সংবিধান সংশোধন কমিটির বৈঠক
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দাবি
Advertisement
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি জুলাই ঘোষণাপত্রের সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সংবিধানের উপযুক্ত জায়গায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন জুলাই শহীদপরিবারের সদস্য ও আহতরা। একই সঙ্গে তারা জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন, দায়মুক্তি ও আইনি সুরক্ষাকে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাবও করেন। তারা বলেছেন, সংবিধানে এমনভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ তা বাতিল করতে না পারে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের বীর উপাধি দেওয়া এবং আহতদের সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়ারও দাবি জানানো হয়েছে। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির বৈঠকে শহীদপরিবারের সদস্য ও আহতরা এসব দাবি জানান। জবাবে কমিটি জানিয়েছে, জুলাই শহীদপরিবার ও আহতদের সাংবিধানিক সুরক্ষা দিতে তফসিলে রাখা হবে। তাদের দায়মুক্তি এবং জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষা সাংবিধানিকভাবে ধারণ করা হবে।
সংবিধান সংশোধন কমিটি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নিচ্ছে। এরই অংশ হিসাবে মঙ্গলবার জুলাই শহীদপরিবারের সদস্য ও আহত ব্যক্তিদের সঙ্গে এ বৈঠক করে। ৬৩ জন বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠকে আমন্ত্রণ পাননি বলে জানিয়েছেন শহীদ মো. ওয়াসিমের বাবা মোহাম্মদ শফিউল আলম। তিনি যুগান্তরকে বলেন, এ ধরনের মিটিংয়ের কথা আমাকে জানানো হয়নি। কোনো আমন্ত্রণও পাইনি।
বৈঠকের পর সংসদের মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন কমিটির প্রধান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, বৈঠকে কয়েকটি বিষয় উঠে এসেছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, তারা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সাংবিধানিক স্বীকৃতি চান। বিশেষ করে জুলাই ঘোষণাপত্রের সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো যেন আমরা সংবিধানের উপযুক্ত জায়গায় ধারণ করি। সেক্ষেত্রে কেউ কেউ সুনির্দিষ্টভাবে প্রস্তাবনায় ধারণ করার কথা বলেছেন। জবাবে আমরা বলেছি, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নকালে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দল এবং শক্তি যেভাবে ঐকমত্য হয়েছে, সেভাবে আমরা ব্যবস্থা নেব এবং তাদের প্রস্তাবনাও আমরা লিপিবদ্ধ করেছি।
জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা সাংবিধানিকভাবে এই সুরক্ষাটা আনব তফসিলে, সুনির্দিষ্ট জায়গায়। যাতে তাদের দায়মুক্তি এবং জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষা সাংবিধানিকভাবে ধারণ করা যায়।
জুলাইয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা এবং জঘন্য হত্যাকাণ্ডের বিচার ত্বরান্বিত করার দাবি উঠেছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিচার প্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে চলছে এবং আদালত স্বাধীন। আমরা আমাদের সহযোগিতা-তদন্ত, প্রসিকিউশন, চার্জ ফ্রেমিং ইত্যাদি বিষয়ে সব কাজ দ্রুততার সঙ্গে করব।
এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই ঘোষণাপত্র ও গণ-অভ্যুত্থানের স্বীকৃতি সংবিধানের কোথায় রাখা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত নয়। তবে তফসিলে বিষয়টি ধারণ করার বিষয়ে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও জুলাই ঘোষণাপত্রের স্বীকৃতির পাশাপাশি জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি ও সাংবিধানিক সুরক্ষার বিষয়টিও ধারণ করা যেতে পারে। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নোট অব ডিসেন্টসহ যেভাবে জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবেই তা বাস্তবায়নে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। নোট অব ডিসেন্ট বাদ দিয়ে সনদ বাস্তবায়নের কোনো অবস্থানে সরকার নেই বলেও জানান তিনি। তার মতে, শুধু জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের মধ্যে সংবিধান সংশোধনের কাজ সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি ইশতেহার, বিভিন্ন গণদাবি এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছ থেকে পাওয়া প্রস্তাবও বিবেচনায় নেওয়া হবে। এসব বিষয় ধারণ করে একটি সংশোধনী বিল সংসদে উপস্থাপনের জন্য কমিটি রিপোর্ট দেবে।
এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কীভাবে গঠিত হবে, কারা এর অংশ হবেন এবং কোন প্রক্রিয়ায় সরকার গঠিত হবে-এসব বিষয় এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ বিষয়ে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়া হচ্ছে। সামনে আইনজীবী, বিচারক, সাবেক বিচারপতি, অ্যাটর্নি জেনারেল, সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতি, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে ঐকমত্য কমিশনে বিভিন্ন প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, একাধিক পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রয়োজন হলে জাতীয় সংসদে আলোচনার মাধ্যমে মধ্যবর্তী কোনো পদ্ধতিও নির্ধারণ করা হতে পারে। সব প্রস্তাব পর্যালোচনা করে এমন একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে চায় কমিটি, যা বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসাবে রাষ্ট্রপতিকে রাখার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ঐকমত্য কমিশনে কমিটির পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতিকে সর্বশেষ বিকল্প হিসাবে রাখার প্রস্তাব না দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। অতীতে এ নিয়ে বিতর্ক থাকায় রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার বিকল্প না রাখাই ভালো বলে তাদের মত ছিল।
সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে গণভোটের সম্পর্ক নিয়েও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন কমিটির প্রধান। তিনি বলেন, সংবিধানের যেসব মৌলিক বিষয়ে সংশোধন আনা হবে, সেগুলোর ক্ষেত্রে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী গণভোটের প্রয়োজন হবে। বিশেষ করে সংবিধানের প্রস্তাবনা, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি এবং অন্যান্য মৌলিক বিষয়ে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোটের বিধান প্রযোজ্য হবে। তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাও সংবিধানে পুনঃস্থাপনের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
ভবিষ্যতে যাতে এ ব্যবস্থাকে সহজে পরিবর্তন করা না যায়, সেজন্য জনগণের কাছে যাওয়ার অর্থাৎ গণভোটের বিধান রাখার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ থেকে গণভোটের বিধান বাদ দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে কমিটির প্রধান বলেন, ওই সংশোধনের বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টের রায় রয়েছে। তার মতে, আদালত যখন সংশ্লিষ্ট সংশোধনীকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে, তখন আগের সাংবিধানিক অবস্থানের বিষয়টি সামনে আসে। এ প্রসঙ্গে তিনি আইনের ‘ডকট্রিন অব এক্লিপস’-এর কথাও উল্লেখ করেন। তবে বিষয়টি চূড়ান্তভাবে সংবিধানে ধারণ করার জন্য সংশোধনী আনার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান তিনি। তার মতে, সংশোধনীর মাধ্যমে গণভোটের বিধান সংবিধানে পুনঃস্থাপন করা হলে তা কার্যকর সাংবিধানিক বিধান হিসাবে থাকবে।
সংবিধান সংশোধন দ্রুত করার দাবিতে ১১-দলীয় জোটের লংমার্চ কর্মসূচি প্রসঙ্গে সংবিধান সংশোধন কমিটির প্রধান বলেন, যারা লংমার্চ করছেন, তারা কেন করছেন, সেটি তাদের বিষয়। লংমার্চ, সভা-সমাবেশ ও বক্তব্য দেওয়া তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে সংবিধান সংশোধনের কাজ জাতীয় সংসদেই হবে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া শহীদ সাফওয়ান আক্তার সদ্যের বাবা কৃষিবিদ আক্তারুজ্জামান লিটন বলেন, জুলাই শহীদপরিবারের সদস্য এবং আহতদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের কথা বলেছি। জুলাই সনদ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত এবং পরে কেউ যাতে তা বাতিল করতে না পারে, সে বিষয়েও দাবি জানিয়েছি। তিনি বলেন, শহীদপরিবার ও আহতদের বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে। এসব বিষয়ে আইনি প্রতিকার চেয়েছি।
শহীদ মো. সজলের ভাই সেলিম মাহমুদ বলেন, জুলাই শহীদদের জাতীয় বীর হিসাবে স্বীকৃতি এবং আহতদের সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়ার দাবি জানিয়েছি। এই স্বীকৃতি যাতে ভবিষ্যতে কেউ বাতিল করতে না পারে, সেই বিধান রাখার কথাও বলেছি।
