ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ভাইরাল
তরুণীকে দ্বিতীয় স্ত্রী দাবি জামায়াত এমপির
কাবিননামা ও তরুণীর বায়োডাটা নিয়ে নতুন বিতর্ক
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন ও সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর-কালীগঞ্জ আংশিক) আসনের সংসদ-সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা গাজী নজরুল ইসলামের ‘ব্যক্তিগত মুহূর্ত’র একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এ নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। জামায়াতসংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে প্রথমে ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বলা হলেও পরে ভিডিওতে থাকা তরুণীকে সংসদ-সদস্যের দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করা হয়। এছাড়া সংসদ-সদস্যও নিজের ফেসবুক আইডিতে ভিডিওর বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। পাশাপাশি লিখিত বিবৃতিও দিয়েছেন। এতে তিনি তরুণীকে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেছেন। তবে বিয়ের কাবিননামা এবং তরুণীর বায়োডাটা নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কারণ দাবিকৃত বিয়ের ৫ দিন পরও বায়োডাটায় ওই তরুণীর বৈবাহিক অবস্থা ‘অবিবাহিত’ লেখা রয়েছে।
সোমবার রাত থেকে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে এক তরুণীর সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামকে একটি কক্ষে অবস্থান করতে দেখা যায়। ফুটেজের বিভিন্ন অংশে তাকে কখনো মোবাইল ফোনে কথা বলতে, আবার কখনো ওই তরুণীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা যায়। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের মিডিয়া সেলসংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্ম ‘ক্রাইম বার্তা’ একাধিক পোস্টে দাবি করে, এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি একটি ভুয়া ভিডিও। তবে তথ্য যাচাইকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক বিশ্লেষণে ভিডিওটিতে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার বা ডিজিটাল ম্যানিপুলেশনের কোনো সুস্পষ্ট আলামত পাওয়া যায়নি। যাচাইকারীদের ভাষ্য, এআইনির্ভর ভিডিওতে সাধারণত যে ধরনের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা বা অসঙ্গতি দেখা যায়, এই ভিডিওতে সেগুলোর উপস্থিতি নেই। ফলে এটি বাস্তব ভিডিও হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
ভিডিওটি নিয়ে বক্তব্য জানতে গাজী নজরুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে তিনি সাড়া দেননি। এ বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ও মিডিয়া বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা মাওলানা আজিজুর রহমান বলেন, ‘ভিডিওটি আমাদের নজরে এসেছে। এমপি সাহেব আমাদের জানিয়েছেন, ভিডিওতে যাকে দেখা যাচ্ছে তিনি তার দ্বিতীয় স্ত্রী। প্রথম স্ত্রীর সম্মতিক্রমেই এ বিয়ে হয়েছে। ভিডিওটি কীভাবে এবং কার মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে, তা আমরা খতিয়ে দেখছি।’ দ্বিতীয় বিয়ে কবে হয়েছে-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিয়ের সুনির্দিষ্ট তারিখ আমার জানা নেই। তবে বেশ কিছুদিন আগে বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে বলে আমরা জেনেছি।’
গাজী নজরুল ইসলামের ব্যাখ্যা : ভাইরাল হওয়া ভিডিও প্রসঙ্গে লিখিত বিবৃতি দিয়েছেন সংসদ-সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম। এতে তিনি দাবি করেছেন, ভিডিওটি ঢাকার মগবাজারে একটি ব্যবসায়িক কার্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজ থেকে নেওয়া হয়েছে এবং এটি পরিকল্পিতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে তাকে ব্ল্যাকমেইল ও চরিত্র হননের চেষ্টা করা হয়েছে।
বিবৃতিতে গাজী নজরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘ভিডিওতে থাকা ১৮ বছর বয়সি মরিয়ম বেগম আমার দ্বিতীয় স্ত্রী। প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে ১৭ জুন (২০২৬) আমাদের বিয়ে হয়। আর ভিডিও ধারনের ঘটনাটি ঘটে ১৩ জুলাই।’ তিনি জানান, ওই দিন তিনি তার প্রথম স্ত্রী মোসাম্মৎ মাকছুদা বেগম, দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বেগম এবং ব্যক্তিগত গাড়িচালক ওবায়দুল্লাহকে সঙ্গে নিয়ে দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবা মো. মাসুম বিল্লাহর মগবাজারের ব্যবসায়িক কার্যালয়ে যান। সেখানে তারা প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা অবস্থান করেন। এ সময় চালক ওবায়দুল্লাহ কৌশলে ৬ থেকে ৭ জন অপরিচিত ব্যক্তিকে কার্যালয়ে প্রবেশের সুযোগ করে দেয়। ওই ব্যক্তিরা কক্ষে প্রবেশ করে তার ও পরিবারের অন্য সদস্যদের পরিচয় জানতে চেয়ে হেনস্তা শুরু করে। পরে তাদের নিচে একটি চায়ের দোকানে নিয়ে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু টাকা দেওয়ার পর তারা সেখান থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হন। পরে তিনি জানতে পারেন যে পুরো ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন তার গাড়িচালক ওবায়দুল্লাহ, যিনি তার দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা। ওবায়দুল্লাহর সঙ্গে দুলাভাইয়ের (মাসুম বিল্লাহ) পূর্বশত্রুতার জের ধরে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ঘটনার দিন রাত ১০টার দিকে ওবায়দুল্লাহ তার (নজরুল ইসলাম) কাছে ৫ লাখ টাকা এবং মাসুম বিল্লাহর কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা এবং পরিবারের ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া হয়। সংসদ-সদস্যের দাবি, চাঁদার টাকা না পেয়ে ওবায়দুল্লাহ কার্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজ ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর ও কুরুচিপূর্ণ ভিডিও তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। এটি তার ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র এবং চরিত্র হননের অপচেষ্টা। ঘটনাকে সম্পূর্ণ সাজানো আখ্যা দিয়ে সংসদ-সদস্য ষড়যন্ত্রের মূল হোতা চালক ওবায়দুল্লাহসহ জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
ভিডিওকে কেন্দ্র করে নতুন তথ্য : এদিকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওকে কেন্দ্র করে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। গাজী নজরুল ইসলাম তরুণীকে দ্বিতীয় স্ত্রী দাবি করলেও যুগান্তরের হাতে আসা একটি বায়োডাটায় দেখা গেছে, দাবিকৃত বিয়ের ৫ দিন পরও ওই তরুণীর বৈবাহিক অবস্থা ‘অবিবাহিত’ লেখা রয়েছে। বায়োডাটা অনুযায়ী, তরুণীর বর্তমান বয়স ১৮ বছর ২ মাস। ২০২৬ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছেন।
তরুণীর (মরিয়ম খাতুন) বায়োডাটায় দেখা যায়, ২২ জুন তারিখে সংসদ-সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের স্বাক্ষর রয়েছে। স্বাক্ষরের ওপরে সবুজ কালিতে হাতে লেখা রয়েছে ‘জোর সুপারিশ করছি’। অথচ গাজী নজরুল ইসলাম দাবি করেছেন, ১৭ জুন পারিবারিকভাবে মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে তার বিয়ে সম্পন্ন হয়। ফলে বিয়ের ৫ দিন পর স্বাক্ষর করা বায়োডাটায় মরিয়মের বৈবাহিক অবস্থা ‘অবিবাহিত’ উল্লেখ থাকার বিষয়টি নিয়ে নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এছাড়া যুগান্তরের হাতে ওই বিয়ের একটি কাবিননামার কপিও এসেছে। সেখানে দেখা যায়, ৩ লাখ টাকা দেনমোহরে বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। কাবিননামায় সাক্ষী হিসাবে মো. আবুল হোসেন ও বেগম মাকসুদা ইসলামের নাম উল্লেখ রয়েছে।
ভিডিওটি প্রকাশের পর এক ভিডিও বার্তায় এমপির প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম বলেন, ‘মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে তার স্বামীর পারিবারিকভাবেই বিয়ে হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে অপপ্রচার চালানো হলে প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অন্যদিকে মরিয়ম খাতুনও (তরুণী) এক ভিডিও বার্তায় দাবি করেন, গাজী নজরুল ইসলাম তার স্বামী। তার ভাষ্য, সম্প্রতি প্রকাশিত ভিডিওটি একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ এবং তার স্বামীর সম্মানহানি করতেই এটি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
একই বিষয়ে মরিয়মের বাবা মাছুম বিল্লাহ বলেন, ১৭ জুন দুই পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে এ বিয়ে সম্পন্ন হয়। অনুষ্ঠানে গাজী নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন।
তবে বিয়ের দাবি, কাবিননামা এবং বিয়ের ৫ দিন পরের বায়োডাটায় ‘অবিবাহিত’ উল্লেখ থাকার বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এমন বিতর্কের মধ্যেই একটি সূত্র জানিয়েছে, ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর এমপির সম্মান ও রাজনৈতিক ক্যারিয়ার রক্ষায় তড়িঘড়ি ব্যাকডেট দিয়ে কাবিননামা তৈরি করা হয়েছে।
খোঁজখবর নিয়ে সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেবে জামায়াত : গাজী নজরুল ইসলামের ‘ব্যক্তিগত মুহূর্ত’র ভাইরাল হওয়া ভিডিও নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট করেছে জামায়াতে ইসলামী। মঙ্গলবার দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এক বিবৃতিতে বলেন, ‘অতিসম্প্রতি সাতক্ষীরা-৪ আসনের জাতীয় সংসদ-সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে জড়িয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের দিকে দল নজর রাখছে। এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে গাজী নজরুল ইসলামের নিজের বিবৃতি, তার প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রী এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর পিতার ভিডিও বক্তব্য মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। এ বিষয়ে আরও খোঁজখবর নিয়ে এবং প্রকৃত ঘটনার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
