জিন্নাহর ছবি টিকল না ডাকসুর দেওয়ালে
ছবি ছিঁড়ে ফেললেন এক শিক্ষার্থী
Advertisement
ঢাবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ডাকসু সংগ্রহশালায় সোমবার জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলেছেন শিক্ষার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সংস্কারের পর নতুনভাবে চালু হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন ঘিরে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রতিবাদে জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফ্রেম ভাঙচুর করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী। একই সংগ্রহশালায় জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমকে লক্ষ্য করে জুতা নিক্ষেপের একটি ছবিও সাঁটিয়েছেন বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের এক নেতা। এদিকে জিন্নাহসহ ‘বিতর্কিত ব্যক্তিদের’ ছবি অপসারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। তবে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদের দাবি, জিন্নাহকে সম্মানিত করতে নয়, ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক পটভূমি তুলে ধরতেই তার ছবি ও বক্তব্য প্রদর্শন করা হয়েছিল।
সংস্কারকাজ শেষে রোববার ডাকসু সংগ্রহশালাটি নতুনভাবে চালু করা হয়। সংস্কারের পর সেখানে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি সংযোজন করা হয়। এর মধ্যে একটি ছিল ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া জিন্নাহর ভাষণের ছবি। ওই ভাষণে তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।
ছবিগুলো প্রদর্শনের বিষয়টি সামনে আসার পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। একইসঙ্গে সংগ্রহশালায় ঐতিহাসিক ব্যক্তি ও ঘটনাবলি কোন প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা নিয়েও বিভিন্ন মহল প্রশ্ন তোলে।
জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেললেন শিক্ষার্থী : সোমবার দুপুর আড়াইটার দিকে ডাকসু সংগ্রহশালায় গিয়ে জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে তিনটি ফ্রেম ভাঙচুর করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০১-২০০২ শিক্ষাবর্ষের উর্দু বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার। তিনি ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে সহসভাপতি (ভিপি) পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ছবি ছিঁড়ে ফেলার সময় আবু তৈয়ব বলেন, এ দেশের ভাষা আন্দোলনের আসল নায়কদের বাদ দিয়ে পাকিস্তানের জিন্নাহর ছবি কেন ডাকসু সংগ্রহশালায় রাখা হয়েছে, তার জবাব প্রশাসন ও ডাকসু নেতাদের দিতে হবে। যে জিন্নাহ আমাদের মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল, তাকে কীভাবে এখানে স্থান দেওয়া হয়? তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ-সব আন্দোলনে রক্ত দিয়েছে। এখানে ভাষা আন্দোলনের নায়ক অধ্যাপক আবুল কাসেমের ছবি থাকতে হবে। শেখ মুজিবুর রহমান ও মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশের ছবিও থাকতে হবে।
গোলাম আযমকে জুতা নিক্ষেপের ছবি সাঁটাল ছাত্র ফেডারেশন : জিন্নাহর ছবি নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই ডাকসু সংগ্রহশালায় জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমকে লক্ষ্য করে জুতা নিক্ষেপের একটি ছবি সাঁটানো হয়েছে। ছবিটি সাঁটান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী এবং বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক অর্ক বড়ুয়া। ছবিতে বায়তুল মোকাররম এলাকায় উপস্থিত ক্ষুব্ধ মানুষকে গোলাম আযমের দিকে জুতা নিক্ষেপ করতে দেখা যায়। এর ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, ‘১৯৮১ সালের ১ জানুয়ারি বায়তুল মোকাররমে ফিলিস্তিনের যুদ্ধে শহীদ দুই বাংলাদেশির জানাজা নামাজ পড়তে এলে উপস্থিত মুসল্লিরা তাকে জুতাপেটা করেন।’
ছবিটি সাঁটানোর কারণ জানতে চাইলে অর্ক বড়ুয়া বলেন, ডাকসু সংগ্রহশালা বাংলাদেশের মানুষের লড়াই ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলির একটি আর্কাইভ। ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক এখানে জিন্নাহর ছবি লাগানোর পর বলেছেন, তার ইচ্ছা হয়েছে বলে তিনি ছবিটি লাগিয়েছেন। আমারও ইচ্ছা হয়েছে, তাই গোলাম আযমের এই ছবি লাগিয়েছি।
ছাত্রদলের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম : ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহসহ বিতর্কিত ব্যক্তিদের ছবি অপসারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। সোমবার দুপুরে ডাকসুর পদাধিকারবলে সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ আলটিমেটাম দেন ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস। তিনি বলেন, ডাকসু ভবন ও সংগ্রহশালা বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের স্মৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেই সংগ্রহশালায় বিতর্কিত ব্যক্তিদের ছবি টানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবময় ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। ছাত্রদল এ ধরনের কর্মকাণ্ড নীরবে মেনে নিতে পারে না। ঢাবি ছাত্রদল সভাপতি আরও বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ইট, কাঠ, দেওয়াল ও ধূলিকণা ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং দেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাস বহন করে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় এমন কোনো ব্যক্তির ছবি থাকতে পারে না, যার ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাস ও স্বাধীনতার চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এদিকে বিকালে ডাকসু আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জিন্নাহর ছবি রাখার কারণ ব্যাখ্যা করেন ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ। তিনি বলেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন হঠাৎ করে সংঘটিত হয়নি। এর আগে ধারাবাহিকভাবে অনেক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল। জিন্নাহ সরাসরি বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বলেছিলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। তার সেই বক্তব্যটি আমরা ভাষা আন্দোলনের পটভূমি হিসাবে উল্লেখ করেছি। ছবির নিচে ইংরেজিতে তার বক্তব্যের সরাসরি উদ্ধৃতিও দেওয়া হয়েছিল। এরপর কীভাবে ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী প্রেক্ষাপট তৈরি হয়, সেটিও দেখানো হয়েছে।
এস এম ফরহাদ বলেন, আমরা যদি জিন্নাহর ছবি এবং তার ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’-এই বক্তব্যসংবলিত ক্যাপশন না দিতাম, তাহলে হয়তো বলা হতো, জিন্নাহ যে বাংলা ভাষার বিরোধিতা করেছিলেন, আমরা তা লুকিয়েছি কিংবা তাকে দায়মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেছি। ছবি ও ক্যাপশন দেওয়ার পরও এখন সেটির বিরোধিতা করা হচ্ছে।
যা বলছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ডাকসু সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং তৎকালীন ছাত্রসংঘ নেতা আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এমন ব্যক্তিদের ছবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অপশক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলবে ছাত্রদল
এদিকে সোমবার সকালে ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ছাত্রদল অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছে যে, ডাকসুর বর্তমান নেতৃত্ব সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসন, আবশ্যিক অধিকার আদায় ও শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরিতে পুরোপুরি ব্যর্থ। শিক্ষার্থীদের ন্যায়সংগত স্বার্থের তোয়াক্কা না করে তারা পরিষদটি নিজেদের সুনির্দিষ্ট দলীয় ও আদর্শিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ারে পরিণত করেছে। মধুর ক্যান্টিনের নাম পরিবর্তন করে ‘ইশরাত মঞ্জিল’ করার ঘৃণ্য অপচেষ্টা থেকে শুরু করে ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর বিতর্কিত ছবি স্থাপন-এসব ধারাবাহিক কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে যে, শিবির নিয়ন্ত্রিত ডাকসুর এই পরিষদ শিক্ষার্থীদের গণআকাঙ্ক্ষা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিকামী চেতনা বিসর্জন দিয়ে ১৯৭১ সালের পরাজিত শক্তির প্রতি তাদের প্রচ্ছন্ন অনুরাগ ও ‘পাকিস্তান প্রেম’ জাহির করছে। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, অবিলম্বে ডাকসুর সংগ্রহশালা থেকে বাংলা ভাষার বিরোধিতাকারী মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি অপসারণ করতে হবে; ডাকসুকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আদর্শ চর্চার স্থান হিসাবে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। ঐতিহাসিক মধুর ক্যান্টিনসহ ঢাবির প্রতিটি ঐতিহাসিক স্মারক ও চেতনা বিকৃত করার সব অপপ্রয়াস রুখে দেওয়া হবে। ১৯৪৮ সালে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে চাপিয়ে দেওয়ার জিন্নাহর ঔদ্ধত্যপূর্ণ উক্তির বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ যেভাবে গর্জে উঠেছিল, ঠিক তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল চেতনা, ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে যে কোনো অপশক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
