Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

সাক্ষাৎকারে- মুফতি এনায়েতুল্লাহ

স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও কওমি সনদ কর্মবাজারে উপেক্ষিত

Advertisement

Icon

তোফায়েল গাজালি

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

কওমি শিক্ষার স্বকীয়তা, শিক্ষার মান, সনদের কার্যকারিতা ও কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ নিয়ে যুগান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন লেখক ও শিক্ষাবিদ মুফতি এনায়েতুল্লাহ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন-তোফায়েল গাজালি

যুগান্তর : বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বর্তমানে কোন অবস্থানে রয়েছে? এর প্রধান সংকটগুলো কী এবং সেগুলোর জন্য সরকার, শিক্ষা বোর্ড ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দায় কতটুকু?

মুফতি এনায়েতুল্লাহ : কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। ধর্মীয় শিক্ষা, আলেম তৈরি ও সমাজের ধর্মীয় চাহিদা পূরণে এ ধারার ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে। তবে শিক্ষার মান, আধুনিক বিষয় অন্তর্ভুক্তি, সনদের গ্রহণযোগ্যতা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, আর্থিক স্বচ্ছতা, কর্মসংস্থান ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। উদ্বেগের বিষয়, কওমি মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দায়িত্বশীলদের অনেকে এসব সমস্যা স্বীকার বা এ নিয়ে আলোচনায় আগ্রহী নন। ফলে বাইরে থেকে সমালোচনা বা পরামর্শ এলে তা অনেক সময় বিরোধিতা হিসাবে দেখা হয়।

আমরা মনে করি, কওমি মাদ্রাসা বাংলাদেশের শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর সংকটকে এককভাবে মাদ্রাসার ব্যর্থতা বলা যায় না। এর পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রের নীতিগত সীমাবদ্ধতা, বিরোধীদের অপপ্রচার, শিক্ষা বোর্ডগুলোর মান নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা, পরিচালকদের রক্ষণশীল মনোভাব ও আস্থার সংকট। দায় নির্ধারণে দেখতে হবে, কার হাতে কতটুকু ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে-দায়ও সে অনুযায়ী বহন করতে হবে।

যুগান্তর : কওমি শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্নগুলোর পেছনে কতটা বাস্তব সমস্যা, তুলনামূলক মূল্যায়ন ও ভুল ধারণা রয়েছে? বর্তমান শিক্ষাকাঠামো কতটা চাহিদা পূরণ করছে?

মুফতি এনায়েতুল্লাহ : প্রথমে বুঝতে হবে, কওমি মাদ্রাসা একটি বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এর মূল লক্ষ্য কুরআন-হাদিস, ফিকহ, আরবি ও ঐতিহ্যবাহী ইসলামি জ্ঞানচর্চার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। এ লক্ষ্য পূরণে কওমি মাদ্রাসা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ শিক্ষাধারার মাধ্যমে আলেম, মুফতি, মুহাদ্দিস, মুফাসসির, ইমাম, খতিব ও মাদ্রাসার শিক্ষক তৈরি হচ্ছেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সততা, আমানতদারি, ন্যায়পরায়ণতা, শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধ চর্চায় উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ইসলামি জ্ঞান পৌঁছে দেওয়ার কাজও তারা করে যাচ্ছেন।

তবে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার তুলনায় কওমি মাদ্রাসায় ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি ও সমাজবিজ্ঞানের চর্চা সীমিত। ফলে উচ্চশিক্ষা ও বৃহত্তর কর্মক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে; কিন্তু কওমি মাদ্রাসার কাছে চিকিৎসক বা প্রকৌশলী তৈরির প্রত্যাশা করা ঠিক নয়, কারণ তা এ শিক্ষাধারার মূল লক্ষ্য নয়। মূল্যায়ন করতে হবে, নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণে তারা কতটা সফল। পাশাপাশি সময়ের প্রয়োজনে অন্য জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ কতটা বাড়ানো যায়, সেটিও আলোচনায় আসা উচিত।

যুগান্তর : কওমি শিক্ষার আধুনিকায়নের দাবি কতটা যৌক্তিক? আধুনিকায়নের নামে স্বকীয়তা হারানোর আশঙ্কা এবং পরিবর্তনের বিরোধিতায় শিক্ষার্থীদের সময়োপযোগী জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি, এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য কোথায়?

মুফতি এনায়েতুল্লাহ : কওমি শিক্ষার আধুনিকায়নের দাবি যথেষ্ট যৌক্তিক। তবে আধুনিকায়ন বলতে কী বোঝানো হচ্ছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যদি এর অর্থ হয় কুরআন-হাদিস, ফিকহ, আরবি ভাষা ও ইসলামি জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখে শিক্ষার্থীদের বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, যুক্তিবোধ ও ব্যবহারিক দক্ষতায় সক্ষম করে তোলা, তাহলে এটা হতে পারে। তাতে আমি কোনো সমস্যা দেখি না। কিন্তু আধুনিকায়নের অর্থ যদি হয় কওমি মাদ্রাসার স্বতন্ত্র ধর্মীয় পরিচয় মুছে দিয়ে সব প্রতিষ্ঠানকে একই পাঠ্যক্রম ও কাঠামোর অধীন করা, তাহলে বিষয়টি ভিন্ন। তাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাতন্ত্র্য, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ঐতিহ্য রক্ষার প্রশ্ন সামনে আসবে। আলেমরা তাতে সায় দেবেন না।

আমি মনে করি, আধুনিকায়ন ও কওমি স্বাতন্ত্র্যকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসাবে না দেখে দুটির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় হওয়া দরকার। শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে সনদের গ্রহণযোগ্যতা, উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ এবং পেশাগত যোগ্যতার পথ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আরও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

যুগান্তর : কওমি শিক্ষার সংস্কার নিয়ে আলেমদের মধ্যে ঐকমত্য গড়ে উঠছে না কেন? সরকারি নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা, কারিকুলাম, সনদের স্বীকৃতি নাকি নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের প্রশ্ন, কোনটি বড় বাধা?

মুফতি এনায়েতুল্লাহ : উত্তরটা একটু জটিল। দেখুন, এই যে আমি-আপনি কওমি মাদ্রাসা নিয়ে কথা বলছি, এটাও কিন্তু অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তারা তুড়ি মেরে আমার-আপনার কিংবা অন্য কোনো চিন্তাবিদের কথাকে উড়িয়ে দেবেন। তাদের কথা, ‘কওমি মাদ্রাসা নিয়ে যা কথা বলার আমরা (কওমি বোর্ড নেতারা) বলব।’ তাহলে এবার বোঝেন, সংস্কারের বিষয়ে তাদের মতামত কেমন হতে পারে!

কওমি শিক্ষা সংস্কার নিয়ে আলেমদের মধ্যে ঐকমত্য না হওয়ার পেছনে শুধু আধুনিক শিক্ষার প্রতি অনীহা কাজ করছে, এমনটা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ধর্মীয় ঐতিহ্য রক্ষা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা, ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে অবিশ্বাস, পাঠ্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ, সনদের স্বীকৃতি, অর্থায়ন, নেতৃত্ব ধরে রাখা এবং বিভিন্ন কওমি ধারার নিজস্ব চিন্তাগত অবস্থান। মূল জটিলতা হলো, সংস্কার প্রয়োজন কিনা, তার চেয়ে সংস্কার বলতে কী বোঝানো হচ্ছে, কে তা নির্ধারণ করবে এবং এর ফলে কওমি শিক্ষার চরিত্র কতটা বদলাবে, এসব প্রশ্নে মতপার্থক্য বেশি। কওমি শিক্ষাব্যবস্থা একক কোনো প্রতিষ্ঠান বা বোর্ডের অধীনে পরিচালিত নয়। বিভিন্ন বোর্ড, মাদ্রাসা, আলেম ও শিক্ষাধারার মধ্যে পাঠ্যক্রম, ব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতিতে পার্থক্য রয়েছে। তাই একটি প্রস্তাব সবার কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

বড় প্রশ্ন হলো, শিক্ষার সংস্কার কে পরিচালনা করবে? কেন্দ্রীয় কোনো কমিটি, সংশ্লিষ্ট কওমি বোর্ড, প্রবীণ আলেম নাকি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত যৌথ কোনো কমিটি? এসব প্রশ্নে উত্তর যেদিন মিলবে, সেদিন থেকে সংস্কার শুরু হবে। এর বেশি বলা মুশকিল।

যুগান্তর : কওমি শিক্ষার দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা হলেই অনেকে একে কওমিবিরোধিতা মনে করেন, আবার কেউ কেউ সব সমালোচনাকে ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দেন। এ প্রবণতা কি আত্মসমালোচনা ও সংস্কারের পথে বাধা সৃষ্টি করছে?

মুফতি এনায়েতুল্লাহ : কওমি শিক্ষার দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা হলেই একাংশের মধ্যে কওমিবিরোধিতার ধারণা তৈরি হওয়া দুঃখজনক বাস্তবতা। তবে সবাই যে সংশোধনের নিয়তে সমালোচনা করেন, এমন নয়। অনেকে বিরোধিতার নিয়তেই সমালোচনা করেন। ফলে সমালোচনা গ্রহণ করতে না চাওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়েছে।

আমি মনে করি, কোনো মাদ্রাসায় শিক্ষার মান, সনদের কার্যকারিতা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, আর্থিক স্বচ্ছতা কিংবা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এক ধরনের আলোচনা। কিন্তু সেই প্রশ্নের সূত্র ধরে সব কওমি মাদ্রাসা, সব আলেম কিংবা পুরো ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে অযোগ্য বলে উপস্থাপন করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। তবে তথ্যনির্ভর যৌক্তিক সমালোচনাকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। কওমি শিক্ষার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অর্থ কওমি শিক্ষার বিরোধিতা করা নয়। বরং যে সমালোচনা তথ্যনির্ভর, ন্যায়সংগত ও সমাধানমুখী-তা শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে।

যুগান্তর : ইমামতি, খতিব, শিক্ষকতা ও দাওয়াহর বাইরে ইসলামি অর্থনীতি, শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকিং, গণমাধ্যম ও গবেষণায় কওমি শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ কীভাবে বাড়ানো যায়?

মুফতি এনায়েতুল্লাহ : প্রচলিত ধারণার বাইরে কওমি শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর জন্য সম্মিলিত উদ্যোগ দরকার। সেইসঙ্গে দরকার শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রাপ্ত স্বীকৃতিকে কাজে লাগানো। কওমি সনদের স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও কর্মবাজারে তা উপেক্ষিত। এ বাস্তবতা অনুধাবন করা জরুরি। এ সমস্যার সমাধানের পর পেশাভেদে প্রয়োজনীয় দক্ষতা বাড়াতে পারলে কর্মসংস্থান বাড়বে বলে মনে করি।

যুগান্তর : কওমি শিক্ষার স্বকীয়তা বজায় রেখে সরকার কীভাবে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, গবেষণা, বৃত্তি ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়াতে পারে? সংস্কার কি আলেমদের নেতৃত্বে হওয়া উচিত?

মুফতি এনায়েতুল্লাহ : কওমি শিক্ষায় সরকারি হস্তক্ষেপের আশঙ্কার চেয়ে ঐতিহ্য ও আধুনিক চাহিদার মধ্যে সেতুবন্ধের অভাব বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারের দায়িত্ব ন্যায্য নীতি ও সহায়তার কাঠামো তৈরি করা, শিক্ষা বোর্ডগুলোর দায়িত্ব মান ও সনদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা এবং মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের দক্ষতা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা। সংস্কার হওয়া উচিত আলেমদের নেতৃত্বে, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়ায়-যাতে কওমি শিক্ষার স্বকীয়তা অক্ষুণ্ন রেখে শিক্ষার্থীদের অধিকার ও সক্ষমতা বাড়ে।

যুগান্তর : আগামী ১০ বছরে কওমি শিক্ষাকে কোথায় দেখতে চান? স্বকীয়তা বজায় রেখে যুগোপযোগী করতে জরুরি পদক্ষেপ কী?

মুফতি এনায়েতুল্লাহ : আগামী ১০ বছরে কওমি শিক্ষাকে দারুল উলুম দেওবন্দের আধ্যাত্মিকতা ধারণকারী, মানসম্মত ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা হিসাবে দেখতে চাই। যেখানে ইসলামি জ্ঞানের গভীরতার পাশাপাশি আধুনিক দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকবে। এজন্য তিনটি পদক্ষেপ জরুরি-শিক্ষকদের মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং সনদের কার্যকর স্বীকৃতির মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার পথ প্রসারিত করা।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

সাক্ষাৎকারে- মুফতি এনায়েতুল্লাহ স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও কওমি সনদ কর্মবাজারে উপেক্ষিত

স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও কওমি সনদ কর্মবাজারে উপেক্ষিত

মমতার পরশে জেগে উঠুক আত্মশুদ্ধির বোধ

মমতার পরশে জেগে উঠুক আত্মশুদ্ধির বোধ

ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তার পথিকৃৎ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)

ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তার পথিকৃৎ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)

বিলালের আজানের স্মৃতি : নজরুলের আত্মজাগরণের সুর

বিলালের আজানের স্মৃতি : নজরুলের আত্মজাগরণের সুর

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম