ইচ্ছামতো কাজ করছেন ঠিকাদার
দিরাই-শাল্লা সড়ক নির্মাণে লুটপাট
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সুনামগঞ্জে দিরাই-শাল্লা সড়ক নির্মাণে নজিরবিহীন লুটপাট চলছে। কাজ হচ্ছে অত্যন্ত নিুমানের। দুর্গম এলাকা হওয়ায় কাজ তদারকিতে যাচ্ছেন না সড়ক ও জনপথের (সওজ) কর্মকর্তারা। এই সুযোগে বারবার মূল নকশা পরিবর্তন করার উদ্যোগ নিচ্ছে মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিলেটের জন্মভূমি। সওজের কর্মকর্তারাও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে যাচ্ছেন। এদিকে সঠিক তদারকির অভাবে কাজটি এবারও ঝুলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে এই কাজের মেয়াদ বেড়েছে ২৭ সাল পর্যন্ত। এ অবস্থায় সুনামগঞ্জ জেলা শহর থেকে শাল্লা উপজেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপন আবারও হুমকির মুখে পড়েছে। ২০০৯ সালে এই সড়ক নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও দুর্নীতির কারণে বারবার হোঁচট খাচ্ছে।
জানতে চাইলে সড়ক ও জনপথের (সওজ) সিলেটের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবু সাইদ মো. নাজমুল হুদা যুগান্তরকে বলেন, কাজ বাস্তবায়নে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। যেসব শর্ত পূরণ করতে বলা হয়েছে ঠিকাদারকে, ঠিক ওইভাবেই বুঝিয়ে দিতে হবে। আর সুনামগঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা পরিদর্শনে গাফিলতি করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাজ বাস্তবায়ন নিয়ে কোনো শৈথিল্য বরদাশত করা হবে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘৬১৮ কোটি টাকার এই প্রকল্পে ১৭১ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ঠিকাদারকে পরিশোধ করা হয়েছে ৫৪ কোটি টাকা। জমি অধিগ্রহণ নিয়ে সমস্যা হওয়ায় কাজের গতি কিছুটা কম হতে পারে।’
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, জন্মভূমি নির্মাতা ও নির্মিতি নামের দুটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে কাজটি করছে। প্রতিষ্ঠান দুটির মালিক তিনজন। এর মধ্যে লুৎফুর রহমান বর্তমানে পলাতক। তিনি কানাডায় আছেন। সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন তিনি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বেশ কয়েকটি মামলায় তাকে আসামি করা হয়েছে।
অপর মালিক ওহিদুজ্জামান বাবুল। তিনি ব্যবসায়ী হিসাবে পরিচিত হলেও আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেতা ডাকুসর সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুরের ছেলের শ্বশুর। এই প্রতিষ্ঠানে আবুল কালাম নামে আরেকজন আছেন। তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। সিলেটের আলোচিত ঠিকাদার লুৎফুর রহমানের অবর্তমানে বাবুল ও কালাম দিরাই-শাল্লা সড়কের চলমান কাজ যেনতেনভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন।
নথিপত্রে দেখা যায়, শাল্লা উপজেলা একটি পশ্চাৎপদ অঞ্চল। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও শুকনো মৌসুমে হেঁটে, আর বর্ষায় নৌকায় চলাচল করেন এখনকার মানুষ। দিরাই উপজেলা থেকে মাত্র ১৯ কিলোমিটারের দূরত্ব ঘোচাতে আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণে ৬১৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় সওজ। নির্মাণাধীন ওই প্রকল্পে বারবার অ্যালাইনমেন্ট পরিবর্তনের উদ্যোগ নিচ্ছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। পরিকল্পিতভাবে জমির মালিকদের টাকা দিয়ে সড়ক নির্মাণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে অনুমোদিত অ্যালাইনমেন্ট থেকে সরে গিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
জানা যায়, অনিয়ম ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে ২০১৭ সালে অসম্পূর্ণ অবস্থায় প্রকল্পটি সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। পরে এলাকাবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের ১৪ জুন নতুন করে প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পায়। ২০২৩ সালের ২৮ মে পুনরায় নির্মাণকাজ শুরু হয়। চারটি প্যাকেজে প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৬২৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২৫ সালে।
এলাকাবাসীর তথ্যমতে, চলমান কাজের অ্যালাইনমেন্ট অনুসারে সওজ জরিপও সম্পন্ন করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সন্তোষপুর গ্রামের পশ্চিম অংশে হাওড়রক্ষা বাঁধ মাছুয়া কারায় একটি সেতু নির্মাণের কথা ছিল। স্থানীয়দের মতে, মাটির সমস্যার কারণে সেতুটি সামান্য ডানদিকে সরিয়ে নির্মাণের প্রস্তাব ছিল। কিন্তু ২০২৩ সালে প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার পর কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই প্রায় ৬ কিলোমিটার অগ্রসর হয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হাওড়ের মাঝখান দিয়ে সড়ক নির্মাণ শুরু করে। এলাকাবাসী এর প্রতিবাদ জানায়। তাদের দাবি, ডিপিপি প্রণয়নের সময় হাওড়ের মাঝখান দিয়ে (উঁচু গোপাট বরাবর) সড়ক নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা ছিল না।
নতুন অ্যালাইনমেন্ট অনুযায়ী ভূমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হলে এলাকাবাসী আগের অনুমোদিত এলাইনমেন্টে সড়ক নির্মাণের দাবিতে আন্দোলনে নামেন। এলাকাবাসীর পক্ষে ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে লিখিত আবেদন দেওয়া হয়। আবেদনে উল্লেখ করা হয়, পূর্বনির্ধারিত অ্যালাইনমেন্ট উপেক্ষা করে প্রায় আধা কিলোমিটার পশ্চিম দিকে সড়ক নেওয়া হলে দিরাই উপজেলার ৫নং সরমঙ্গল ও ৮নং তাড়ল ইউনিয়নের সন্তোষপুর, তলবাউসী, বাউসী, রাজনগর, নোয়াগাঁও ও চন্দ্রপুর গ্রাম এবং টেলিফোন ও শারফিন বাজার সড়ক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। যদিও অনুমোদিত প্রকল্পে এসব এলাকা সংযুক্ত করার কথা রয়েছে। পাশাপাশি হাওড় বরাবর সড়ক নির্মাণ হলে হিন্দু সম্প্রদায়ের দেবোত্তর জমি ও শ্মশানঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হবে মর্মে তারাও আপত্তি জানায়।
জানা যায়, অ্যালাইনমেন্ট পরিবর্তনের পেছনে মূলত অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্য রয়েছে। অনুমোদিত অ্যালাইনমেন্ট অনুযায়ী সড়ক নির্মাণ করলে ফসলি জমি অধিগ্রহণ ও ব্যাপক মাটি ভরাটের প্রয়োজন হবে। কিন্তু হাওড় বরাবর সড়ক নেওয়া হলে জমি অধিগ্রহণ ছাড়াই কম মাটি ভরাটে প্রায় ১০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় সাশ্রয় সম্ভব। যা সওজ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিলে আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি ছিল (তৎকালীন) সংসদ-সদস্য জয়া সেন গুপ্তার সঙ্গে আলোচনা করেই অ্যালাইনমেন্ট পরিবর্তন করা হয়েছে এবং প্রথমদিকে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অনুমোদনের বাইরে গিয়ে কাজের চেষ্টা করা হয়।
এলাকাবাসীর অনুরোধে ২০২৪ সালের মার্চে প্রতিবেদক সরেজমিন পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও ঠিকাদারদের সঙ্গে কথা বলেন। ওই সময় আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়। মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে সুনামগঞ্জের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম, ঠিকাদার লুৎফুর রহমান ও ওহিদুজ্জামান বাবুলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি সংশ্লিষ্ট এলাকা পরিদর্শন করেন। সেখানে সরকারের অনুমোদিত অ্যালাইনমেন্ট অনুযায়ী সড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। তবে মাছুয়া কারার সেতুটি ইতোমধ্যে প্রায় আধা কিলোমিটার পশ্চিমে নির্মাণ অগ্রসর হওয়ায় সেতুর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সড়কের কাজটি শেষ করার কথা বলা হয়। ওই সময় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যালাইনমেন্ট পরিবর্তনের ভুল স্বীকার করে সরকার কর্তৃক অনুমোদিত অ্যালাইনমেন্ট অনুযায়ী আগের সড়কটি সংযোগ সড়ক হিসাবে সংস্কারের অঙ্গীকার করে।
কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর আবার হাওড় বরাবর সড়ক নির্মাণের চেষ্টা শুরু হয়। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদার ওহিদুজ্জামান বাবুল নিজেকে বিএনপিপন্থি দাবি করে ইচ্ছামতো কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে বাধা পেয়ে তিনি কিছু জমির মালিককে কয়েক লাখ টাকা করে দেন যাতে তারা ফসলি জমির ওপর দিয়ে সড়ক নির্মাণের বিরোধিতা করেন। এর অংশ হিসাবে ওহিদুজ্জামান বাবুল ৮নং তাড়ল ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ড মেম্বার ও তলবাউসী গ্রামের বাসিন্দা কবির হোসেনকে টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তবে কবির হোসেন ঠিকাদারের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সড়কটি অনুমোদিত অ্যালাইনমেন্ট অনুযায়ী নির্মাণের দাবি জানান।
এ বিষয়ে কবির হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ‘ঠিকাদার বাবুল আমাকে সিলেটে ডেকে ৫ লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তিনি আমাকে জানান ইতোমধ্যে অনেককেই ম্যানেজ করেছি। তখন আমি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেই, টাকার বিনিময়ে আমি বিক্রি হই না। এলাকার মানুষের স্বার্থে সড়কটি সরকারের অনুমোদিত অ্যালাইনমেন্ট অনুযায়ীই নির্মাণ করতে হবে।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ওহিদুজ্জামান বাবুলের মোবাইলে ফোন করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। এছাড়া জন্মভূমি নির্মাতার পক্ষে দায়িত্বরত প্রকৌশলী মনিরুল ইসলামকেও ফোন দেওয়া হয়েছে। তিনিও রিসিভ করেননি।

