‘ভূতুড়ে কণা’ নিউট্রিনো নিয়ে গবেষণায় পদার্থে নোবেল
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফ্রান্সিস হ্যালজেন
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গবেষণার জন্য গেলেন বরফ আচ্ছাদিত অ্যান্টার্কটিকায়। সেখানে গড়লেন বরফের ডিটেক্টর বা শনাক্তকারী, যা শনাক্ত করে রহস্যময় কণা নিউট্রিনোকে। বিজ্ঞানীরা এটাকে বলেন ‘ভূতুড়ে কণা’। কারণ, আমাদের চারপাশে এর ব্যাপক উপস্থিতি থাকলেও শণাক্ত করা কঠিন। এ নিউট্রিনো শনাক্ত করতে যিনি মাথার ঘাম পায়ে ফেলেছেন, এ বছর সেই পদার্থবিজ্ঞানীকে স্বীকৃতি দিয়েছে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস।
দক্ষিণ মেরুর বিশাল বরফের খণ্ডকে ডিটেক্টরে রূপান্তরকারী ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসনের অধ্যাপক বেলজিয়ামের পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হ্যালজেনকে ২০২৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। হ্যালজেন ওই ‘আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি’র গবেষণায় নেতৃত্ব দেন। ২০১৩ সালে চালু হওয়ার পরপরই কেন্দ্রটি প্রথমবারের মতো উচ্চশক্তির বহির্জাগতিক নিউট্রিনো শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন জানায়, এ মানমন্দির বা অবজারভেটরিটি গড়ে তোলার জন্য বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ ও প্রকৌশলীরা এক ঘনকিলোমিটার আয়তনের বরফের মধ্যে বাস্কেটবল-আকারের হাজার হাজার আলোক-সংবেদী ডিটেক্টর স্থাপন করেন। মহাকাশ থেকে আসা নিউট্রিনো যখন পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটায়, তখন যে ক্ষীণ আলোর ঝলকানি তৈরি হয়, তা শনাক্ত করাই ছিল এর উদ্দেশ্য।
মঙ্গলবার পুরস্কার ঘোষণার সময় নোবেল কমিটি জানায়, ‘আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি’তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানসংক্রান্ত উৎস থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো আবিষ্কারের জন্য হ্যালজেনকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। তিনি পুরস্কারের অর্থমূল্য বাবদ এক কোটি বিশ লাখ সুইডিশ ক্রাউন বা ১২ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি পাবেন (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৪ কোটি ৭৭ লাখ ৩০ হাজার টাকা)।
পুরস্কার জয়ের পর সংবাদ সম্মেলনে হ্যালজেন বলেন, ‘অনুভূতিটা বেশ অদ্ভুত। আশা করি, এ পুরস্কার সেসব সাহসী মানুষের প্রতিও সম্মান বয়ে আনবে যারা প্রকল্পের শুরুর দিকে আমার সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। তখন কোনো প্রতিষ্ঠিত বা রক্ষণশীল পদার্থবিজ্ঞানী আমার সঙ্গে কাজ করতে রাজি হননি। কিন্তু অনেক প্রতিভাবান মানুষ এগিয়ে এসেছিলেন।’
নিউট্রিনো হলো এক রহস্যময় কণা, যা সর্বত্র বিদ্যমান হলেও এদের শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। মানুষ থেকে শুরু করে গ্রহ-যে কোনো কিছুর মধ্য দিয়েই এরা অনায়াসে চলাচল করতে পারে। প্রতি সেকেন্ডে সূর্য থেকে আসা কোটি কোটি নিউট্রিনো আমাদের শরীরের ভেতর দিয়ে চলে যায়, অথচ আমরা তা টেরও পাই না। তবে মাঝেমধ্যে কোনো নিউট্রিনো কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। অত্যন্ত সংবেদনশীল ডিটেক্টর বা শনাক্তকারী যন্ত্রের সাহায্যে সেই ঘটনাটি ধরা সম্ভব।
হালজেন বুঝতে পেরেছিলেন যে, স্বচ্ছ হিমবাহের বরফের মধ্যে নিউট্রিনোর সংঘর্ষ থেকে সৃষ্ট আলোর ক্ষীণ ঝলক শনাক্ত করা সম্ভব। তাই ১৯৮৮ সালে তিনি দক্ষিণ মেরুর একটি অংশকে নিউট্রিনো মানমন্দিরে রূপান্তরের পরিকল্পনা পেশ করেন। এ ডিটেক্টরটি মহাজাগতিক রশ্মির কারণে সৃষ্ট ‘ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ’ বা অবাঞ্ছিত সংকেত থেকে সুরক্ষা পেতে পৃথিবীকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে। এছাড়া এতে নিচের দিকে মুখ করা আলোক-সংবেদী সেন্সর রয়েছে, যা উত্তর গোলার্ধ থেকে পৃথিবীর ভেতর দিয়ে আসা নিউট্রিনোগুলোকে শনাক্ত করতে পারে। গবেষক দলের জন্য পরিবেশটি প্রতিকূল হলেও স্থানটি এমন এক জায়গায় অবস্থিত, যা বিভিন্ন ধরনের হস্তক্ষেপ এবং ভূমিকম্পজনিত কম্পনের ঝুঁকি থেকে মুক্ত।
২০১৩ সালে প্রথমবারের মতো উচ্চশক্তির মহাজাগতিক নিউট্রিনো শনাক্ত করার পর আইসকিউব প্রকল্পের বিজ্ঞানীরা নিউট্রিনোর প্রথম মহাজাগতিক উৎসটি চিহ্নিত করেন, যা পৃথিবী থেকে ৩৭০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এ মানমন্দিরটি জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক নতুন ধারার সূচনা করেছে। এতদিন পর্যন্ত গবেষকরা আলো, অন্যান্য তড়িৎচৌম্বকীয় বিকিরণ এবং মহাকর্ষীয় তরঙ্গের মাধ্যমে মহাবিশ্ব সম্পর্কে তথ্য জানতেন। নিউট্রিনোকে মহাবিশ্বের ‘বার্তা বাহক’ হিসাবে বিবেচনা করা হয় এবং মহাবিশ্বের বিবর্তন কীভাবে ঘটেছে, সে সম্পর্কে এগুলো নতুন সব তথ্য ও ইঙ্গিত দেয়।
ইতালিতে ভ্রমণের সময় পুরস্কারের খবরটি পাওয়া হ্যালজেন জানান, তিনি একটি নতুন প্রস্তাবনা নিয়ে কাজ করছিলেন; আশা করছেন, এ পুরস্কারটি সেই প্রস্তাবনা অনুমোদনে সহায়তা করবে।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের ড. প্যাট্রিক ডান এ পুরস্কারকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সমগ্র মানব ইতিহাসে আমাদের সৌরজগতের বাইরের বিষয়গুলো বোঝার একমাত্র উপায় ছিল আলো। জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক উৎস থেকে নিউট্রিনো শনাক্ত করার বিষয়টি গবেষণার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে; তাই গ্যালিলিও যখন প্রথমবার টেলিস্কোপ দিয়ে আকাশের তারার দিকে তাকিয়েছিলেন, তার সঙ্গে এর তুলনা করাটা মোটেও অত্যুক্তি হবে না।’
তিনি বলেন, ‘নিউট্রিনো হলো ভরের অধিকারী কণাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান কণা। আলোর চেয়েও অনেক সহজে পদার্থের মধ্য দিয়ে এদের চলাচল করার ক্ষমতার কারণে দূরবর্তী কোনো ঘটনা কিংবা আইসকিউবের মতো চরম বা তীব্র কোনো ঘটনার অভ্যন্তরীণ অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য এগুলো অত্যন্ত উপযোগী।
নিউট্রিনো নিয়ে গবেষণার অন্যান্য উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডিপ আন্ডারগ্রাউন্ড নিউট্রিনো এক্সপেরিমেন্ট’ এবং জাপানের ‘হাইপার-কামিওকান্দে’ ডিটেক্টর।
সোমবার চিকিৎসায় পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে চলতি বছরের নোবেল মৌসুম শুরু হয়। আজ ঘোষণা করা হবে রসায়নে নোবেল। বৃহস্পতিবার আসবে সাহিত্যের নোবেল ঘোষণা। এরপর শুক্রবার শান্তি ও ১৩ অক্টোবর অর্থনীতিতে এবারের নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হবে। ১০ ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে স্টকহোমে এক অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেবেন সুইডেনের রাজা কার্ল ষোড়শ গুস্তাফ।
