দুর্গাপুরে অভিযান নিয়ে প্রশ্ন
সার গায়েব ৩২৫ বস্তা
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজশাহীর দুর্গাপুরে সার জব্দের পরিমাণ নিয়ে গরমিলের অভিযোগ উঠেছে। সার ব্যবসায়ী সাইদুল ইসলামের দাবি, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে হাবিবা ফারজানা ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহানা পারভীন লাবনীসহ অভিযানে থাকা কর্মকর্তারা তার ৩২৫ বস্তা সার গায়েব করেছেন। পরে ওই সার এক বিএনপি নেতার মাধ্যমে বিক্রি করে ৮ লাখ টাকার বেশি হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তার। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইউএনও ও কৃষি কর্মকর্তা।
সাইদুল ইসলাম নামে যে ব্যবসায়ীর সার জব্দ করা হয়েছে তার নেই বৈধ লাইসেন্স। চোরাইভাবে দেশের বড় মোকামগুলো থেকে সার এনে স্থানীয় প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করে প্রকাশ্যে বিক্রি করেন তিনি। তবুও তার বিরুদ্ধে নেওয়া হয়নি আইনগত পদক্ষেপ। এমনকি সার জব্দের মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরে তিনি উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) সঙ্গে দেখা করেন। অথচ হাতের কাছে পেয়েও প্রশাসন সাইদুলকে আটক করেনি। লাইসেন্স না থাকায় গায়েব করা সারের ব্যাপারে তিনি অভিযোগ করতে পারছেন না বলে দাবি করেছেন।
নির্ধারিত গন্তব্যে না নিয়ে বেশি দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে পাচারের সময় টাঙ্গাইলের মধুপুরে ৩৯৫ বস্তা সার জব্দ হয়েছে। ময়মনসিংহের গৌরীপুরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতার দোকানের তালা ভেঙে অবৈধভাবে মজুত করা ৩ টন সার জব্দ ও আরেক ব্যবসায়ীকে অর্থদণ্ড করা হয়েছে। লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে অবৈধভাবে মজুত করা ৫৯ বস্তা সার জব্দ করা হয়েছে। দিনাজপুরের বিরলে বালাইনাশক বিক্রেতার দোকান থেকে অবৈধভাবে মজুত করা সার জব্দ করে অর্থদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। চুয়াডাঙ্গায় পাচারের সময় ট্রাকভর্তি ৪৪০ বস্তা সার জব্দ করেছেন স্থানীয়রা। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে সার না পেয়ে ডিলার পয়েন্ট ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছেন কৃষকরা। ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
রাজশাহী : বৃহস্পতিবার দুপুরে দুর্গাপুর উপজেলার কিসমত গণকৈড় ইউনিয়নের আড়ইল এলাকায় সাইদুল ইসলামের বাড়িতে ইউএনওর নেতৃত্বে অভিযান চালানো হয়। এতে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহানা পারভীন লাবনীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রশাসনের উপস্থিতি টের পেয়ে সাইদুল সরে যান। অভিযানে ৬৭০ বস্তা টিএসপি, ডিওপি ও ইউরিয়া সার জব্দ করা হয়।
সাইদুলের দাবি, তার বাড়িতে মোট ৯৯৫ বস্তা সার ছিল। কিন্তু প্রশাসন জব্দ দেখিয়েছে ৬৭০ বস্তা। বাকি ৩২৫ বস্তা সার গায়েব করে পরে বিক্রি করা হয়েছে। এতে ৮ লাখ টাকার বেশি হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। গায়েব হওয়া সার উদ্ধারে সাইদুল উপজেলা পরিষদে গিয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) লায়লা নূর তানজুর সঙ্গে দেখা করেন। তার ভাষ্য, সহকারী কমিশনার তাকে বলেন, ‘আপনি সার পাবেন না। তবে এমপি সাহেব ইচ্ছে করলে হয়তো আপনি ফেরত পেতেন।’ এ বিষয়ে সহকারী কমিশনারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গায়েব হওয়া সার বিক্রির বিষয়ে সাইদুল বলেন, কিসমত গণকৈড় ইউনিয়নের বিসিআইসি সার ডিলার মেসার্স ডিআর ট্রেডার্সের শিপন কুমার সাহার কাছে সার বিক্রি করা হয়েছে। শিপন তা অস্বীকার করে বলেন, প্রশাসন সেলিম ট্রেডার্সের সেলিম সরকার ও মণ্ডল ট্রেডার্সের আব্দুল আজিজ মণ্ডলকে সার দিয়েছে।
দুর্গাপুর পৌরসভা বিএনপির সাবেক সভাপতি আব্দুল আজিজ মণ্ডল সার বিক্রিতে সহযোগিতার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, সেলিম ট্রেডার্সের মাধ্যমে সার বিক্রি হয়েছে। শুক্রবার উজানখুলশিতে আমার দোকানের সামনে সার বিক্রি হয়েছে। শনিবার পৌরসভা সদরে সেলিম ট্রেডার্স সার বিক্রি করেছে।
কৃষি কর্মকর্তা শাহানা পারভীন লাবনী বলেন, জব্দ করা সার আব্দুল আজিজ মণ্ডলের মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে বিক্রি করা হয়েছে। সার গায়েবের অভিযোগ ভিত্তিহীন। সাইদুলের লাইসেন্স না থাকার বিষয়ে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। তবে মামলা দেওয়া হয়নি।
ইউএনও উম্মে হাবিবা ফারজানা বলেন, সবার উপস্থিতিতে সার গণনা করা হয়েছে। সার গায়েবের অভিযোগ আমি প্রথম শুনলাম এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। কৃষি কর্মকর্তা ছুটিতে থাকায় মামলা করা হয়নি বলেও জানান তিনি।
মধুপুর (টাঙ্গাইল) : মধুপুরে নির্ধারিত গন্তব্যের বাইরে নিয়ে বেশি দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে পাচারের সময় ৩৯৫ বস্তা সরকারি সার জব্দ করেছে পুলিশ। ৩ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল সড়কের জলছত্র এলাকার দিবারাত্রী হোটেলের সামনে স্থানীয়রা একটি সারবোঝাই ট্রাক আটক করেন। পরে পুলিশ ট্রাকটি জব্দ করে। এতে ১২৭ বস্তা টিএসপি ও ২৬৮ বস্তা এমওপি সার ছিল। সরকারি হিসাবে এসব সারের মূল্য প্রায় ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৪৫০ টাকা।
এ ঘটনায় ট্রাকচালক ফরহাদ হোসেন মিঠুকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলায় মো. রুবেল, মুক্তাগাছার মেজবাহ এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন ও মা-বাবা এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. আসাদুজ্জামান খোকনসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৪-৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। নামীয় আসামিরা পলাতক।
তবে বিএডিসির ময়মনসিংহ আঞ্চলিক কার্যালয় জানিয়েছে, জব্দ সারের সঙ্গে মুক্তাগাছার দুই প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা চারটি সরবরাহ আদেশ ভুয়া। তদন্তে ওই দুই প্রতিষ্ঠানের বরাদ্দের সার সংরক্ষিত অবস্থায় পাওয়া গেছে। ফলে জব্দ ৩৯৫ বস্তা সারের মালিকানা নিয়ে রহস্য তৈরি হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত কেউ ওই সারের মালিকানা দাবি করেননি।
গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) : গৌরীপুরে অবৈধ সার মজুতের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা ও কীটনাশক ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম সুজনের দোকানের তালা কেটে ৩ টন ২৫ কেজি টিএসপি ও ২৫ কেজি ইউরিয়া জব্দ করা হয়েছে। রোববার অচিন্তপুর ইউনিয়নের পালুহাটি বাজারে এ অভিযান চালানো হয়। দোকানটি সিলগালা করে ইউপি সদস্যের জিম্মায় রাখা হয়েছে। জব্দ সার নকল কি না, তা পরীক্ষা করতে নমুনা পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাওসার আহমেদ।
একই বাজারে প্রায় ২ টন সার মজুতের অভিযোগে আতাউর রহমানকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। আতাউর জানান, তার নিজের সারের লাইসেন্স নেই; ছোট ভাই আবুল কাসেমের খুচরা সারের লাইসেন্সে ব্যবসা করেন।
কমলনগর (লক্ষ্মীপুর) : কমলনগরে অবৈধভাবে মজুত ও পাচারের চেষ্টার অভিযোগে ৫৯ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে রোববার ১৯ বস্তা অন্যত্র নেওয়ার সময় স্থানীয়রা একটি পিকআপ ভ্যান আটক করেন। এর আগে এক সপ্তাহে আরও ৪০ বস্তা সার জব্দ করা হয়। লাইসেন্স না থাকা ব্যবসায়ী ইসরাফিল ডিলারদের কাছ থেকে সার সংগ্রহ করে বেশি দামে বিক্রির জন্য মজুত করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইকতারুল ইসলাম বলেন, উপজেলায় পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে; কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ দেওয়া হবে না।
বিরল (দিনাজপুর) : বিরলে বালাইনাশক বিক্রেতার দোকানে অবৈধভাবে মজুত ৮৪ বস্তা সার জব্দ করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। রোববার নাড়াবাড়ী বাজারের মেসার্স নবাব ট্রেডার্সে অভিযান চালিয়ে ৩২ বস্তা টিএসপি, ২৫ বস্তা ইউরিয়া, ২৫ বস্তা এমওপি ও ২ বস্তা ডিএপি জব্দ করা হয়। দোকান মালিক মশিউর রহমানকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জব্দ সার সরকারি মূল্যে কৃষকদের মধ্যে বিক্রি করে অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা) : আলমডাঙ্গায় পাচারের সময় ৪৪০ বস্তা টিএসপি সারসহ একটি ট্রাক আটক করেছেন স্থানীয়রা। রোববার সকালে হাটবোয়ালিয়া সড়কের চিৎলা বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পরে হাপানিয়া ক্যাম্প পুলিশ সার ও ট্রাকটি হেফাজতে নেয়। পুলিশের ভাষ্য, সরকারি সার বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই অন্যত্র নেওয়া হচ্ছিল। ট্রাকের চালানের তথ্যের সঙ্গে সার, গন্তব্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্যে মিল পাওয়া যায়নি। আটক সার আলমডাঙ্গার ভাংবাড়িয়া ইউনিয়নের মুদি ব্যবসায়ী মিনারুল ইসলামের বলে জানা গেছে। তার দাবি, কৃষকদের চাহিদা পূরণের জন্য যশোরের নওয়াপাড়া থেকে সার আনা হচ্ছিল।
কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) : সার না পেয়ে রোববার কালীগঞ্জ উপজেলার জামাল ইউনিয়নের দুধরাজপুরে ডিলার পয়েন্ট ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছেন কৃষকরা। পরে গোডাউন খুলে ৬০ বস্তা সার পাওয়া যায় এবং কৃষি অফিসের ব্যবস্থাপনায় কৃষকদের মধ্যে তা বিতরণ করা হয়। কৃষকদের অভিযোগ, ডিলার শহিদুল ইসলাম বিভিন্ন মানুষের নাম রেজিস্টারে তুলে বেশি দামে সার বিক্রি করেছেন। তবে শহিদুলের দাবি, তিনি বরাদ্দের সার বিতরণ করে দিয়েছেন।
চলতি সেপ্টেম্বরে শহিদুলের ৬৪ টন সার বরাদ্দ ছিল। তিনি প্রথম সপ্তাহে ৫৮ টন উত্তোলন করেন। কৃষি কর্মকর্তারা বিতরণ রেজিস্টার পরীক্ষা করছেন। জেলা কৃষি বিভাগ ও বাফার গুদাম কর্তৃপক্ষের দাবি, সারের ঘাটতি নেই। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, কিছু মানুষ কৃত্রিমভাবে সারের সংকট তৈরির চেষ্টা করছে। তবে কৃষকদের অভিযোগ, ডিলার পয়েন্টে সার মিলছে না; বেশি দাম দিলে খোলা বাজারে পাওয়া যাচ্ছে।
