নিঃসঙ্গ প্রবীণদের ভার নেবে কে
শিপন হাবীব
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাসের মধ্যে এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছেন। দূরে-কাছে কোথাও হয়তো গন্তব্য তার। চালক ব্রেক কষলেই তিনি নিজেকে সামলাতে না পেরে সামনের সিটের ওপর ঝুঁকে পড়ছিলেন। কিন্তু সামনের সিটে যারা বসেছিলেন তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। অল্পবয়সি ছেলেমেয়ে ছিল ওই সিটে। বৃদ্ধের কষ্টের ব্যাপারটি তাদের দৃষ্টিতে পড়লই না। প্রতিদিন গণপরিবহণে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের এমন কষ্ট চোখে পড়ে। একইভাবে প্রবীণ নিবাসগুলোতেও বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের করুণ কান্না এখন নিত্যদিনের দৃশ্য।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, দেশের প্রবীণরা ভালো নেই। পাড়া-প্রতিবেশী কিংবা আত্মীয়স্বজনকে বয়োজ্যেষ্ঠদের ব্যাপারে উদাসীন থাকতে দেখা যায়। যথাযথ মানবিক দৃষ্টিতে তারা প্রবীণদের কদর করেন না। অবজ্ঞা কিংবা লাঞ্ছনাই যেন প্রবীণদের ভাগ্যলিপি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বয়োজ্যেষ্ঠরা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছেন। এই অবস্থায় তাদের ভার নেবে কে-এ এক বিরাট প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অল্পবয়সিরা একদিন প্রবীণ হবে, তা তারা ভুলেই যায়।
দেশে বর্তমানে ষাটোর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর হার প্রায় ১০ শতাংশ। ২০২২ সালে ছিল ৯.২৮ শতাংশ। ২০১১ সালে ৭.৪৭ এবং ২০০১ সালে ৬.২৩ শতাংশ। ২০২৬ সালের শেষে এ সংখ্যা ২ কোটিতে পৌঁছবে। ২০৪১ সালে প্রবীণদের সংখ্যা ৩ কোটির বেশি এবং ২০৬১ সালে প্রায় ৬ কোটিতে দাঁড়াবে। অর্থাৎ চার দশক পর দেশের প্রায় এক চতুর্থাংশের বেশি মানুষই প্রবীণ হয়ে পড়বে। এমন তথ্যই বলছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, প্রবীণদের সংখ্যা লাফিয়ে বাড়ছে। তারা ঘরে-বাইরে সর্বত্রই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছেন। এই অবস্থায় আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব প্রবীণ দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘দীর্ঘায়ুর যুগ : দীর্ঘ জীবনের জন্য নতুন ভাবনা’।
বৃদ্ধাশ্রমে করুণ দৃশ্য : বুধবার রাজধানীর প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলছিলেন যুগান্তরের এই প্রতিবেদক। এখানে ৩০ জন প্রবীণ রয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৭ জনই নারী। দুপুরের রোদ্দুর সবেমাত্র বারান্দার গ্রিল পেরিয়ে পশ্চিম দিকে হেলছে। বৃদ্ধাশ্রমটিতে থাকা প্রায় ৯০ বছর বয়সি এক নারী পত্রিকা পড়ছিলেন। অনুমতি নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করতেই বললেন, ‘সাবধান ছবি তুলবে না, আমার সন্তানরা দেখতে পেলে মেরেই ফেলবে। সমাজের মানুষ জানে, আমি তাদের অট্টালিকায়ই আছি। সন্তানরা আমাকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়ে রেখেছে’। কথাগুলো বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বললেন, তার বাড়ি নারায়ণগঞ্জ কাশীপুর হাটখোলায়। ২ ছেলে ১ মেয়ে তার। স্বামী মারা গেছেন ১৪ বছর আগে। ছেলেমেয়েরা যেন রাজা-রানি। ওরা অট্টালিকায় থাকে, অর্থ-সম্পদে ভরা। সবই আমরা (স্বামীসহ) করে দিয়েছি। এখন বৃদ্ধাশ্রমে থাকি। একটি বারের জন্য ছেলেরা খোঁজও নেয় না। কিছুদিন আগে বড় ছেলের একমাত্র ছেলেকে বিয়ে করানো হয়েছে। ওই বিয়েতে কত মানুষ উপস্থিত ছিল, আমাকে কেউ দাওয়াতও দেয়নি। নাতি ও নাতির স্ত্রী এখন অস্ট্রেলিয়ায়। জীবনের এ শেষ বেলায়, সন্তানরা যদি আমাকে তাদের কাছে রাখত! মরেও শান্তি পেতাম। তবে, আমি আল্লাহর কাছে সর্বদা প্রার্থনা করি, তাদের যেন এমন দশা কখনো না হয়।
প্রায় ৯০ বছরের বৃদ্ধ বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে কাঁদছেন। কাছে যেতেই বললেন, ‘প্রবীণ দিবস, তাই দেখতে আসলেন। আরে বাবা চিড়িয়াখানায়ও তো শত শত মানুষ প্রাণীদের দেখতে যায়। আমাদের সন্তান, আত্মীয়স্বজনরা একটি বারের জন্যও দেখতে আসে না। তোমরা (সাংবাদিক) আসলে আরও ভয়ে থাকি। কেন? মিডিয়ায় পরিচয় দিয়ে কথাবার্তা বললে সন্তানরা প্রচণ্ড রেগে যায়। গোপনে এখানে এসে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে যায়। সন্তানরা চায় না আমরা কিছু বলি, তাতে নাকি তাদের ইজ্জত চলে যায়।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রায় শত বছর বয়সি এক নারী চেয়ারে বসে ঝিমাচ্ছিলেন। সন্তানরা পাড়ি দিয়েছে সুদূর টেক্সাসে। বাড়ি-গাড়ি সবই ছিল, এখন শূন্য। স্বামী নেই প্রায় ৩০ বছর। এখন বৃদ্ধাশ্রমের এক চিলতে বারান্দায় বসে শুধুই কাঁদেন। বাইরের কিছু দৃশ্য আর ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দই তার একমাত্র চেনা বৃত্ত।
কুরআন পড়ছিলেন জীর্ণশীর্ণ এক ব্যক্তি। পাশে গিয়ে বেশ কতক্ষণ দাঁড়াতেই চোখ তুলে তাকালেন। কথা বলতে চাইলে বললেন, ‘কী লাভ কথা বলে, প্রায় দেড় যুগ ধরে এখানে থাকছি। অনেকে চোখের সামনে মরে গেছেন। সেই মরদেহ স্বজনরা নিয়েছে কি না জানা নেই। আমি হয়তো দ্রুত সময়ই চলে যাব।’ পরে শিশুর মতো হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন।
নিবাসটিতে থাকা ১৩ জন বাবা এবং ১৭ জন মায়ের গল্প প্রায় একই। সরকারি বেসরকারি মিলে প্রায় ৩৫টি ছোট বড় বৃদ্ধাশ্রম বা প্রবীণ নিবাস রয়েছে। এসব নিবাসে আনুমানিক ৩ হাজারের মতো প্রবীণ মানুষ রয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ছয়টি শান্তি নিবাস আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুল ইসলাম খান যুগান্তরকে বলেন, সমাজ আজ বড়ই নির্মমতার দিকে যাচ্ছে। মানুষের মধ্যে বন্ধন ভেঙে যাচ্ছে। বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানরা অমানবিক আচরণ করছেন। যে মা নিজের মুখের খাবার সন্তানকে খাইয়েছিলেন, যে বাবা নিজের ছেঁড়া জুতোয় তালি মেরে সন্তানের পায়ে পরিয়েছিলেন দামি বুট, আধুনিক ড্রয়িংরুমের আসবাবের ভিড়ে সেই মা-বাবাই আজ বড্ড ‘বেমানান’।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক প্রধান ড. এএসএম আতিকুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, সমাজে প্রবীণদের প্রধান সংকট হলো একাকীত্ব। প্রবীণরা তাদের জীবন দিয়ে সমাজ ও পরিবারকে গড়ে তুলেছেন, তাদের সম্মান করা প্রতিটি পরিবারের মৌলিক দায়িত্ব।
