সংসদীয় কমিটির বৈঠকের কার্যপত্র
দালালচক্রের ফাঁদ বিপদে প্রবাসীরা
Advertisement
শেখ মামুনুর রশীদ
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দালালদের প্রলোভনে ভুয়া কাগজপত্র নিয়ে বিদেশে গিয়ে বিপদে পড়ছেন বাংলাদেশিরা। কেউ যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে আটকা পড়ছেন, কেউ জড়িয়ে পড়ছেন অবৈধ অভিবাসনের জালে। আবার কেউ ভিসা জালিয়াতির শিকার হয়ে হারাচ্ছেন অর্থ ও নিরাপত্তা। এসব ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি, এমনকি দেশের পাসপোর্টের গ্রহণযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় ভিসা জালিয়াতি, দালালচক্র ও অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। একই সঙ্গে বিদেশে বাংলাদেশি মিশনের সেবার মান উন্নয়ন, প্রবাসীদের লাশ দ্রুত দেশে আনা, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান, নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকের কার্যপত্র থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি ব্যারিস্টার জহরত আদিব চৌধুরী। বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানান, প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় দিল্লিতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে অন্তর্বর্তী ও বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে ভারত সরকারকে দুই দফা আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ভারতে অবস্থানরত ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়েও সেখানকার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাতে গ্রেফতার সাবেক পুলিশপ্রধান বেনজীর আহমেদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি এবং কূটনৈতিক কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়া হয়েছে। এ সময় কমিটির সদস্যরা এ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়কে আরও তৎপর হওয়ার পরামর্শ দেন।
কার্যপত্রে দেখা যায়, সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশিদের ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাওয়ার বিষয়টি বৈঠকে তুলেন কমিটির সদস্য সাঈদ আল নোমান। তিনি জানতে চান, এভাবে ভিসা বাতিলের প্রকৃত কারণ কী এবং তা নিরসনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কী পদক্ষেপ নিয়েছে। অন্তত ১০টি ভিসা বাতিলের ঘটনা পরীক্ষা করে দেখার প্রস্তাব দেন তিনি। জালিয়াতি, ভুল তথ্য বা বড় ধরনের কোনো ত্রুটি ছিল কি না, তা শনাক্ত করা গেলে সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কার্যকর আলোচনা করা সহজ হবে বলে মত দেন তিনি।
জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘দালালদের প্রলোভনে পড়ে ভুয়া কাগজপত্র নিয়ে বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশিদের বিপদে পড়ার ঘটনা বাড়ছে। রাশিয়ায় বাংলাদেশিদের চুক্তিভিত্তিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া বা সেখানে আটকে পড়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। এসব ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এবং পাসপোর্টের গ্রহণযোগ্যতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।’ তিনি বলেন, ‘সংযুক্ত আরব আমিরাতে বর্তমানে বিজনেস ভিসা সহজ হয়েছে। তবে ভিসাসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা বা জটিলতা এড়াতে জালিয়াতি ও দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।’
বৈঠকে সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে বাংলাদেশিদের নিহত হওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘নিহতদের অর্ধেকের বেশি অবৈধভাবে অবস্থান করছিলেন এবং কয়েকজনের আকামার মেয়াদও উত্তীর্ণ ছিল। এ ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটছে।’
এ তথ্যের ভিত্তিতে কমিটি বিদেশে যাওয়ার আগে বাংলাদেশিদের যথাযথ কাগজপত্র, বৈধ ভিসা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইন সম্পর্কে সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দিতে বলে। একই সঙ্গে অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়া ঠেকাতে দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে। এছাড়া বিদেশে মারা যাওয়া বাংলাদেশিদের লাশ দেশে আনার প্রক্রিয়া নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়।
কমিটির সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী ওমানে চার প্রবাসীর লাশ দ্রুত দেশে আনার উদাহরণ তুলে ধরে ইতালি থেকে একটি লাশ দেশে আনতে প্রায় আড়াই মাস সময় লাগার কারণ খতিয়ে দেখতে বলেন। তিনি প্রবাসীদের লাশ দ্রুত ও সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরিয়ে আনতে একটি স্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন এবং কার্যক্রম দ্রুত করার প্রস্তাব দেন।
জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী অবৈধ অভিবাসন ও প্রবাসীদের সমস্যা মোকাবিলায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নতুন ‘মাইগ্রেশন উইং’ চালুর উদ্যোগের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘বিদেশে মারা যাওয়া ব্যক্তির লাশ দেশে আনার গতি অনেক সময় স্থানীয় আইন ও তদন্ত প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে। পরিচয় শনাক্তকরণের জন্য ডিএনএ পরীক্ষা কিংবা অন্য কোনো আইনি জটিলতা থাকলে সময় বেশি লাগে। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত লাশ দেশে আনার চেষ্টা করে।’
বৈঠকে বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোর সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেন হুম্মাম কাদের চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘অনেক মিশনের অবকাঠামো নাজুক অবস্থায় রয়েছে। এসব মিশনের জন্য বরাদ্দ করা অর্থ কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে, তা পর্যালোচনার পাশাপাশি দ্রুত সংস্কার ও মানোন্নয়ন প্রয়োজন।’
জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘দূতাবাস বা মিশন ভবন কেনার জন্য বাজেট থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে ভবন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যায় না। শুধু লন্ডন নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের মিশনগুলো একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি।’
বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক তৎপরতা আরও বাড়ানোর সুপারিশ করে কমিটি। জবাবে রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিকীকরণের লক্ষ্যে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক ফোরামে বিষয়টি আরও জোরালোভাবে উপস্থাপনের কথা জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলের পরিস্থিতি ও সীমান্তের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে আরাকান অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা চলছে। এছাড়া যুক্তরাজ্যসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানের দিকে নজর দিচ্ছে।’
দেশের কূটনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বৈশ্বিক অবস্থান বিবেচনায় কূটনৈতিক উপস্থিতি আরও বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়। জবাবে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বর্তমানে ৮৬টি মিশনের পাশাপাশি আরও ১৯টি নতুন দূতাবাস চালুর প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন। ঢাকায় নতুন কূটনৈতিক অবকাঠামো, গুলশানে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন, কূটনৈতিক স্থাপনা এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য ২০ তলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
