চট্টগ্রামে চিকিৎসককে হুমকি
চাঁদা না দিলে ১০০ পুলিশ থাকলেও গুলি করে মারব
হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানা পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানে গ্রেফতার সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের বেতনভুক্ত সাত সহযোগী -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চট্টগ্রামে ১০ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় এক চিকিৎসককে গুলি করে হত্যার হুমকি দিয়েছেন সংঘবদ্ধ একটি চক্রের সদস্যরা। তারা বলেছেন, টাকা না পাঠালে ১০০ পুলিশ থাকলেও তোমাকে গুলি করে মারব। এ ঘটনায় সোমবার রাতে অভিযান চালিয়ে সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজির মামলায় কারাগারে থাকা ডেভিড ইমনের ৭ সহযোগীকে গ্রেফতার করেছে হাটহাজারী মডেল থানা পুলিশ। এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি তলোয়ার, চাপাতি, ছুরি, টিপছোরা এবং চাঁদাবাজির কাজে ব্যবহৃত বিদেশি নম্বরসহ ৪টি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে।
হুমকি পাওয়া চিকিৎসক চট্টগ্রামের হাটহাজারীর চিকনদণ্ডী ইউনিয়নের বাসিন্দা। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের আমানবাজারে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে তিনি চেম্বার করেন। হুমকির ঘটনায় তিনি ৩ সেপ্টেম্বর হাটহাজারী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়, রোগীদের সিরিয়াল লেখার জন্য রাখা মোবাইল নম্বরে ২ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১০টা ৫৪ মিনিটে একটি বিদেশি নম্বর থেকে এক ব্যক্তি কল করেন। তার সহকারী কলটি রিসিভ করেন। তখন ওই ব্যক্তি তার সঙ্গে কথা বলতে চান।
জিডিতে বলা হয়, ফোনের অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তি নিজেকে বড় সাজ্জাদ বলে পরিচয় দিয়ে তার জন্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১০ লাখ টাকা রেডি রাখতে বলেন। নইলে যে কোনো সময় চেম্বারে এসে মেরে ফেলার হুমকি দেন।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, এরপর কয়েক দফায় বড় সাজ্জাদের সহযোগী মো. রায়হান পরিচয়েও চিকিৎসককে হুমকি দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে লিখিত ও অডিও বার্তা পাঠানো হয়। তাতে বলা হয়, ‘টাকা না পাঠালে অনেক বড় বিপদ হয়ে যাবে। তোমার পেছনে আমাদের লোক লাগানো আছে। তোমার গাড়ির নম্বরও আছে। ১০০ জন পুলিশ থাকলেও তোমাকে গুলি করে মেরে ফেলব। রোগী সেজে তোমাকে মেরে ফেলা হবে, চেম্বারে গিয়ে।’ নির্ধারিত সময়ে চাঁদা না দেওয়ায় ক্ষোভ জানিয়ে দ্বিগুণ চাঁদা দাবি করা হয়। হুমকি দিয়ে বলা হয়, ‘আমি রায়হানকে, তুমি চিন না। বেয়াদবি করতেছ। ১০ লাখ টাকার বদলে এখন ২০ লাখ টাকা দিতে হবে।’
মঙ্গলবার এক বিজ্ঞপ্তিতে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল মিয়া জানান, চিকিৎসককে হুমকির ঘটনায় চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন স্থানের অভিযানে আটক সাতজনই কারাগারে থাকা ‘সন্ত্রাসী’ মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমনের সহযোগী। ডেভিড ইমন বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী হিসাবে পরিচিত। গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন-হাটহাজারীর খন্দকিয়া এলাকার কামরুল হাসান ওরফে সাগর (২৫), মো. রিকু (২৫), মো. মানিক (৪০), নুরুল আলম (৪০), ছিপাতলীর আহমদুল্লাহ ওরফে মাসুম মেম্বার (৪০), চিকনদণ্ডীর আহমদ রেজা শাকিল (২৫) এবং নগরীর বায়েজিদ থানাধীন জালালাবাদের মো. তরিকুল ইসলাম ওরফে রোহিত (২০)।
তাদের মধ্যে আহমদ রেজা শাকিলের বিরুদ্ধে অস্ত্র, চাঁদাবাজি, অপহরণ, ডাকাতির প্রস্তুতি, হত্যাচেষ্টা এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনসহ ৮ মামলা রয়েছে। মানিকের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য ও ডাকাতির প্রস্তুতিসহ ২টি; কামরুল হাসান সাগর, মো. রিকু, তরিকুল ইসলাম রোহিত এবং আহমদুল্লাহ ওরফে মাসুম মেম্বারের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনসহ ৩টি করে মামলা রয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল মিয়া বলেন, চট্টগ্রামের হাটহাজারী ও বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকায় বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীর কাছে সন্ত্রাসী রায়হান, বড় সাজ্জাদসহ অন্যান্য সন্ত্রাসীর নাম ব্যবহার করে চাঁদা দাবি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমের সার্বিক দিকনির্দেশনায় হাটহাজারী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজের নেতৃত্বে হাটহাজারী থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোস্তাক আহম্মেদসহ সঙ্গের অফিসার-ফোর্সের সমন্বয়ে এ সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, সম্প্রতি হাটহাজারীর আমানবাজার এলাকার একজন চিকিৎসকের কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে হুমকি দেওয়া হয়। একইভাবে বড়দিঘীর পাড় এলাকার একজন ব্যবসায়ীকেও বিদেশি নম্বর থেকে ফোনে কল করে চাঁদা দাবি ও হুমকি দেওয়া হয়।
ঘটনাগুলো সম্পর্কে পুলিশ অবগত হয়ে তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণ, গোপন সূত্র এবং পূর্বে গ্রেফতার সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন ও কালা মোবারককে জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করা হয়।
তদন্তে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল মিয়া জানান, চক্রটি সন্ত্রাসীদের নাম ও পরিচয়কে অপকৌশল হিসাবে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা দাবি করত। নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতে বিদেশি নম্বর ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে কল করে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হতো।
তিনি বলেন, ডেভিড ইমন, কালা মোবারক, বড় সাজ্জাদ, রায়হানসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসীর নাম ব্যবহার করলেও তারা নিজেদের একটি পৃথক চাঁদাবাজচক্র গড়ে তুলেছিল। তারা মাসোহারার ভিত্তিতে ডেভিড ইমনের হয়ে কাজ করত। বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও বিত্তবান ব্যক্তির সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে তাদের টার্গেট করা এবং পরবর্তী সময়ে সন্ত্রাসীদের নাম ব্যবহার করে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে চাঁদা আদায় করাই ছিল গ্রেফতার চাঁদাবাজদের মূল কৌশল।
