-হুজুরাত : ১২)। যে মাহফিলে গিবত থেকে বাঁচার শিক্ষা দেওয়ার কথা, সেই মাহফিলের মঞ্চে বসে যদি কোনো অনুপস্থিত ব্যক্তির সম্মানহানি করা হয়, তাহলে সেটি কীভাবে নসিহতের আদর্শ হতে পারে? রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে এটাই গিবত।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৯)। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, কথাটি যদি তার মধ্যে সত্যিই থাকে? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তা সত্য হলে গিবত; আর সত্য না হলে তা বুহতান বা অপবাদ। মিথ্যা অপবাদ তো আরও ভয়াবহ অপরাধ।

বর্তমান সময়ে ওয়াজ মাহফিলের আরেকটি বড় সংকট হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব বা অন্য কোনো সূত্র থেকে পাওয়া বক্তব্য যাচাই না করেই মঞ্চে প্রচার করা। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘কোনো ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে এলে তোমরা তা যাচাই করে নাও।’ (সূরা আল-হুজুরাত : ৬)। এ আয়াত বর্তমান ডিজিটাল যুগে বেশি প্রাসঙ্গিক। একজন বক্তার মুখ থেকে বের হওয়া একটি অযাচাইকৃত অভিযোগ মুহূর্তেই হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। ফলে একটি ভুল বক্তব্য শুধু একজন ব্যক্তির সম্মানই নষ্ট করে না; পরিবার, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের মধ্যেও বিভেদ সৃষ্টি করতে পারে।

ফিতনা খুবই ভয়ংকর। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘ফিতনা হত্যার চেয়েও গুরুতর।’ (সূরা আল-বাকারা : ২১৭)। ফিতনা শুধু যুদ্ধ বা বিশৃঙ্খলা নয়; মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ, বিভাজন, সন্দেহ ও সংঘাত সৃষ্টি করাও সামাজিক ফিতনার পথ খুলে দিতে পারে। তাই ওয়াজের মঞ্চে এমন ভাষা ব্যবহার করা উচিত নয়, যা শ্রোতাদের এক সম্প্রদায়, দল, ব্যক্তি বা আলেমের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষে উসকে দেয়।

ইজমার নির্দিষ্ট দাবি না করে ফিকহের সর্বজনস্বীকৃত নৈতিক মূলনীতি হিসাবে বলা যায় মুসলমানের সম্মান, সম্পদ ও জীবন সুরক্ষিত রাখা শরিয়তের মৌলিক উদ্দেশ্যের অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজের ভাষণে মানুষের রক্ত, সম্পদ ও সম্মানের পবিত্রতার কথা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে ঘোষণা করেছেন সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে যার বর্ণনা রয়েছে। কিয়াসের দৃষ্টিতেও বিষয়টি সহজে বোঝা যায়। যদি একজন সাধারণ মুসলমানের সম্মানহানি অন্যায় হয়, তাহলে দ্বীনের কথা বলার মঞ্চ ব্যবহার করে কারও সম্মানহানি করা আরও সতর্কতার দাবি রাখে। কারণ বক্তার কথার সামাজিক প্রভাব সাধারণ ব্যক্তির কথার তুলনায় বহুগুণ বেশি হতে পারে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য প্রয়োজন। ইসলাম ভুলের সংশোধন নিষিদ্ধ করেনি। বরং আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করার শিক্ষা ইসলামে রয়েছে। কিন্তু সংশোধন আর অপমান এক নয়। সত্য প্রকাশ আর কুৎসা রটনা এক নয়। গবেষণামূলক সমালোচনা আর গিবত এক নয়। অপ্রয়োজন আলোচনা, ব্যক্তিগত আক্রমণ, বিদ্রুপ, গালাগালি কিংবা চরিত্রহনন নসিহতের আদর্শ নয়।

একজন ওয়ায়েজের কণ্ঠে হাজার মানুষের প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই মঞ্চে ওঠার আগে তার মনে রাখা উচিত তিনি শুধু বক্তা নন, তিনি শ্রোতাদের কাছে দ্বীনের একজন প্রতিনিধি। আয়োজকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। মাহফিলের সাফল্য শুধু কত হাজার মানুষ এসেছে, কত বড় মাইক হয়েছে বা কত টাকা খরচ হয়েছে তার ওপর নির্ভর করে না। বরং কত মানুষ নামাজে ফিরল, কত পরিবারে শান্তি এলো, কত যুবক মাদক ছাড়ল, কত মানুষ পিতা-মাতার সেবা করতে শিখল-এসবই হওয়া উচিত সাফল্যের মানদণ্ড।

আমাদের শীতকালীন ওয়াজ মাহফিলগুলো হতে পারে সামাজিক ও নৈতিক পুনর্জাগরণের শক্তিশালী মাধ্যম। সেখানে আলোচিত হোক নামাজ, তাকওয়া, তাওবা, রাসূলপ্রেম, পিতা-মাতার অধিকার, প্রতিবেশীর হক, মাদকবিরোধী সচেতনতা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং মানবসেবা। বক্তারা মানুষকে বিভক্ত করার পরিবর্তে হৃদয়কে একত্রিত করুন। মতপার্থক্য থাকুক, কিন্তু শিষ্টাচার হারিয়ে না যাক। সংশোধন হোক, কিন্তু অপমান নয়। সত্য বলা হোক, কিন্তু কুৎসা নয়।

বাংলার শীতকালীন ওয়াজ মাহফিল আমাদের দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ও সামাজিক ঐতিহ্য। এ ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব শুধু আলেম ওয়ায়েজদের নয়; আয়োজক, শ্রোতা ও সমাজের প্রত্যেক সচেতন মানুষের। মাহফিলের মাইক্রোফোন যেন কারও সম্মানহানির অস্ত্র না হয়; তা হোক হেদায়াতের আহ্বানের কণ্ঠস্বর। মঞ্চ যেন প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জায়গা না হয়; হোক নিজেকে সংশোধনের আয়না। কুরআনের ভাষায়, ‘মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বলো।’ (সূরা আল-বাকারা : ৮৩)। আজ তাই সময় এসেছে ওয়াজ মাহফিলের সংস্কৃতিকে নতুন করে ভাবার গিবতের বদলে গিবত থেকে তাওবা, কুৎসার বদলে সত্য, বিদ্বেষের বদলে ভালোবাসা, ফিতনার বদলে ঐক্য এবং ব্যক্তিপূজার বদলে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন। তবেই শীতের রাতের সেই মাহফিল শুধু একটি ধর্মীয় সমাবেশ হবে না; হয়ে উঠবে বাংলার নৈতিক ও আত্মিক পুনর্জাগরণের আলোকবর্তিকা।

লেখক : সুফিব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠাতা, বাব-ই-ইয়াছিন ‘গুলশানে ইয়াছিন মনযিল’ এলাহাবাদ, দেবিদ্ধার, কুমিল্লা।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

আসছে ওয়াজ মাহফিলের মৌসুম বয়ানের সুরে ছড়াক ইমানের নুর

বয়ানের সুরে ছড়াক ইমানের নুর

পণ্যের গুণগতমান নিশ্চিতকরণে ইসলামের নির্দেশনা

পণ্যের গুণগতমান নিশ্চিতকরণে ইসলামের নির্দেশনা

জান্নাত কল্পনাতীত সুখ-শান্তির চিরস্থায়ী আবাস

জান্নাত কল্পনাতীত সুখ-শান্তির চিরস্থায়ী আবাস

আদর্শ মা আদর্শ সন্তান

আদর্শ মা আদর্শ সন্তান

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম