জান্নাত কল্পনাতীত সুখ-শান্তির চিরস্থায়ী আবাস
Advertisement
মুফতি মুহাম্মদ আনিসুর রহমান রিজভি
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মানবজীবনের চূড়ান্ত সাফল্য কোথায়? সম্পদ, প্রাচুর্য, ক্ষমতা কিংবা খ্যাতির মধ্যে? নাকি এমন এক জীবনে, যেখানে নেই দুঃখের ছায়া, মৃত্যুর ভয়, বার্ধক্যের ক্লান্তি কিংবা বিচ্ছেদের বেদনা? ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের প্রকৃত সাফল্য হলো মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং তাঁর অনুগ্রহে চিরশান্তির আবাস জান্নাত লাভ করা। জান্নাত এমন এক অনুপম জগৎ, যার সৌন্দর্য, সুখ-সমৃদ্ধি ও নেয়ামতের পূর্ণাঙ্গ চিত্র মানুষের কল্পনায় ধারণ করা সম্ভব নয়। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে জান্নাতের যে বর্ণনা এসেছে, তা মুমিনের হৃদয়ে পরকালীন জীবনের প্রতি গভীর আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করে।
চিরশান্তির মনোরম আবাস
জান্নাতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর চিরস্থায়িত্ব। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর প্রাসাদও একদিন জীর্ণ হয়, ফুলের সৌন্দর্য ম্লান হয়ে যায়, প্রিয়জনের সান্নিধ্য বিচ্ছিন্ন হয়; কিন্তু জান্নাতের সুখ-সৌন্দর্যের কোনো অবসান নেই। সেখানে নেই ক্লান্তি, অবসাদ কিংবা মৃত্যুর আতঙ্ক। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সেখানে তারা কোনো ক্লান্তি অনুভব করবে না এবং সেখান থেকে তাদের বহিষ্কারও করা হবে না।’ (সূরা : আল-হিজর, আয়াত : ৪৮)।
জান্নাতের অধিবাসীরা সেখানে নিরাপদ, প্রশান্ত ও সম্মানিত জীবন লাভ করবেন। পৃথিবীর জীবনে যারা দারিদ্র্য, অসুস্থতা, শোক, বঞ্চনা কিংবা নানা প্রতিকূলতার মধ্যদিয়ে দিন কাটিয়েছেন, জান্নাতে আল্লাহর রহমতে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে অতুলনীয় পুরস্কার। তবে জান্নাত লাভের মূল চাবিকাঠি হলো ইমান, আল্লাহর রহমত এবং তার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সৎকর্মে আত্মনিয়োগ।
সবুজ উদ্যান ও প্রবহমান নদী
পবিত্র কুরআনে জান্নাতের সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গিয়ে বারবার উদ্যান, ছায়া ও প্রবহমান নদীর কথা বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা ইমান আনে ও সৎকর্ম করে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত, যার তলদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত।’ (সূরা : আল-বুরূজ, আয়াত : ১১)।
জান্নাতের নদীগুলোর বর্ণনায় কুরআন উল্লেখ করেছে স্বাদ-গন্ধের পরিবর্তনহীন পানির নদী, স্বাদ অক্ষুণ্ন দুধের নদী, পানকারীদের জন্য সুস্বাদু পানীয়ের নদী এবং পরিশোধিত মধুর নদীর কথা। (সূরা : মুহাম্মাদ, আয়াত : ১৫)।
এসব বর্ণনা জান্নাতের অপূর্ব নেয়ামত ও আল্লাহর অসীম ক্ষমতার পরিচয় বহন করে। সেখানে প্রতিটি পরিবেশ হবে প্রশান্তিদায়ক এবং প্রতিটি দৃশ্য হবে হৃদয় জুড়ানো।
সুস্বাদু খাদ্য ও পছন্দের ফলমূল
পৃথিবীতে মানুষের জীবনধারণের জন্য খাদ্য অপরিহার্য। কিন্তু জান্নাতের খাদ্য শুধু ক্ষুধা নিবারণের উপকরণ নয়; বরং তা আনন্দ, তৃপ্তি ও সম্মানের অংশ। পবিত্র কুরআনে জান্নাতের ফলমূল, পছন্দসই খাদ্য এবং বিচিত্র নেয়ামতের উল্লেখ রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সেখানে থাকবে ফলমূল এবং তারা যা চাইবে।’ (সূরা : ইয়াসিন, আয়াত : ৫৭)।
জান্নাতের খাদ্য ও পানীয়ের প্রকৃত স্বরূপ দুনিয়ার অভিজ্ঞতার সঙ্গে পুরোপুরি তুলনীয় নয়। কুরআনের বর্ণনা আমাদের জানিয়ে দেয়, আল্লাহ তাঁর মুমিন বান্দাদের জন্য এমন সব নেয়ামত প্রস্তুত রেখেছেন, যা তাদের আনন্দ ও তৃপ্তিকে পূর্ণতা দেবে। সেখানে অভাব-অনটন কিংবা জীবিকার দুশ্চিন্তা থাকবে না।
প্রাসাদ, পোশাক ও সম্মানজনক জীবন
জান্নাতের অধিবাসীদের জন্য রয়েছে মনোরম আবাস, আরামদায়ক আসন, সুন্দর পোশাক ও সম্মানজনক জীবন। কুরআনে জান্নাতিদের রেশমি পোশাক পরিধান এবং স্বর্ণের অলংকারে সজ্জিত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। (সূরা : আল-হাজ, আয়াত : ২৩)।
দুনিয়ার জীবনে মানুষ সম্মান ও মর্যাদা অর্জনের জন্য কত চেষ্টা করে! কিন্তু প্রকৃত সম্মান হলো আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া। জান্নাতের সম্মান কোনো ক্ষণস্থায়ী সামাজিক মর্যাদা নয়; তা মহান আল্লাহর অনুগ্রহে অর্জিত চিরস্থায়ী পুরস্কার। সেখানে মানুষের অন্তরে অহংকার, হিংসা কিংবা বিদ্বেষ থাকবে না; বরং থাকবে পবিত্রতা, প্রশান্তি ও পারস্পরিক ভালোবাসা।
প্রিয়জনের সান্নিধ্য ও হৃদয়ের প্রশান্তি
মানুষের জীবনে প্রিয়জনের সান্নিধ্য অত্যন্ত মূল্যবান। দুনিয়ায় মৃত্যু, দূরত্ব ও বিচ্ছেদ মানুষের আনন্দকে অনেক সময় বিষাদে পরিণত করে। জান্নাতের অন্যতম সুসংবাদ হলো, আল্লাহর অনুগ্রহে নেককার মুমিনদের পরিবার-পরিজনের সঙ্গে মিলিত হওয়ার সুযোগ থাকবে। পবিত্র কুরআনে সৎকর্মশীল মুমিনদের সঙ্গে তাদের নেককার পিতা-মাতা, জীবনসঙ্গী ও সন্তানদের জান্নাতে প্রবেশের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। (সূরা : আর-রা’দ, আয়াত : ২৩)।
জান্নাতের জীবন হবে পবিত্র ও কলুষতামুক্ত। সেখানে কোনো বিদ্বেষ, প্রতারণা কিংবা মনোমালিন্য থাকবে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি তাদের অন্তর থেকে সব বিদ্বেষ দূর করে দেব।’ (সূরা : আল-আ’রাফ, আয়াত : ৪৩)। এ আয়াত জান্নাতি জীবনের মানসিক প্রশান্তি ও হৃদয়ের পবিত্রতার এক অনুপম চিত্র তুলে ধরে।
দুঃখ, শোক ও মৃত্যুর অবসান
পৃথিবীর জীবন পরীক্ষার ক্ষেত্র। এখানে সুখের পাশাপাশি দুঃখ, সুস্থতার পাশাপাশি অসুস্থতা এবং মিলনের পাশাপাশি বিচ্ছেদ রয়েছে; কিন্তু জান্নাতের জীবন এসব সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে। সেখানে জান্নাতিরা চিরস্থায়ী নিরাপত্তা ও প্রশান্তি লাভ করবেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সেখানে তাদের কোনো ক্লান্তি স্পর্শ করবে না এবং তারা সেখান থেকে বহিষ্কৃতও হবে না।’ (সূরা : আল-হিজর, আয়াত : ৪৮)।
