বেনাপোল বন্দর
পণ্য খালাস পরীক্ষণে শেডে শেডে অনিয়ম
মিলেছে শুল্ক ফাঁকি, পণ্য ও পণ্যমূল্য লুকানোর তথ্য * চক্র শনাক্তে পর্যালোচনা হচ্ছে সিসিটিভির ফুটেজ * কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা : বন্দর কর্তৃপক্ষ
Advertisement
মো. কামাল হোসেন, বেনাপোল (যশোর)
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বেনাপোল স্থলবন্দরে পণ্য খালাস ও রাজস্ব আদায়ের বিভিন্ন ধাপে অনিয়ম-দুর্র্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ফলে বন্দরের বিভিন্ন শেডে (ছাউনি বা ঘর) পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া, পরীক্ষণ এবং রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বন্দরের বিভিন্ন শেডের তথ্য ও কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং স্থানীয়দের অভিযোগ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অনিয়ম-দুর্নীতি শুধু একটি চালান বা একটি শেডে সীমাবদ্ধ নেই। ১২, ১৫, ১৭, ২৮, ২৯, ৩০, ৪১ ও ৪২ নম্বর শেড ঘিরে বিভিন্ন সময়ে পণ্য খালাস, পরীক্ষণ ও রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে। কোনোটাতে পণ্য গোপন রাখা, পণ্যমূল্যের প্রকৃত চিত্র লুকানো কিংবা পণ্যের পরিমাণ গোপন রাখার অভিযোগ মিলেছে। আবার কোনো শেডে শুল্ক পরিশোধের আগেই পণ্য বের করে নেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে।
অনিয়মে আলোচিত কয়েকটি শেড : সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ২৯ নম্বর শেডের। ৮ সেপ্টেম্বর ওই শেড থেকে তিনটি ট্রাক পণ্য শুল্ক পরিশোধ না করেই বের হয়ে যায়। তিন ট্রাকে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা মূল্যের কসমেটিকস, ব্লেড, শাড়ি ও থ্রি পিস ছিল। ট্রাক তিনটির নম্বর ‘যশোর ট ১১ ৩১৩৩’, ‘ঢাকা মেট্রো ট ২০ ৮৩৪৯’ এবং ‘ঢাকা মেট্রো ট ২২ ৭৪৭১’। এ ঘটনায় পণ্যের নিরাপত্তার পাশাপাশি শুল্কায়ন, পরীক্ষণ, গেট নিয়ন্ত্রণ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ঢাকার মৌলভীবাজারের সাদিয়া এন্টারপ্রাইজের আমদানি করা ওই পণ্যচালানের খালাসের দায়িত্বে ছিল প্রত্যয় এন্টারপ্রাইজ নামের একটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট। ওই শেডের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কাস্টমসের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পর কাস্টমস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলামকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন শাখায় সংযুক্ত করা হয়েছে। ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
১২ নম্বর শেডে একটি ইমিটেশন পণ্যের চালান নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, চালানটিতে ঘোষিত পরিমাণের তুলনায় বেশি পণ্য কম দেখিয়ে খালাসের চেষ্টা হয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে ৩০ নম্বর শেডের একটি চালান নিয়েও। ৬ সেপ্টেম্বর বন্দরে আসা ওই ইমিটেশন পণ্যের চালান ৮ সেপ্টেম্বর কাগজপত্রের ভিত্তিতে শুল্ক আদায়ের পর খালাস দেওয়া হয়। ওই চালানের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ছিল চাঁদ এন্টারপ্রাইজ। এ ছাড়া ৪১, ২৯, ২৮, ১২, ১৫, ১৭, ৪২ ও ৩০ নম্বর শেডে বিভিন্ন সময়ে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে।
রাজস্ব ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন : বেনাপোল কাস্টমসের রাজস্ব আদায়ের পরিসংখ্যানেও বড় ব্যবধান রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ছয় হাজার ৫৯৯ কোটি টাকা। ঘাটতি দাঁড়ায় চার হাজার ৬৯১ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৫৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ আদায় হয়েছে ও প্রায় ৪১ দশমিক ৫৫ শতাংশ আদায় হয়নি।
পণ্য ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম : আটক পণ্য ব্যবস্থাপনাকে ঘিরেও পৃথক একটি ঘটনা সামনে এসেছে। চলতি বছরের ২৪ মে জারি করা একটি চিঠিতে বেনাপোল কাস্টমসে আটক কাপড় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণভান্ডারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। তালিকায় ছিল ৩ হাজার ২২টি শাড়ি, ৫৮টি থ্রি পিস, ২০৮টি চাদর, ২৬৩টি কম্বল ও আটটি ওড়না। গুদাম কর্মকর্তা ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জিকে পণ্য হস্তান্তরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, দুটি কাভার্ডভ্যানে বিপুল পরিমাণ প্রসাধন সামগ্রী বোঝাই করে পাচারের চেষ্টা করা হয়। পরে বিজিবির অভিযানে ইন্দ্রজিৎ মুখার্জি, কাভার্ডভ্যানের চালক মহসিন আলী ও হেলপার জাহিদ হাসান আটক হন। সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্স ব্যবস্থাপনাও অভিযোগের একটি অংশ। ব্যবসায়ীদের দাবি, নিজের লাইসেন্স থাকা সত্ত্বেও কেউ কেউ অন্যের লাইসেন্স ভাড়া নিয়ে পণ্য খালাসের কাজ করছে। তাদের অভিযোগ, এভাবে একটি চক্র বিভিন্ন অনিয়মের সুযোগ নিচ্ছে। আব্দুর রহমান, সেলিম হোসেন, মুক্তাদির ও সোবহান হোসেনসহ কয়েকজন স্থানীয় ব্যবসায়ী অন্যের লাইসেন্স ভাড়া নেওয়ার কথা স্বীকারও করেছেন।
বেনাপোল আমদানি রপ্তানিকারক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান জিয়ার দাবি, পুরোনো অসাধু কর্মকর্তারা নতুন দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদেরও এই চক্রে টানার চেষ্টা করছেন।
অনিয়মে অভিযুক্ত হিসাবে কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. মাহিদুল ইসলাম-১, মো. শহিদুল ইসলাম ও মো. তরিকুল ইসলামের নাম উঠে এসেছে। একইভাবে বেনাপোল স্থলবন্দরের ওয়্যারহাউস সুপারিনটেনডেন্ট মো. আসমাউল শান্ত, ট্রাফিক পরিদর্শক নাহিদুল ইসলাম এবং শেড ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী মো. লিংকনের নামও এসেছে।
বেনাপোল স্থলবন্দরের উপপরিচালক মো. রুহুল আমিন বলেন, সিসিটিভি ক্যামেরাসহ সম্ভাব্য সবকিছু পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
