নিত্য মৃত্যুর ভাঙ্গা-কুয়াকাটা মহাসড়ক
একনেকে ঠাঁই হয়নি ছয় লেন প্রকল্পের
আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কোটি মানুষের দাবি আর বহু আন্দোলন-সংগ্রামের পরও জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (একনেক) বৈঠকে ঠাঁই পায়নি ভাঙ্গা-বরিশাল-কুয়াকাটা ছয় লেন সড়ক নির্মাণ প্রকল্প। বুধবার ঢাকায় হওয়া একনেকের বৈঠকে প্রকল্পটি উঠবে বলে কথা দিয়েছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি এমপি। তার এই ঘোষণায় আশায় বুক বাধলেও শেষ পর্যন্ত নিরাশ হলেন দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ। এদিকে গত জুন মাসে শেষ হয়ে গেছে এই সড়ক নির্মাণে প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ প্রকল্পের মেয়াদ। জমি অধিগ্রহণের মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে সড়ক ও সেতু বিভাগ। তবে এখন পর্যন্ত মেলেনি ইতিবাচক উত্তর। ফলে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে ছয় লেন সড়ক নির্মাণ।
ঢাকা থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত রয়েছে ছয় লেন এক্সপ্রেসওয়ে। ভাঙ্গার পর বরিশাল হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত সড়কটি সিঙ্গেল লেনের। অথচ এই সড়ক ধরে যাতায়াত করে পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা ও সমুদ্রবন্দর পায়রাসহ দক্ষিণাঞ্চলের ১০ জেলার মানুষ। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের দেয়া তথ্যানুযায়ী, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার আগে এই সড়কে প্রতিদিন গড়ে চলাচল করত ১৬-১৮ হাজার যানবাহন। সেতু চালু হওয়ার পর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫-৩০ হাজারে। অসংখ্য বাঁক আর সরু হওয়ার কারণে এই মহাসড়কে প্রায় প্রতিদিনই ঘটে দুর্ঘটনা। এমন কোনো দিন নেই যে, দুর্ঘটনায় হতাহত হয়নি মানুষ। ২০৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কের ভাঙ্গা-বরিশাল অংশ প্রস্থে ২৮ থেকে ৩০ ফিট। বরিশালের পর থেকে পটুয়াখালী-বরগুনা হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত সড়কটি মাত্র ২৪ ফিট প্রশস্ত। কেবল সরু আর বিপজ্জনক বাঁক-ই নয়, অযত্ন আর অবহেলায় চলাচলেরও অনুপযোগী হয়ে পড়েছে সড়কটি। ভাঙ্গার পর থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত সড়কের বেশির ভাগ জায়গা এখন ভাঙাচোরা। সেই সাথে সৃষ্টি হয়েছে খানাখন্দ। ফলে ঢাকা থেকে বরিশাল পর্যন্ত মাত্র ১৭০ কিলোমিটার সড়ক পাড়ি দিতে লেগে যায় চার-পাঁচ ঘণ্টা। কুয়াকাটা পৌঁছাতে লেগে যায় ৮-১০ ঘণ্টা। সেই সাথে দুর্ঘটনা তো রয়েছেই। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর এই সড়কে সংঘটিত দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন তিন সহস্রাধিক মানুষ। আহত ২০ সহস্রাধিক। নিত্য দুর্ঘটনা আর বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যুর কারণে সড়কটিকে এখন মৃত্যুফাঁদ হিসাবে চেনে এই অঞ্চলের মানুষ। সেই ফাঁদ থেকে মুক্তি পেতে দীর্ঘদিন ধরে এখানে চলছে আন্দোলন। সড়কটি ছয় লেনে উন্নীত করার দাবিতে হয়েছে সংবাদ সম্মেলন, স্মারকলিপি দেয়া আর মিছিল মানববন্ধন। ছয় লেনের দাবিতে ১৫০ কিলোমিটারব্যাপী মানববন্ধন পর্যন্ত হয়েছে ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়কে।
পর্যটন কার্নিভালে যোগ দিতে গত ২৩ অক্টোবর সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটায় আসেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি। যেহেতু প্রকল্পটি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট তাই কবে নাগাদ আলোর মুখ দেখবে ভাঙ্গা-কুয়াকাটা ছয় লেন তা প্রতিমন্ত্রীর কাছে জানতে চান স্থানীয়রা। সবাইকে আশ্বস্ত করে জোনায়েদ সাকি তখন বলেন, ‘আমার মন্ত্রণালয়ের যেটুকু কাজ তা আমরা করে দিয়েছি। আশা করি আগামী ৩ নভেম্বর একনেকের বৈঠকে প্রকল্পটি (ভাঙ্গা-কুয়াকাটা ছয় লেন) পাশ হবে। প্রতিমন্ত্রীর এই আশ্বাসের কথা ফলাও করে প্রচার হয় গণমাধ্যমে। সেই সাথে ছয় লেন সড়ক পাওয়ার আশায় বুক বাধেন দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ। ৩ নভেম্বর না হয়ে একেনেকের বৈঠক হয় ৪ নভেম্বর। কিন্তু সেই বৈঠকে ওঠেনি ভাঙ্গা-কুয়াকাটা ছয় লেন সড়ক নির্মাণ প্রকল্প। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রীকে ফোন দেয়া হলে কেউ একজন তা রিসিভ করে জানান, প্রতিমন্ত্রী জরুরি মিটিংয়ে আছেন, এখন কথা বলতে পারবেন না। পরে তার হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও মেলেনি সাড়া।
সড়ক ও সেতু বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ভাঙ্গা-কুয়াকাটা ছয় লেন সড়ক নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় ৩৩ হাজার কোটি টাকা একটি প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে দেয়া আছে। ২০১৯ সালে ওই প্রস্তাব দিয়েছে সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়। এর আগে সড়ক নির্মাণে প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণের একটি প্রকল্প অনুমোদন দেয় একনেক। ২০১৮ সালে অনুমোদন পাওয়া ওই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে চলতি বছরের জুনে। ভাঙ্গা থেকে বরিশাল পর্যন্ত জমি অধিগ্রহণের কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবে মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় আটকে গেছে জমি অধিগ্রহণের বাকি কাজ। মেয়াদ বাড়ানোর জন্য চলতি বছরের মে মাসে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হলেও তার উত্তর মেলেনি। বরিশাল সড়ক বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাসুদুর রহমান খান বলেন, ‘পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি না এলেও অধিগ্রহণ থেমে নেই। কারণ মেয়াদ বাড়ানোর যে চিঠি আমরা দিয়েছি তাতে বাড়তি কোনো বরাদ্দ চাওয়া হয়নি। বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং বাতিল না হলে সেই প্রকল্পের কাজ চলমান থাকে।’
বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট এবায়েদুল হক চান বলেন, ‘এখানে পটুয়াখালীতে ইপিজেড নির্মাণের কাজ চলছে। বুধবারও কয়লা নিয়ে পায়রা বন্দরে এসেছে মাদার ভেসেল। তাছাড়া পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটারও আলাদা গুরুত্ব আছে। শুধু অপ্রশস্ত সড়কের কারণে বরিশাল অঞ্চলে কোনো শিল্পায়ন হচ্ছে না। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে বরিশাল বিভাগের ২১টি আসনের ১৮টি পেয়েছে বিএনপি। আওয়ামী লীগ আমলে বরিশালকে পাশ কাটিয়ে সব উন্নয়ন চলে গেছে গোপালগঞ্জ। বিএনপির সময়েও যদি আমরা উন্নয়নবঞ্চিত থাকি তাহলে এই দুঃখ রাখব কোথায়?’ পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসনের সংসদ-সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষকবিষয়ক সম্পাদক এবিএম মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘এই একটি সড়ক ঘুরিয়ে দিতে পারে পুরো দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি। বরিশাল অঞ্চলের সব সংসদ-সদস্য জাতীয় সংসদে এই দাবি তুলেছেন। আমি আশা করি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাদের এই দাবি অবশ্যই পূরণ করবেন। আমরা তার দিকে চেয়ে আছি।’
