জঙ্গল থেকে জনপদ
ইতিহাসের সাক্ষী তিতাখাঁ মিতাখাঁ মসজিদ
তাবারক হোসেন আজাদ, রায়পুর (লক্ষ্মীপুর)
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একসময় চারপাশজুড়ে ছিল ঘন জঙ্গল, পথঘাট দুর্গম। সেই জঙ্গলের ভেতরে ছিল পৃথক দুটি প্রাচীন ইবাদতখানা। একটি থেকে আরেকটির দূরত্ব মাত্র ৫০ মিটার। সময়ের ব্যবধানে জঙ্গল কেটে গড়ে ওঠে জনপদ, বৃদ্ধি পায় জনবসতি। পুরোনো দুই মসজিদ আজও টিকে আছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা শহরের উত্তর তেমুহনী থেকে দক্ষিণে চকবাজার সড়কের বাঞ্চানগর এলাকায় পাশাপাশি অবস্থান করছে ঐতিহাসিক তিতাখাঁ জামে মসজিদ ও হযরত আজিম শাহ জামে মসজিদ। স্থানীয়দের কাছে দ্বিতীয়টি মিতাখাঁ মসজিদ বা দায়রা মসজিদ নামেও পরিচিত। মসজিদ দুটির সঠিক নির্মাণকাল নিয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে, মোগল আমলে প্রায় ৫০০ বছর আগে এগুলো নির্মিত হয়েছিল।
তিতাখাঁ জামে মসজিদটি লক্ষ্মীপুর উত্তর তেমুহনীর দায়রা বাড়ির পাশে ইসলাম বক্স ভূঁঞা বাড়ির সামনে অবস্থিত। জঙ্গলের মধ্যেই ১২২৯ হিজরি সনে প্রাচীন মসজিদটির সন্ধান পাওয়া যায়।
স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে, আজিম শাহ (রহ.) বাগানের মধ্যে মসজিদটির অস্তিত্ব খুঁজে পান। তবে মসজিদটির নাম ‘তিতাখাঁ’ হলো কীভাবে, এর সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। কারও ধারণা, জনৈক তিতাখাঁ মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। স্থানীয়ভাবে বলা হয়, ওই সময় ওমর আলী নামে এক কারিগর মসজিদে নান্দনিক কারুকাজ করেন। মসজিদটির চার কোনায় রয়েছে চারটি ছোট মিনার। ওপরের অংশে রয়েছে তিনটি বড় গম্বুজ। প্রায় ৪৯ ফুট লম্বা ও ৪২ ফুট প্রস্থের একতলা এ মসজিদ ইট, চুন ও সুরকি দিয়ে নির্মিত। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় এর দেওয়ালের কারুকাজ। লতাপাতা ও বিভিন্ন শৈল্পিক নকশার পাশাপাশি মসজিদের ভেতর ও বাইরের নকশায় ব্যবহার করা হয়েছে ভাঙা সিরামিকের টুকরো। পুরোনো স্থাপত্যের কিছু বৈশিষ্ট্য হারিয়ে গেলেও মূল মসজিদটি এখনো তার ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। বর্তমানে তিতাখাঁ জামে মসজিদে প্রতিদিন প্রতি ওয়াক্তে কয়েকশ মুসল্লি নামাজ আদায় করেন। মসজিদের ভেতরে একসঙ্গে পাঁচ শতাধিক মুসল্লির নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা রয়েছে।
দীর্ঘ ৩৫ বছর তিতাখাঁ জামে মসজিদে মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করছেন শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, মোগল শাসনামলে পাঠান পরিবারের তিতাখাঁ নামে জনৈক ব্যক্তি মসজিদটি নির্মাণ করেন বলে তিনি শুনেছেন। প্রাচীন এ মসজিদটির প্রতি মানুষের আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে এর পুরোনো স্থাপত্য ও কারুকাজ দেখতে আসেন। বর্তমানে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে মসজিদটি পরিচালিত হচ্ছে। তিতাখাঁ মসজিদ থেকে মাত্র ৫০ মিটার উত্তরে রয়েছে আরেক ঐতিহাসিক প্রাচীন স্থাপনা মিতা খাঁ জামে মসজিদ। স্থানীয়দের কাছে এটি দায়রা মসজিদ নামেও পরিচিত। মসজিদকে ঘিরে রয়েছে আরও বিস্ময়কর লোককথা।
তথ্যমতে, ইয়েমেন থেকে ১৭৮৫ সালে পীর দায়েম শাহের নির্দেশে লক্ষ্মীপুরে আসেন আজিম শাহ (রহ.)। তখন তার বয়স ছিল ২৬ বছর। লক্ষ্মীপুরে আসার পর তিনি প্রবেশ করেন ঘন জঙ্গলে। অনেক সময় পার হয়ে গেলেও তিনি ফিরে না আসায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। কারণ, তখন ওই জঙ্গলে বাঘসহ বিভিন্ন হিংস্র প্রাণীর বিচরণ ছিল। সেসময় খোঁজ করতে গিয়ে স্থানীয়রা জঙ্গলের ভেতরে এক পুরোনো ইবাদতখানার সন্ধান পান। সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পান, আজিম শাহ ইবাদতে মশগুল। আর লোকমুখে ছড়িয়ে থাকা গল্পের সবচেয়ে বিস্ময়কর অংশ হলো-আজিম শাহ যখন মসজিদের ভেতরে ইবাদত করছিলেন, তখন মসজিদের সামনে একটি বাঘ শান্তভাবে বসে ছিল। এই কাহিনির ঐতিহাসিক সত্যতা যাচাই করা না গেলেও প্রজন্মের পর প্রজন্ম লোকমুখে গল্পটি আজও প্রচলিত।
