Logo
Logo
×

Advertisement

শেষ পাতা

চাঁদার টাকায় আধুনিক অস্ত্রের মজুত

নেসারুল হক খোকন

নেসারুল হক খোকন

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

চাঁদার টাকায় আধুনিক অস্ত্রের মজুত

Advertisement

পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যবসা করতে চাঁদা; কৃষিপণ্য বাজারে তুলতেও চাঁদা। বাড়ি নির্মাণ কিংবা গবাদি পশু কেনাবেচা-কোনো কিছুই বাদ যাচ্ছে না পাহাড়ি সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে। দুর্গম পাহাড়ে সশস্ত্র আধিপত্য টিকিয়ে রাখার পেছনে কাজ করছে বিপুল অর্থের জোগান। প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারির বাইরে বিভিন্ন পর্যায়ে এই অর্থ আদায় করা হয়। স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ সবার। এই বাধ্যতামূলক অর্থ আদায় সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি বোঝা তৈরি করছে। শুধু চাঁদা নয়, অপহরণের মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। আর এসব পথে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে কেনা হয় আধুনিক অস্ত্র।

জানতে চাইলে এমআইএসটি এবং এআইবিএ সাভারের অ্যাডজাঙ্কট প্রফেসর মেজর জেনারেল (অব.) ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো বিভিন্ন সশস্ত্র আঞ্চলিক গোষ্ঠীর অব্যাহত কার্যক্রম এবং তাদের সাংগঠনিক সক্ষমতার পুনরুত্থান। তিনি বলেন, ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির লক্ষ্য ছিল সশস্ত্র সংঘাতের অবসান। কিন্তু দীর্ঘ সময় পরও অস্ত্রধারণ, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়েছে। তিনি মনে করেন, সামরিক ক্যাম্প প্রত্যাহারের ফলে দুর্গম এলাকায় রাষ্ট্রের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় এসব গোষ্ঠীর সংগঠিত হওয়া, সদস্য সংগ্রহ এবং অস্ত্র ও রসদ স্থানান্তর সহজ হয়েছে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা ও সম্ভাব্য আনুকূল্যও তাদের টিকে থাকার পরিবেশ তৈরি করেছে। সাবেক এই সামরিক কর্মকর্তা আরও বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে সক্রিয় কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীর সীমান্তের ওপারে আশ্রয় বা সহায়তা পাওয়ার অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে উঠেছে। এসব বিষয় তথ্যভিত্তিকভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, বিষয়টিকে পরিচয়গত বিতর্কের পরিবর্তে জাতীয় নিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং কার্যকর নিরস্ত্রীকরণের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা জরুরি।

এদিকে পুলিশের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, অস্ত্র দিয়ে চাঁদাবাজির রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠা করার চিন্তা থেকে এসব গোষ্ঠীকে ফিরে আসতে হবে। সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের অস্ত্র সমর্পণ করে শান্তির ছায়াতলে আসতে হবেই। এর কোনো বিকল্প নেই। যত অত্যাধুনিক অস্ত্রই তারা নিক, সরকারি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার মতো শক্তি তারা কখনো পাবে না। তারা বোকার স্বর্গে বাস করে। শান্তির বার্তা পাহাড়ের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করবে। সবাইকে নিয়মের মধ্যে আসতে হবে।

তিনি বলেন, আসলে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়েই সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের মধ্যে বিরোধ বেঁধে যায়। চাঁদার টাকার একটি অংশ দিয়ে অত্যাধুনিক অস্ত্র কিনে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি নীতিপত্রে আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ তুলে ধরা হয়। স্থানীয় অধিবাসীরা যেসব অভিযোগ করে থাকেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে, এসব অভিযোগে চাঁদা আদায়কে ‘বার্ষিক কর’ বা ‘জোরপূর্বক কর’ হিসাবে উল্লেখ করা হয়। বলা হয়েছে, পাহাড়ে উৎপাদিত কলা, আদা, হলুদ ও বনজসম্পদ বাজারে নিতে বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থ দিতে হয়। বাড়ি নির্মাণ, গবাদি পশু কেনাবেচা এবং নতুন ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ আদায় করা হয়।

সরেজমিন পাহাড়ের বিভিন্ন পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই অর্থ আদায় প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারির বাইরে পরিচালিত হয়। ফলে অর্থের পরিমাণ, সংগ্রহের পদ্ধতি, কারা এর সঙ্গে যুক্ত এবং কোথায় তা ব্যয় হয়-এসব বিষয়ে স্বচ্ছ কোনো হিসাব পাওয়া যায় না। উৎপাদন থেকে বাজারজাত পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে অর্থ দিতে হলে কৃষক, ব্যবসায়ী ও পরিবহণসংশ্লিষ্টদের ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে পণ্যের দাম ও স্থানীয় ব্যবসার ওপরও।

চাঁদা ও মুক্তিপণের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ অবৈধ অস্ত্রের অনুপ্রবেশ ঠেকানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার একাধিক ব্যক্তি যুগান্তরকে বলেন, চাঁদার টাকার একটি বড় অংশ ব্যয় হয় অস্ত্র কেনায়। নিজেদের সশস্ত্র যোদ্ধা তৈরি করতে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও খুলেছে পাহাড়ি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট তৎপরতার কারণে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি বলে মনে করেন তারা। অবৈধ অস্ত্রের প্রবেশ ঠেকাতে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সমন্বয় না বাড়ানো হলে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের তৎপরতা পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকেই।

এদিকে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন, পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং এনজিও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের কমিটিতে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিত্ব রাখার প্রস্তাবও রয়েছে। এর যুক্তি হিসাবে বলা হয়েছে-দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সাধারণ প্রশাসনের পক্ষে সব তৎপরতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয় না। আগাম গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে অবৈধ অস্ত্রের প্রবেশ এবং সহিংসতা উসকে দেওয়ার পেছনে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা যেতে পারে।

ধাপে ধাপে চাঁদাবাজি : তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অভিযোগে চাঁদা আদায়ের কয়েকটি ক্ষেত্র আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাহাড়ে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়ার সময় অর্থ দিতে হয়। বাড়ি নির্মাণ কিংবা নতুন ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রেও অর্থ আদায়ের কথা বলা হয়েছে। গবাদি পশু কেনাবেচার মতো ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও এর বাইরে নয়। এ ধরনের অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো সরকারি রসিদ, করের বিধান কিংবা প্রশাসনিক অনুমোদনের তথ্য থাকে না। বরং একে বাধ্যতামূলক অর্থ আদায় হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, সাধারণ মানুষ অনেক ক্ষেত্রে এই অর্থ দিতে বাধ্য হন। পার্বত্য জেলাগুলোয় এরকম চাঁদার পরিমাণ হাজার কোটি টাকার ওপরে।

অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ : জানা যায়, অপহরণের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ সবচেয়ে আতঙ্কের। এ কারণে পর্যটকরা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। উন্নয়নমূলক কাজে নিয়োজিত ঠিকাদাররা আতঙ্কে থাকেন। সাধারণ নাগরিক, ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তাদের অপহরণ পাহাড়ের শান্তি ও উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপহরণকে রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখা, সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় সৃষ্টি এবং বিপুল অর্থ আদায়ের কৌশল হিসাবে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। অপহরণের কারণে পাহাড়ে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ ব্যাহত হচ্ছে, পর্যটন খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অপহরণের শিকার পরিবারগুলোকে মুক্তিপণের জন্য অর্থ জোগাড় করতে হলে তাদের ওপর আর্থিক ও মানসিক চাপ তৈরি হয়।

অর্থের নেটওয়ার্ক ভাঙা জরুরি : পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে শুধু অস্ত্রধারীদের শনাক্ত বা গ্রেফতার করাই যথেষ্ট নয়। অর্থের উৎস, চাঁদা আদায়ের পদ্ধতি, অর্থ সংগ্রহকারীদের পরিচয়, অর্থের লেনদেন এবং অস্ত্র সরবরাহের মধ্যস্থতাকারীদেরও শনাক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে অপহরণ ও মুক্তিপণের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগগুলো পৃথকভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। বিশ্লেষকরা মনে করেন, পাহাড়ে চাঁদাবাজির বিপুল অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে তা ব্যবহৃত হচ্ছে এবং আধুনিক অস্ত্রের জোগানদার কারা? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে প্রয়োজন গোয়েন্দা তথ্য, আর্থিক লেনদেনের অনুসন্ধান, অস্ত্র উদ্ধারসংক্রান্ত মামলা এবং সীমান্তে অস্ত্র প্রবেশের তথ্যের সমন্বিত বিশ্লেষণ।

চাঁদা আদায় বন্ধের পাশাপাশি অস্ত্রের সরবরাহব্যবস্থা ও অর্থের প্রবাহ শনাক্ত করা না গেলে পাহাড়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আর্থিক সক্ষমতা অটুট থাকার আশঙ্কা থেকেই যাবে। তাই সশস্ত্র তৎপরতার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপের পাশাপাশি তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি ভেঙে দেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিলেন সাবেক ছাত্রনেতা : চট্টগ্রামের বাসিন্দা বিশিষ্ট সমাজকর্মী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রনেতা দাউদ আলম যুগান্তরকে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের তথাকথিত উপজাতীয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার বিদ্রোহ ও চাঁদাবাজির ঘটনা এখনো পুরোদমে চলছে। এখানে মূলত ‘প্রসিত খীসা’ ও ‘সন্তু লারমা’র দুটি পক্ষ সক্রিয় রয়েছে। তাদের অবস্থান পার্শ্ববর্তী একটি দেশের সীমান্তবর্তী শহরে। তাদের শীর্ষ নেতাদের পরিবার ও সন্তানরা সেখানেই থাকে এবং পড়াশোনা করে। দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কি এসব বিষয়ে জানে না? তিনি বলেন, ১৯৯৭ সালে শেখ হাসিনার শাসনামলে সন্তু লারমার সঙ্গে যে তথাকথিত ‘শান্তি চুক্তি’ করা হয়েছিল, তার ফলে অনেক সামরিক ক্যাম্প সরিয়ে নেওয়া হয়, যা আমাদের সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্য ক্যানসারের মতো ক্ষতিকর ছিল। এই উপজাতীয় গোষ্ঠীগুলো আসলে আদিবাসী নয়। তারা তিব্বত (চীন), মিজোরাম (ভারত) এবং শান রাজ্য (মিয়ানমার) থেকে অভিবাসী হয়ে এসেছেন। প্রকৃত আদিবাসী হলো ‘কুকি’ ও ‘চিন’ জাতিগোষ্ঠীর মানুষ। যাদের সংখ্যা খুবই কম।

তিনি বলেন, আমাদের আগের মতোই পুনরায় সামরিক ক্যাম্পগুলো স্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি ভারতের চাপে জেএসএস-এর সঙ্গে করা সেই তথাকথিত ‘শান্তিচুক্তি’ সরকারকে বাতিল করতে হবে। আমাদের জরুরি ভিত্তিতে আধুনিক ড্রোন, ভারী অস্ত্রসজ্জিত যানবাহন (কনভয়) এবং আধুনিক রাডার ব্যবস্থা সংগ্রহ করা প্রয়োজন। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সরকারের সর্বোচ্চ পদক্ষেপ চাই।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

চাঁদার টাকায় আধুনিক অস্ত্রের মজুত

চাঁদার টাকায় আধুনিক অস্ত্রের মজুত

জঙ্গল থেকে জনপদ ইতিহাসের সাক্ষী তিতাখাঁ মিতাখাঁ মসজিদ

ইতিহাসের সাক্ষী তিতাখাঁ মিতাখাঁ মসজিদ

ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগ পাহাড়ে বিচারের নামে দুজনকে পিটিয়ে হত্যা

পাহাড়ে বিচারের নামে দুজনকে পিটিয়ে হত্যা

নিত্য মৃত্যুর ভাঙ্গা-কুয়াকাটা মহাসড়ক একনেকে ঠাঁই হয়নি ছয় লেন প্রকল্পের

একনেকে ঠাঁই হয়নি ছয় লেন প্রকল্পের

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম