রাউজানে যুবদল নেতা মাসুদ হত্যা
সব খুনি শনাক্ত, গ্রেফতার সন্দেহভাজন জাকির
চট্টগ্রাম ব্যুরো
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চট্টগ্রামের রাউজানে দিনদুপুরে প্রকাশ্যে ফিল্মিস্টাইলে যুবদল নেতা মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদকে গুলি করে হত্যার তিন দিন পরও থানায় মামলা হয়নি। তবে এ ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসাবে জাকির হোসেন (৪২) নামে একজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মাসুদ হত্যায় জড়িত রায়হানসহ তার বাহিনীর সদস্যদের হন্যে হয়ে খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাদের হাতে থাকা ভিডিও ফুটেজ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করছে। হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েই রায়হান বাহিনীর সদস্যরা রাউজান-রাঙ্গুনিয়ার পাহাড়ে আত্মগোপনে চলে যায়। তাই তাদের গ্রেফতার করা কঠিন হয়ে পড়ে বলে জানায় পুলিশ। চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেছেন, যুবদল নেতা রায়হান হত্যাকাণ্ডে জড়িত সব খুনির পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন তারা। তাদের ধরতে সর্বোচ্চ শ্রম দেওয়া হবে। এদিকে রাউজান-রাঙ্গুনিয়া এবং শহরে রায়হান বাহিনীর একের পর এক নৃশংসতায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন বিএনপি নেতারা। রায়হান বাহিনী যাকে টার্গেট করছে তাকে মুহূর্তেই হত্যা করে সটকে পড়ছে। ৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১০টি হত্যাকাণ্ডে এই বাহিনীর সদস্যরা জড়িত বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাদের হাতে একে-৪৭ রাইফেল, চায়নিজ রাইফেলসহ ভয়ংকর সব অস্ত্র রয়েছে। পুলিশ ইতোমধ্যে যে পাঁচজনের নাম-পরিচয় শনাক্ত করেছে তাদের সবাই বিএনপির নাম ব্যবহার করছে। যদিও বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে সন্ত্রাসীদের কোনো দল নেই। তারা নিজেদের স্বার্থেই বিএনপি এবং নেতাদের নাম ব্যবহার করে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে জানা গেছে, পুলিশ যেসব ঘাতকের পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে তাদের নাম এজাহারে উল্লেখ করতে হবে। তাই মামলা দায়েরে সময় নেওয়া হচ্ছে।
শনিবার দুপুরে রাউজানের পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারে মাকসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনি রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। রাঙ্গুনিয়ার সংসদ-সদস্য বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হুম্মাম কাদের চৌধুরীর অনুসারী ছিলেন। ওই ঘটনার পর সন্দেহভাজন হিসাবে জাকির নামে একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। হত্যা মামলা না থাকায় তাকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখানো হয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া পাঁচজনই সশস্ত্র ছিল। তাদের মধ্যে দুজনের হাতে শটগান এবং তিনজনের হাতে পিস্তল ছিল। গুলির মুখে প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে একটি দোকানের সামনে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেন মাসুদ। সেখানে তাকে কয়েক রাউন্ড গুলি করা হয়। পরে হামলাকারীদের দুজন তার মাথায় গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। প্রাপ্ত ভিডিও ফুটেজ, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা ও নিজস্ব গোয়েন্দার মাধ্যমে ঘাতকদের শনাক্ত করা হয়েছে। ঘাতকরা হচ্ছে-জাভেদ, ধামা ইলিয়াছ, দিদার, আফসার ও ইউসুফ। এরা সবাই সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ ও তার সেকেন্ড ইন কমান্ড রায়হানের সহযোগী। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখল-বেদখল কেন্দ্র করে তারা রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে সন্ত্রাসী যাকেই টার্গেট করছে তাকেই খুন করছে। বিদেশে বসে সন্ত্রাসী সাজ্জাদ তার অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণ করছে।
কে এই রায়হান : জানা গেছে, রায়হানের বাবার নাম বদিউল আলম। তার বাড়ি রাউজানে। বয়স ৩০ থেকে ৩৫। তার বাহিনীতে ২০ থেকে ২২ ভয়ংকর সন্ত্রাসী রয়েছে। তাদের মধ্যে বোরহান উদ্দিন, নেজাম উদ্দিন, আলাউদ্দিন, হেলাল ওরফে মাছ হেলাল, ধামা ইলিয়াছ, জাভেদ, দিদার, আফসার ও ইউসুফের নাম পাওয়া গেছে। বিদেশে পলাতক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী, চট্টগ্রামে এইট মার্ডার মামলাসহ বহু মামলার আসামি সাজ্জাদ আলী খানের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসাবে কাজ করত ছোট সাজ্জাদ। তার নেতৃত্বেও চট্টগ্রামে ডাবল মার্ডারসহ বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড ঘটে। ছোট সাজ্জাদ গ্রেফতার হওয়ার পর এই গ্রুপের আন্ডারওয়ার্ল্ডের নেতৃত্ব দিচ্ছে রায়হান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কেবল রাউজানেই ২৫টি হত্যাকাণ্ড হয়। চট্টগ্রাম শহরেও এই বাহিনী হত্যাকাণ্ড ঘটায়। এর মধ্যে অন্তত ১০টি হত্যাকাণ্ডে রায়হান বাহিনী জড়িত রয়েছে বলে পুলিশের কাছে তথ্য আছে।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক এক সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, নিহত মাসুদ ছিলেন অত্যন্ত সাহসী ও ত্যাগী নেতা। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর কবর খুঁড়তে যখন কেউই সাহস করছিলেন না, তখন এই মাসুদকেই তিনি পাঠিয়েছিলেন। এমন একজন ত্যাগী নেতাকে হারাতে হবে তা কল্পনায়ও ছিল না।
চট্টগ্রামের এসপি মাসুদ আলম বলেন, ভিডিও ফুটেজ উদ্ধার করে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত সবাইকে আইডেন্টিফাই (শনাক্ত) করা হয়েছে। তারা সবাই ওই এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী। তারা বিভিন্ন সময় আমাদের হাতে ধরাও পড়েছে। আবার জামিনে বের হয়ে অপরাধে জড়িয়েছে। এখন আমাদের প্রধান কাজ তাদের গ্রেফতার করা।
