মমতার পরশে জেগে উঠুক আত্মশুদ্ধির বোধ
Advertisement
আহনাফ আবদুল কাদির
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইমাম গাজালি (রহ.)-এর একটি উক্তি আছি। তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘নামাজ ত্যাগকারীর বিধান কী?’ উত্তরে তিনি বলেন, ‘তাকে মসজিদে নিয়ে যাওয়াই তোমার করণীয়।’ তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, কোনো মানুষ বিপথে চলে গেলে, তাকে সমাজ থেকে দূরে ঠেলে দেওয়া যাবে না। তার ওপর শুধু বিধানের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া প্রকৃত সমাধান নয়। বরং প্রকৃত সমাধান হলো, তাকে পরম মমতায় হাত ধরে আলোর পথে ফিরিয়ে আনা। অপরাধীকে ঘৃণা না করে তার অপরাধবোধকে দূর করার চেষ্টা করাই হলো ইসলামের মূল শিক্ষা। কেউ নামাজ পড়ে না বলে তাকে শুধু তিরস্কার না করে, তার মধ্যে নামাজের আগ্রহ তৈরি করা এবং তাকে মসজিদমুখী হতে সাহায্য করাই প্রকৃত ইমানদারের দায়িত্ব।
কাউকে সংশোধন করতে গিয়ে আমরা অনেক সময় এমন আচরণ করি, যা তাকে আরও দূরে সরিয়ে দেয়। কেউ নামাজে অনিয়মিত হলে তাকে খোঁটা দিই। কেউ ভুল করলে সবার সামনে অপমান করি। কেউ আমাদের কথা না শুনলে তাকে খারাপ মানুষ বলে চিহ্নিত করি। আমাদের এমন আচরণে ব্যক্তি সংশোধনের পথে না এসে ইসলাম বিধিবিধান থেকে যোজন যোজন দূরে সরে যাচ্ছে।
কাউকে ভালো কথা বলা অবশ্যই প্রয়োজন। অন্যায়ের প্রতিবাদ করাও জরুরি। কিন্তু কথা বলার ধরনটি গুরুত্বপূর্ণ। আকর্ষণীয় ও কোমল স্বরে কথা বলার মাধ্যমে ব্যক্তির মন জয় করা যায় সহজে। কর্কশ ও কঠোর ভাষা বললে সে তা প্রত্যাখ্যান করতে পারে। তাই সত্য কথা বলার পাশাপাশি মানুষের মন বোঝার চেষ্টাও করতে হবে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা রাসূলুল্লাহ (সা.)কে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের প্রতি কোমল হয়েছিলেন। আপনি যদি রূঢ় ও কঠোরচিত্ত হতেন, তবে তারা আপনার চারপাশ থেকে সরে পড়ত।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৫৯)। এ আয়াত থেকে আমরা বুঝতে পারি, মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ করা এবং কোমল ভাষায় কথা বলা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। কাউকে সঠিক পথে ডাকতে হলে তার সঙ্গে এমন আচরণ করতে হবে যাতে সে কথা শুনতে আগ্রহী হয়। উপদেশের উদ্দেশ্য যেন না হয় কাউকে অপমান করা। যেন সংশোধনের জন্যই হয় উপদেশ।
ভারতবর্ষে ইসলাম প্রচারে ওলি-আউলিয়াদের আধ্যাত্মিক সংস্কারের মূল ভিত্তিই ছিল মানুষকে কাছে টেনে নেওয়া। তারা লঙ্গরখানার মাধ্যমে সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত এবং অপরাধপ্রবণ মানুষদেরও কাছে টেনে নিতেন। তাদের সঙ্গে একত্রে বসে খাবার খেতেন। পরম মমতায় তাদের ধর্মের মর্মবাণী শিখাতেন। তিরস্কারের বদলে এই অকৃত্রিম ভালোবাসাই হাজার হাজার মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে এসেছিল।
আজ আমাদের সমাজে এই দরদ ও সহানুভূতির বড় অভাব। কেউ কোনো অপরাধ করলে তাকে সংশোধনের সুযোগ না দিয়ে চিরতরে অন্ধকার জগতের দিকে ঠেলে দিই। কাউকে দূরে ঠেলে দেওয়া খুব সহজ। কিন্তু বুকে টেনে নিয়ে তার ভুল সংশোধন করা কঠিন। সমাজকে সুন্দর করতে হলে আমাদের ফতোয়াবাজি বা বর্জনের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। অপরাধীকে নয়, অপরাধকে ঘৃণা করতে হবে। আসুন, ইমাম গাজালি (রহ.)-এর সেই অমর বাণীকে ধারণ করে মানুষকে দূরে সরিয়ে না দিয়ে বরং ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করে সঠিক ও সুন্দর পথে ফিরিয়ে আনি। তবেই গড়ে উঠবে একটি শান্তিময় সুশীতল আদর্শ সমাজ।
লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট
