Logo
Logo
×

Advertisement

শেষ পাতা

জনমনে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে আন্দোলনের ‘ডিপফেক’

সামাজিক মাধ্যমে আ.লীগের এআই’র ভুয়া ছবির প্রচারণা

বিভ্রান্ত হচ্ছে মানুষ: প্রোপাগান্ডার অডিও-ভিডিও ঘিরে ছড়ানো হচ্ছে উৎকণ্ঠা * ২ বছর আগের ভিডিও, জুলাই আন্দোলনের ছবি, এমনকি অন্য রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি নিজেদের বলে এআই প্রযুক্তি দিয়ে ব্যবহার

Advertisement

সাইফ আহমাদ

সাইফ আহমাদ

প্রকাশ: ১১ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সামাজিক মাধ্যমে আ.লীগের এআই’র ভুয়া ছবির প্রচারণা

Advertisement

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরোনো ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে জনমনে বিভ্রান্তি ও আতঙ্ক ছড়ানোর সর্বাত্মক অপচেষ্টা করছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ। দলের ঘনিষ্ঠ কয়েকটি ফেসবুক পেজে কখনো বিএনপির সমাবেশ, কখনো জুলাই আন্দোলনের উত্তাল মিছিল কিংবা অন্য দেশের রাজনৈতিক কর্মসূচির ছবি এবং ভিডিও নিজেদের বলে প্রচার করা হচ্ছে। এর অংশ হিসাবে দলের দুষ্কৃতকারীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি ‘ডিপফেক’ ভিডিও এবং এডিটেড ছবি দিয়েও ভুয়া প্রচারণা চালাচ্ছে।

৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর পর নিজ দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, শোক দিবস বা যে কোনো ধরনের আয়োজন করার নৈতিক শক্তি হারিয়ে ফেলেছে দলটি। তবে মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য কখনো মুখে মাস্ক পরে, কখনো পুরোনো ফুটেজ ব্যবহার করে আন্দোলন দেখানোর মতো কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা অনলাইনে ছড়ানো হয়। এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশের মানুষকে চরমভাবে বোকা বানানো হচ্ছ। ১৩ নভেম্বর আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রায়ের তারিখ সামনে রেখে সম্প্রতি দেশে-বিদেশে ভয়ানক অপপ্রচার চালাচ্ছে দলটি। এ তালিকায় বিদেশে পলাতক নেতাদের সঙ্গে ভারতে পলাতক শেখ হাসিনাও যুক্ত হয়ে পড়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা দেখাতে চায়, দেশের অনেক মানুষ এখনো আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছে। তারা আন্দোলনের ডাক দিলে মানুষ সাড়া দেবে। কার্যত দেশের মানুষ দলটির ওপর চরম ক্ষুব্ধ। বিশেষ করে ১৬ বছরের দুঃশাসন, গুম, খুন, রাতের ভোট, ডামি ভোট ও গণতন্ত্র কেড়ে নিয়ে স্বৈরতন্ত্র কায়েমের বিরুদ্ধে সোচ্চার সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মন থেকে উঠে গেছে দলটি। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জুলাই আন্দোলনের সময়ে গণহত্যা। চোখের সামনে ভাসছে আওয়ামী লীগের অপরাধের সব দৃশ্য। এমন অবস্থায় দেশের মানুষ যখন শেখ হাসিনাসহ দলটির সব খুনি ও দুর্নীতিবাজদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার, তখন দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরাতে তারা অপকৌশল হাতে নিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফ্যাক্ট যাচাইয়ে প্রমাণিত হয়েছে জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য মিছিল মিটিং বা সমাবেশের যেসব ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছাড়া হচ্ছে সেগুলো ফেক।

ভিডিওগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোনোটি ২ বছরের পুরোনো, আবার কোনোটি বিএনপি বা অন্য দলের সমাবেশের ভিডিও। আবার জুলাই আন্দোলনের ভিডিওকেও নিজেদের মিছিল বলে চালানো হচ্ছে। গোপালগঞ্জের ঘটনাও এখনকার বলে চালানো হচ্ছে। ছবি একই রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে স্লোগান ও কণ্ঠ নকল করে ‘জয় বাংলা’ অথবা ‘শেখ হাসিনা ফিরবে বীরের বেশে’ অডিও জুড়ে দেওয়া হচ্ছে।

সর্বশেষ সোমবার (১০ নভেম্বর) ‘সাপোর্টার্স অব বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’ নামের ফেসবুক গ্রুপ থেকে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। সেখানে ক্যাপশন দেওয়া হয়-‘ক্যাঙ্গারু কোর্টের মব ট্রায়াল, বাংলাদেশে চলবে না। ১৩ তারিখের ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচি সফল করতে তৃণমূলের কর্মীরা জেগে উঠেছে, বজ কণ্ঠে দিচ্ছে স্লোগান।’ তবে ভিডিওটির ফ্যাক্ট-চেক করে দেখা গেছে, এটি মূলত দুই বছর আগের, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার একটি বিক্ষোভ মিছিলের ফুটেজ। ভিডিওতে ব্যবহৃত ব্যানারটি চালাকি করে ঝাপসা করা হয়েছে, যাতে লেখা স্পষ্ট দেখা না যায়। মিছিলে যেসব নেতাকর্মীকে দেখা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে অনেকেই বর্তমানে পলাতক, আর কেউ কেউ দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। এর আগে ‘অল্প কিছুক্ষণ আগে যমুনার সামনে আওয়ামী লীগের মিছিল’ এমন ক্যাপশনসহ একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তবে যাচাই করে দেখা গেছে, প্রচারিত ভিডিওটি সাম্প্রতিক সময়ের নয়। এটি আওয়ামী লীগের কোনো মিছিলেরও নয়। ভিডিওটি গত মে মাসে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন ‘যমুনা’র সামনে আয়োজিত এক ছাত্র-জনতার অবস্থান কর্মসূচির দৃশ্য। যেখানে তারা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধের দাবিতে বিক্ষোভ করেছিল।

এছাড়া ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’ নামের ফেসবুক পেজ থেকে ঢাকায় ‘গণসমুদ্র’ ক্যাপশনে একটি ভিডিও লাখ লাখ ভিউ হয়। যেখানে দেখা যায়, লাখো মানুষের একটি মিছিল। আদতে এই ভিডিওটি এআই জেনারেটেড। বর্তমানে আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গসংগঠনের ঝটিকা মিছিলের কয়েকটি খবর গণমাধ্যমে আসে, সেখানে সর্বোচ্চ ১০-১৫ জনের উপস্থিতির খবর পাওয়া গেলেও সামাজিক মাধ্যমে এডিট করে সেটিকে লাখ লাখ মানুষের ঢল বলে চালানো হচ্ছে।

এএফপির ফ্যাক্ট-চেক এডিটর ইয়ামিন সাজিদ যুগান্তরকে বলেন, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে গ্রেফতার আতঙ্কে গা ঢাকা দিয়ে আছে। এমন পরিস্থিতিতে আন্দোলনের পুরোনো ছবি ও ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেশে অবস্থানরতদের জড়ো করার ছক করছে দলটি। এমনকি হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপি, জামায়াত এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের বিক্ষোভ সমাবেশের পুরোনো ভিডিও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে নিজের আন্দোলনের চিত্র দাবি করে ছড়াচ্ছে।

একটি এআই জেনারেটেড ফোনকল কীভাবে বদলে দিতে পারে ভোটার মাইন্ডসেট তার জ্বলন্ত উদাহরণ যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচন। সেখানে একটি ডিপফেক ফোনকল ভাইরাল হয় যেখানে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কণ্ঠে ভোটারদের ভোট না দেওয়ার আহ্বান শোনা যায়। পরে প্রমাণিত হয় এটি এআই দিয়ে বানানো হয়েছিল।

বিশ্বের অনেক দেশেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে রয়েছে সুস্পষ্ট আইন, নীতিমালা, নির্বাহী আদেশ ও কৌশলগত দিকনির্দেশনা। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন ও ভারত-সব দেশই এ বিষয়ে নীতিমালার পথে এগিয়েছে। এসব কাঠামোর মাধ্যমে কোথায় এআই ব্যবহার করা যাবে, কোথায় নয়-তা নির্ধারিত। অপব্যবহার ঠেকাতেও রয়েছে কার্যকর ব্যবস্থা। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো এআই ব্যবহারের জন্য নেই কোনো সমন্বিত আইন, গাইডলাইন, পলিসি বা স্ট্র্যাটেজি। ফলে প্রযুক্তির এই অগ্রযাত্রার মুখে দেশের প্রস্তুতি অপ্রতুল বলে মনে করছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও রাজনীতিবিদরা।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ একেএম ফাহিম মাশরুর যুগান্তরকে বলেন, প্রযুক্তি জীবনকে সহজ করে তোলে, তেমনি নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। বাস্তবতার সঙ্গে সাদৃশ্যহীন কোনো ছবি বা ভিডিও যদি এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি হয় এবং তা কারও মানহানি বা বিভ্রান্তির কারণ হয়, সেক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণহীন এআই ব্যবহারের ঝুঁকি সুস্পষ্ট। নীতিমালা না তৈরি হলে সামনে এ ধরনের ঘটনা আরও বাড়বে।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

শুধু অতিপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনে টিকে থাকার চেষ্টা বাজারজুড়ে শুধুই দীর্ঘশ্বাস

বাজারজুড়ে শুধুই দীর্ঘশ্বাস

মেগা সংস্কারে হারানো রূপে ‘সিন্দুরমতি’

মেগা সংস্কারে হারানো রূপে ‘সিন্দুরমতি’

অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আইএমএফের বৈঠক আর্থিক খাত সংস্কারের শর্তে মিলবে ঋণ

আর্থিক খাত সংস্কারের শর্তে মিলবে ঋণ

নাসিরাবাদে সাইফুলের বেপরোয়া চাঁদাবাজি

নাসিরাবাদে সাইফুলের বেপরোয়া চাঁদাবাজি

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম