|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের মূল শুটার ফয়সাল করিম মাসুদসহ তিন আসামি ভারতীয় পুলিশের কাছে গ্রেফতারের প্রায় এক মাস পার হতে চলছে। তাদের বাংলাদেশে ফেরাতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তির অধীনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আসামিদের দেশে ফেরত চেয়ে চিঠি প্রদানসহ সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছে বাংলাদেশ। এখন ভারত সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছে বাংলাদেশ। আইনি জটিলতার কারণে তিন আসামিকে শিগগিরই দেশে ফেরানো কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তারা বলছেন, হাদির খুনিরা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি প্রথম থেকে ওই দেশের সরকার অস্বীকার করে। তবে চলতি বছরের ৭ মার্চ বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ এলাকা থেকে ফয়সাল ও আলমগীরকে গ্রেফতার করে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের (এসটিএফ)। দুই আসামির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফিলিপ সাংমাওকে গ্রেফতার করা হয়। এই তিন আসামির বিরুদ্ধে ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশের পাশাপাশি আইনবর্হিভূত কার্যক্রম প্রতিরোধ আইনের (ইউএপিএ) ১৬ ও ১৮ ধারায় মামলা করা হয়েছে। সে মামলার তদন্ত চলমান। সে দেশে তাদের বিচার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন বেশ কিছু নজির রয়েছে উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঝিনাইদহ-৪ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক সংসদ-সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার ২০২৪ সালের মে মাসে ভারতের কলকাতায় নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। বাংলাদেশ থেকে ভারতে ডেকে নিয়ে এমপি আনারকে খুন করা হয়। বাংলাদেশী দুই খুনি ভারতে গ্রেফতারের পর এখনো ফেরত দেয়নি ভারত সরকার।
ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কুশীলবরা এখনো আড়ালেই। এই হত্যাকাণ্ডে পেছনে কারা ছিল, আর্থিক সহায়তা কারা দিয়েছে, দেশে সংসদ নির্বাচনের আগে কেন এই হত্যাকাণ্ড- তা এখনো স্পষ্ট হয়নি। ওসমান হাদির মূল শুটার ফয়সাল করিম মাসুদকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে বেরিয়ে আসবে হত্যার পেছনে কারা। এমনটাই মনে করছেন গোয়েন্দারা। আইনি জটিলতার কারণে এই মুহূর্তে তিন আসামিকে ফেরাতে না পারলেও পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি টিম ভারতে গিয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেও মামলার অগ্রগতি হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পুলিশের সাবেক আইজি আব্দুল কাইয়ুম যুগান্তরকে বলেন, ভারতে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করে আসামিদের ফেরত দেবে কিনা-সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তবে দুই দেশের মধ্যে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে ওসমান হাদি হত্যার আসামিদের দেশে ফেরানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। দুই দেশের বোঝাপড়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে পুলিশের একটি টিম ভারত গিয়ে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে।
এদিকে ওসমান হাদির খুনিদের ভারত থেকে দ্রুত ফিরিয়ে বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ওসমান হাদি হত্যা মামলার বাদী ও ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের। তিনি যুগান্তরকে বলেন, শহীদ ওসমান হাদির খুনিদের ১৫ দিনের মধ্যে ভারত থেকে ফেরাতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণসহ সরকারের কাছে গত ২২ মার্চ ৬ দফা দাবি জানিয়েছি। কিন্তু আসামিদের ফেরত আনার বিষয়ে সরকারের আগ্রহ দেখছি না। জাতিসংঘের অধীনে যে তদন্ত হওয়ার কথা ছিল তার আপডেটও আমাদের জানানো হয়নি। সবকিছুর একটি ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। খুনিদের ফিরিয়ে আনার দাবিতে আমরা অচিরেই রাজপথে নামব।
ওসমান হাদি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন। এ জন্য তিনি গণসংযোগ করেন। গত বছর ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের কিছুক্ষণ পর রাজধানীর পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে রিকশায় থাকা ওসমান হাদিকে গুলি করে খুনিরা মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায়। ওসমান হাদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সে দেশে ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান।
ছাত্র-জনতার দাবির মুখে ঢাকা মহানগর পুলিশের কর্মকর্তারা সংবাদ সম্মেলন করে জানান, ওসমান হাদির মূল শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল। আর ঘটনার সময় ফয়সালকে মোটরসাইকেলে বহন করেন আলমগীর হোসেন। তারা দুজনই ঘটনার দিন রাতে ভারতে পালিয়ে যায়। ফয়সাল ও আলমগীরকে ভারতে পালাতে সহায়তা করে সীমান্তে চোরাচালানে জড়িত ফিলিপ সাংমাও।
এদিকে ওসমান হাদি হত্যা মামলায় দেশে এখন পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ওসমান হাদিকে হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্রও উদ্ধারের দাবি করা হয়। এ হত্যা মামলায় গত ৭ জানুয়ারি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ ১৭ জনকে আসামি করে চার্জশিট দিয়েছিল। তখন সংবাদ সম্মেলন করে ডিবি জানিয়েছিল, রাজনীতির কারণেই ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও মিরপুর এলাকার সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরীর (বাপ্পী) নির্দেশনা ও পরিকল্পনায় শরিফ ওসমান বিন হাদিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওসমান হাদিকে শুট করেছিল ফয়সাল। তাকে সহযোগিতা করে আলমগীর হোসেন। ফয়সাল করিম ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও আলমগীর আদাবর থানা যুবলীগের কর্মী। হাদি হত্যার পর প্রধান দুই আসামিকে দেশত্যাগের ব্যবস্থা করে দেয় সাবেক কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম।
তবে ওসমান হাদি হত্যা মামলার বাদী ও ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের ডিবির চার্জশিট নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি আদালতে নারাজি আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত মামলাটি অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন। এখন মামলার তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সিআইডিও তদন্ত প্রক্রিয়ায় তেমন এগোতে পারেনি।
ওসমান হাদি হত্যা মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট সিআইডির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ওসমান হাদি হত্যার ঘটনায় জড়িত তিন আসামি ভারতে গ্রেফতার হওয়ার পর থেকেই ‘বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি’র আওতায় তাদের দেশে ফেরাতে চেষ্টা অব্যাহত আছে।
তিন আসামিকে সহসা দেশে ফেরত আনার সম্ভাবনা ক্ষীণ উল্লেখ করে সিআইডি কর্মকর্তা বলেন, ভারতের আইন ভঙ্গ করায় তারা (হাদির হত্যার আসামিরা) গ্রেফতার হয়েছে। ওই মামলায় বিচার প্রক্রিয়া শেষ করে দেশে পাঠাবে নাকি তদন্তপর্যায়ে বাংলাদেশে পাঠাবে-এটা ভারত সরকারের ওপর নির্ভর করছে।
সূত্র বলছে, ভারতে গ্রেফতার তিন আসামিকে দিল্লিতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ভারতের ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ)। আদালতের অনুমতি নিয়ে গত ২৩ মার্চ তাদের গোপনে দিল্লিতে স্থানান্তর করা হয়।

