কবি নজরুলের স্মৃতিধন্য কুমিল্লা
সংরক্ষণের অভাবে হারাচ্ছে ইতিহাস
Advertisement
তাবারক উল্লাহ কায়েস, কুমিল্লা
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার দৌলতপুর গ্রামে নার্গিসের মামা আলী আকবর খানের বাড়ি এটি। এই বাড়িতেই কবি কাজী নজরুল ইসলাম-নার্গিস বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। সম্প্রতি তোলা -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের প্রেম, বিদ্রোহ, সাহিত্যচর্চা ও সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কুমিল্লার মাটি। ১৯২১-২৪ পর্যন্ত একাধিকবার কুমিল্লায় অবস্থানকালে কবির জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনেক অধ্যায়ের সূচনা ও বিকাশ ঘটে। প্রেম থেকে বিচ্ছেদ, নতুন সম্পর্ক, সাহিত্য সৃষ্টি থেকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন-অনেক কিছুরই স্মৃতি ছড়িয়ে আছে কুমিল্লা শহর ও জেলার মুরাদনগরের দৌলতপুরে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এসব স্মৃতিবিজড়িত স্থান ও স্মৃতিচিহ্ন অযত্ন, অবহেলা ও সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাওয়ার পথে। জাতীয় কবির ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে দেশে ‘নজরুলবর্ষ’ পালিত হচ্ছে। এমন সময়ে কুমিল্লার নজরুল-স্মৃতি সংরক্ষণে নতুন করে দাবি উঠেছে।
গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী ও সচেতন নজরুলপ্রেমীরা বলছেন, নজরুলের সঙ্গে কুমিল্লার সম্পর্ক কেবল কয়েকটি স্মৃতিফলক কিংবা একটি সড়কের নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এ শহর ও মুরাদনগরের দৌলতপুর কবির ব্যক্তিজীবন ও সৃষ্টিশীলতার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯২১ সালের ২১ নভেম্বর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে কুমিল্লার রাজগঞ্জ বাজারে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ডাকা হরতালের কর্মসূচিতে অংশ নেন নজরুল। গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে প্রতিবাদী গান গেয়ে মিছিলে অংশ নেওয়া সেই তরুণ কবির কণ্ঠে ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ভাষা। পরে তার সাহিত্যজীবনে যে বিদ্রোহী সত্তা আরও প্রবল হয়ে উঠেছিল। কুমিল্লার এই রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিজ্ঞতা তার জীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে আছে। রাজগঞ্জের সেই স্মৃতিচিহ্ন আজ আর নেই।
মুরাদনগরের দৌলতপুরে রয়েছে নজরুলের জীবনের আরেক গভীর অধ্যায়। খাঁ পরিবারের সৈয়দা আসার খানম ওরফে সৈয়দা খাতুনের (নজরুল তার নাম দেন নার্গিস। নার্গিস ফার্সি শব্দ, এর অর্থ গুল্ম) সঙ্গে কবির সম্পর্ক, প্রেম, বিয়ে এবং পরবর্তী বিচ্ছেদের বেদনা নজরুলের ব্যক্তিজীবনে যেমন গভীর রেখাপাত করে, তেমনি তার সাহিত্য-সংগীতেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। নার্গিসকে লেখা এক চিঠিতে কবি তার গভীর অন্তর্দহন ও অভিমান প্রকাশ করেছিলেন। চিঠির ভাষায় উঠে আসে আপনজনের কাছ থেকে পাওয়া অবহেলা ও প্রত্যাশা ভঙ্গের বেদনা-যা নজরুলের অতিসংবেদনশীল মনের একটি অনন্য পরিচয়। বিচ্ছেদের পরও নার্গিসের স্মৃতি কবির মন থেকে মুছে যায়নি।
গবেষকদের মতে, ‘চক্রবাক’ কাব্যের বেশকিছু কবিতাতেও এই সম্পর্কের আবেগের প্রতিফলন রয়েছে। দৌলতপুরে অবস্থানকালে কবির লেখা ‘বিজয়িনী’ কবিতাতেও প্রেম ও আত্মসমর্পণের এক বিশেষ আবেগ ধরা পড়ে। কুমিল্লার দৌলতপুর তাই শুধু একটি গ্রামের নাম নয়, নজরুলের প্রেম, বেদনা ও সৃষ্টিশীলতার স্মৃতিবিজড়িত এক কবিতীর্থ।
পরে ১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল কলকাতার ৬ নম্বর হাজী লেনে কুমিল্লার পশ্চিম কান্দিরপাড়ের আশালতা সেনগুপ্তা যিনি প্রমীলা নামে পরিচিত, তার সঙ্গে নজরুলের বিয়ে হয়। প্রমীলাকে কেন্দ্র করেই কবির দাম্পত্যজীবনের দীর্ঘ অধ্যায় গড়ে ওঠে। কুমিল্লার কান্দিরপাড়ে প্রমীলাদের বাড়িতে পরে কবি একাধিকবার অবস্থান করেন। এই বাড়ি, আশপাশের এলাকা এবং কান্দিরপাড়ের সঙ্গে নজরুলের সম্পর্ক আজও স্থানীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সচেতন নাগরিকদের দাবি, শুধু জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্যে নজরুলচর্চাকে সীমাবদ্ধ না রেখে কবির স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুযায়ী সংরক্ষণ, তথ্যভিত্তিক ফলক, গবেষণা ও দর্শনার্থীদের জন্য উপযোগী অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
কুমিল্লা জেলা প্রশাসক রোজী আকতার বলেন, যদি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কবির কোনো স্মৃতিচিহ্ন হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, বিষয়টি আমাদের নজরে এলে অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।
