বরিশাল সিটি নির্বাচন
প্রচারণার মাঠে জামায়াত মনোনয়ন দ্বন্দ্বে বিএনপি
হাওয়া বদলে দিয়েছেন ফয়জুল করীম
আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কবে নাগাদ নির্বাচন হবে তার ঠিক-ঠিকানা না থাকলেও কে হচ্ছেন বিএনপির মেয়রপ্রার্থী, তা নিয়ে আলোচনার শেষ নেই বরিশালে। এরই মধ্যে এখানে মেয়র পদের প্রার্থিতা চূড়ান্ত করেছে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান থেকে সৃষ্ট এনসিপি এবং বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর প্রার্থীও প্রায় চূড়ান্ত। তবে জটিলতা বেধেছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপিকে নিয়ে। এখানে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে এখন পর্যন্ত মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন চাইছেন বিএনপির ১১ জন নেতা। তাদের মধ্যে শেষ পর্যন্ত কার ভাগ্যে ছিঁড়বে শিকে, সেটা অবশ্য বলা মুশকিল। তবে এবারের নির্বাচনে যে বিষয়টি সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে তা হলো ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির মুফতি মুহাম্মাদ ফয়জুল করীমের অনুপস্থিতি। দল থেকে প্রার্থী দেওয়া হলেও তিনি নিজে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার কথা জানিয়েছেন ইতোমধ্যে। সেক্ষেত্রে প্রার্থী নির্বাচনে সামান্যতম ভুল হলেও তার খেসারত দিতে হতে পারে বিএনপিকে।
জাতীয় নির্বাচনের মতো সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও নিজস্ব পদ্ধতি নিয়ে মাঠে নেমেছে জামায়াত। এরই মধ্যে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে তারা। দলের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসাইন হেলালকে দেওয়া হয়েছে মেয়র পদে মনোনয়ন। সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনেও হেলালকে বরিশাল সদর আসনে মনোনয়ন দিয়েছিলেন তারা। পরে অবশ্য চরমোনাই পীরের আসন হিসাবে সরে দাঁড়ায় জামায়াত। প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন হেলাল। জাতীয় নির্বাচন থেকে শুরু হওয়া হেলালের প্রচার-প্রচারণা আর গণসংযোগ এখনো চলছে অব্যাহত গতিতে। ফলে প্রস্তুতি প্রশ্নে অন্য যে কারও চেয়ে এগিয়ে আছেন তিনি। সাংগঠনিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী দল জামায়াতের কর্মী-সমর্থকরাও আছেন মাঠে। প্রায় প্রতিদিনই মানুষের বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন তারা। কৌশল হিসাবে প্রতি ওয়াক্তে আলাদা আলাদা মসজিদে নামাজ আদায় করছেন হেলাল। কুশল বিনিময় করছেন মুসল্লিদের সঙ্গে। যে কারও মৃত্যুর খবরে ছুটে যাচ্ছেন সেই বাড়িতে। অংশ নিচ্ছেন জানাজা কিংবা শেষবিদায়ে। খুব গোপনে অসহায় দরিদ্র মানুষকে সহায়তাও দিচ্ছে দলটি।
এখানে বাসদ-এর প্রার্থী হিসাবে আলোচনায় আছেন দেশব্যাপী পরিচিত শ্রমিক আন্দোলনের নেত্রী ডা. মনীষা চক্রবর্তী। বঞ্চিত মানুষের পক্ষ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে যিনি বারবার হয়েছেন হামলা-মারধরের শিকার। ২০১৮-এর সিটি নির্বাচনে ভোট ডাকাতির প্রতিবাদ করতে গেলে মেরে তার হাত ভেঙে দেন আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) নেতাকর্মীরা। বিগত জাতীয় নির্বাচনে বরিশাল সদর আসনে সংসদ-সদস্য প্রার্থী হয়ে প্রায় ২৩ হাজার ভোট পেয়েছিলেন মনীষা।
মেয়র পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও এনসিপি। ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে বিশিষ্ট আইনজীবী ও সমাজসেবক শেখ আব্দুল্লাহ নাসিরের নাম। মানবিক আইনজীবী নাসির তার পেশাগত জীবনে বহু দরিদ্র মানুষকে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দিয়েছেন। এছাড়া এনসিপির মেয়রপ্রার্থী হিসাবে চূড়ান্ত করা হয়েছে এম আনোয়ার সিকদারকে। দলীয় প্রার্থী হিসাবে নাম ঘোষণার পর থেকে মাঠে আছেন আনোয়ার। সবার দোয়া চেয়ে পোস্টার লাগানোর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে তার প্রচার-প্রচারণা।
প্রধান বিরোধী দল জামায়াতসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর যখন এমন অবস্থান, তখন বিএনপিতে চলছে মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার লড়াই। এ লড়াইয়ে মাঠে আছেন ১১ বিএনপি নেতা। তারা হলেন-বিসিসির বর্তমান প্রশাসক, বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন, বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সাবেক সংসদ-সদস্য অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের রহমতউল্লাহ ও এবায়েদুল হক চান, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক, সদস্য সচিব জিয়াউদ্দিন সিকদার, দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবুল কালাম শাহিন, মহানগর বিএনপির ১নং যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা নাসরিন, ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতি, জেলা ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান নান্টু, মহানগর বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আলী হায়দার বাবুল এবং সাবেক সদস্য সচিব মীর জাহিদুল কবির। আলোচ্য ১১ নেতার মধ্যে বিসিসির প্রশাসক পদে বসার সুযোগে খানিকটা হলেও সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন শিরিন। পকেটের পয়সা খরচ করে গণসংযোগ আর প্রচারণা চালাতে হচ্ছে বাকি মনোনয়ন প্রার্থীদের। তাদের মধ্যে আবার ৪ জন বরিশালের পাশাপাশি ঢাকায়ও চালাচ্ছেন লবিং-তদবির। নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন দলের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে। ১১ নেতার মধ্যে দুজন বিসিসি প্রশাসক শিরিন ঘরানার লোক হিসাবে পরিচিত বরিশালে। বাকিদের ঘনিষ্ঠতা এবার নিয়ে পঞ্চমবার বরিশাল সদর আসনের সংসদ-সদস্য হওয়া সাবেক মেয়র ও দলীয় চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মজিবর রহমান সরোয়ারের সঙ্গে। নির্বাচনি মাঠে এই ঘরানা আর ঘনিষ্ঠতার বিরোধই হবে বিএনপির জয়-পরাজয়ের সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর-এমনটাই মনে করছেন সবাই।
এখন পর্যন্ত সিটি নির্বাচনে প্রার্থী না হওয়ার সিদ্ধান্তে আছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির, ভোটের মাঠের শক্ত পাল্লা মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম। মেয়র পদে নির্বাচন করার কোনো ইচ্ছা নেই বলে তিনি জানিয়েছেন যুগান্তরকে। তার এই সিদ্ধান্তে ভোট সমীকরণের অনেক কিছুই বদলে গেছে বরিশালের নির্বাচনি মাঠে। ২০২৩ সালের নির্বাচনে হামলা চালিয়ে তাকে গুরুতর আহত ও দিনভর ভোট ডাকাতির পরও আওয়ামী লীগের মেয়রপ্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রায় ৩৬ হাজার ভোট পেয়েছিলেন মুফতি ফয়জুল। সবশেষ জাতীয় নির্বাচনে সংসদ-সদস্য প্রার্থী হিসাবে বরিশাল সদর আসনে তিনি ভোট পান প্রায় ১ লাখ। যদিও বলা হচ্ছে, ইসলামী আন্দোলনের মেয়রপ্রার্থী থাকবে বরিশালের সিটি নির্বাচনে। কিন্তু সেই প্রার্থী যে ফয়জুল করীমের মতো শক্ত অবস্থান গড়তে পারবেন না, তা বলাবাহুল্য। এমন পরিস্থিতিতে কোনদিকে যাবে চরমোনাইর ভোট, তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে এখানে মেয়র পদে জয়-পরাজয়।
দলীয় মনোনয়ন নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং ঘরানা-ঘনিষ্ঠতার বিরোধ দূর করতে না পারলে জামায়াতের শক্ত প্রার্থী হেলালের বিরুদ্ধে জয় পাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে বিএনপির জন্য। এই মন্তব্য দলেরই বহু মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীর।
বিষয়টি নিয়ে আলাপকালে বরিশালের জেলা পরিষদ প্রশাসক ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল বিভাগ) আকন কুদ্দুসুর রহমান বলেন, ‘মনোনয়ন নিয়ে দ্বন্দ্ব আগেও ছিল। তারপরও জাতীয় নির্বাচনে বিএনপিকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েছে এদেশের মানুষ। সর্বোপরি আমি মনে করি, দলের চেয়ারম্যান আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অজানা কিছু নেই। তার সিদ্ধান্তে যে ভুল হয় না, এর প্রমাণ আমরা আগেও পেয়েছি। তিনি বুঝেশুনেই সিদ্ধান্ত নেবেন।’
