ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তার পথিকৃৎ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)
Advertisement
মাহদী বিন মুসলিম
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশের ইসলামি শিক্ষা, আধ্যাত্মিক সাধনা ও রাজনৈতিক ইতিহাসে মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) এক স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। ইলমে দ্বীন, আত্মশুদ্ধি, মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামি আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তার বিকাশে তার অবদান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ‘তওবার রাজনীতি’র আহ্বানের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নৈতিকতা ও আত্মশুদ্ধির প্রশ্নকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে আসেন।
১৮৯৫ সালে লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলার লুধুয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তার জন্ম। শৈশব থেকেই দ্বীনি শিক্ষার প্রতি অনুরাগী হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) কুরআন হিফজ ও উচ্চতর ইসলামি জ্ঞান অর্জনের জন্য ভারতের পানিপথে যান। পরে মাজাহিরুল উলুম ও দারুল উলুম দেওবন্দে অধ্যয়ন করেন। হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর সান্নিধ্যে তিনি আত্মশুদ্ধি ও তাজকিয়ায়ে নফসের সাধনা করেন।
দেশে ফিরে তিনি দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে আত্মনিয়োগ করেন। ঢাকার বড় কাটারা, লালবাগ ও ফরিদাবাদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার খেদমতের সম্পর্ক ছিল। ১৯৬৫ সালে কামরাঙ্গীরচরে তার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া। শিক্ষকতা, তালিম-তরবিয়ত ও খানকাহি মেহনতের মাধ্যমে তিনি অসংখ্য মানুষকে দ্বীনি শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করেন।
তার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ। হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) রাজনীতিকে কেবল ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যম হিসাবে দেখেননি; বরং ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের নৈতিক সংশোধনের ক্ষেত্র হিসাবে বিবেচনা করেছেন। তার মতে, রাষ্ট্র পরিচালনায় সততা, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও আল্লাহভীতি প্রতিষ্ঠা ছাড়া প্রকৃত কল্যাণ সম্ভব নয়। এই চিন্তা থেকেই তার ‘তওবার রাজনীতি’র ধারণা বিকশিত হয়।
১৯৮১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে বিশেষভাবে আলোচিত হন। একই বছরের ২৯ নভেম্বর তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। এর মাধ্যমে ইসলামি আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনার দাবিকে তিনি সংগঠিত রাজনৈতিক কর্মসূচির রূপ দেন। তার রাজনৈতিক উদ্যোগের তাৎপর্য ছিল-ধর্মীয় মূল্যবোধকে ব্যক্তিগত ইবাদতের গণ্ডি ছাড়িয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা, নেতৃত্বের নৈতিকতা ও জনকল্যাণের আলোচনায় নিয়ে আসা।
১৯৮৪ সালে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ গঠনে তিনি ভূমিকা রাখেন। ১৯৮৬ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও অংশ নিয়ে তিনি দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। সরকারি ফল অনুযায়ী, তিনি ১৫ লাখের বেশি ভোট পান। এই ফলাফল তার রাজনৈতিক আহ্বানের ব্যাপক জনসম্পৃক্ততার পরিচয় বহন করে। রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত না হলেও ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তাকে জাতীয় রাজনৈতিক আলোচনায় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।
১৯৮২ সালে ইরান ও ইরাক সফর এবং সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতের ঘটনাও তার আন্তর্জাতিক যোগাযোগের পরিচয় বহন করে।
হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)-এর রাজনৈতিক দর্শনের মূল শিক্ষা ছিল-ব্যক্তির আত্মশুদ্ধি ও রাষ্ট্রের নৈতিক সংস্কার পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। তার তওবার রাজনীতি তাই শুধু ব্যক্তিগত পাপ থেকে ফিরে আসার আহ্বান ছিল না; বরং অন্যায়, দুর্নীতি ও অবিচারমুক্ত সমাজ গঠনেরও প্রত্যাশা ছিল।
১৯৮৭ সালের ৭ মে তিনি ইন্তেকাল করেন। কামরাঙ্গীরচরের জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে তাকে দাফন করা হয়। তার দ্বীনি খেদমত, আধ্যাত্মিক সাধনা ও রাজনৈতিক চিন্তা বাংলাদেশের ইসলামি ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। আল্লাহতায়ালা তার সব খেদমত কবুল করুন এবং তাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমিন।
