লটারির মাধ্যমে সাবরেজিস্ট্রার বদলি
যুগান্তরে প্রকাশিত রিপোর্টের প্রশংসা করলেন আইনমন্ত্রী
দুর্নীতি করলে কেউ রেহাই পাবে না, ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং করা হবে
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, কোনো সাবরেজিস্ট্রার দুর্নীতিতে জড়ালে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। লটারির মাধ্যমে যাদের ঢাকায় পোস্টিং দেওয়া হচ্ছে, দুর্নীতি করলে তারা একদিনও থাকতে পারবেন না। ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিটি অভিযোগের বিষয় আমলে নেওয়া হয়েছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে তথ্যপ্রমাণসহ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে তদন্ত করলেও ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না। ঢাকা জেলার সাবরেজিস্ট্রি অফিসগুলোয় লটারির মাধ্যমে সাবরেজিস্ট্রার পোস্টিং প্রদান সংক্রান্ত এক অনুষ্ঠানে মঙ্গলবার সচিবালয়ের দপ্তরে তিনি এসব কথা বলেন।
এ সময় আইনমন্ত্রী লটারির মাধ্যমে সাবরেজিস্ট্রার বদলির বিষয়ে ৬ অক্টোবর যুগান্তরে প্রকাশিত সংবাদের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘আজ (মঙ্গলবার) যুগান্তরে এ বিষয়ে একটি রিপোর্ট এসেছে। রিপোর্টটি ভালো হয়েছে। তবে সেখানে একটু সমালোচনাও করা হয়েছে। কিন্তু তা যথার্থ। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ঢাকার স্টেশনগুলোয় খুবই দক্ষ লোক দরকার। তবে লটারির মাধ্যমে যদি ওইরকম দক্ষ সাবরেজিস্ট্রার না আসে, তাহলে কিছুটা সমস্যা হবে। আমরাও বিষয়টির সঙ্গে একমত। এজন্য লটারির মাধ্যমে যারা ঢাকায় আসার সুযোগ পাবেন, তাদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে। এরপর যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে পদায়ন করা হবে।’
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান লটারি শুরু করার প্রাক্কালে বলেন, ‘রেজিস্ট্রেশন ডিপার্টমেন্ট নিয়ে জনমনে নেতিবাচক কিছু পারসেপশন রয়েছে। কিন্তু আমরা রাতারাতি সব পালটে ফেলতে পারব-এমন দাবি করি না। সম্ভবও না। তবে এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের কোনো-না-কোনো জায়গা থেকে শুরু করতেই হবে। সেই শুরুটা আজ ঢাকা জেলা দিয়ে হচ্ছে। ঢাকা শহরের সাবরেজিস্ট্রি অফিসগুলোকে প্রাইজ পোস্টিং স্টেশন বলা হয়। আমরা সেখানেই লটারির মাধ্যমে পদায়ন করতে যাচ্ছি। ঢাকার সব সাবরেজিস্ট্রি অফিস ‘এ’ ক্যাটাগরির।’
লটারিতে বাছাই করা সাবরেজিস্ট্রারদের ঢাকায় পদায়নের মেয়াদ সম্পর্কে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘সার্ভিস রুলস অনুযায়ী তারা দায়িত্ব পালন করবেন। সাধারণভাবে দুই বছর থাকার বিধান থাকলেও কেউ দায়িত্ব নেওয়ার পর দুর্নীতিতে জড়ালে তাকে রাখা হবে না।’ সাবরেজিস্ট্রারদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী জানান, তার মন্ত্রণালয় বিষয়গুলো ২৪ ঘণ্টা মনিটরিংয়ে রাখবে। গণমাধ্যমের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ থাকলে তা মন্ত্রণালয়কে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, সারা দেশে ‘এ’ ক্যাটাগরির সাবরেজিস্ট্রার পদ রয়েছে ১৩১টি। ঢাকার পোস্টগুলোও ‘এ’ ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত। লটারির মাধ্যমে ঢাকার জন্য ১৮ জন সাবরেজিস্ট্রারের পোস্টিং নির্ধারণ করা হয়েছে। তাদের সাক্ষাৎকার নিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে পদায়ন করা হবে।
সাবরেজিস্ট্রি অফিসকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনার বিষয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা ও উদ্যোগ থাকলেও সাবরেজিস্ট্রারের কাজ আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
সাবরেজিস্ট্রারের কাজ ভূমিসংক্রান্ত হওয়ায় এটি কবে নাগাদ ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়া হবে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘না, এটা আইনসংক্রান্ত। সাবরেজিস্ট্রারের কাজ আইনসংক্রান্ত। রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্টের মধ্যে দেখেন এবং এটা আইন মন্ত্রণালয়েরই অধীন।’ সাবরেজিস্ট্রারের আওতাধীন বিষয়গুলো নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনার প্রসঙ্গ উঠলে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘সেটা ক্লিয়ার করা হয়েছে। বিষয়টি ক্লিয়ার। এখানে কোনো ডিসপিউট নেই।’
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, পাবলিক পারসেপশনে যেসব জায়গাকে দুর্নীতির আখড়া মনে করা হয়, সেসব জায়গায় গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট ভাঙতেই সাবরেজিস্ট্রারদের লটারির মাধ্যমে বদলির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমি একটু বসে ইন্টারভিউ নিয়ে, দক্ষতার বেসিসে যে এলাকায় বেশি চাপ যারা সহ্য করতে পারবেন, তাদের আমরা সে এলাকায় দেব। কাজের লোড অনুসারে। আমাদের সব এলাকায় কাজের লোড একরকম না। ঢাকা শহরে যে যতটুকু লোড নিতে পারবেন, আমরা সে অনুসারে তাকে সে জায়গায় পোস্টিং করব।
লটারির মাধ্যমে বদলির এ প্রক্রিয়া ভবিষ্যতেও চলবে জানিয়ে আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আবারও বলছি, আমরা লটারি হিসাবে যখন দিচ্ছি, এটা আমাদের ঢাকা জেলা দিয়ে শুরু। এই প্রক্রিয়া চলমান থাকবে। পর্যায়ক্রমে সব জায়গায় এভাবে সমাধানের পথ বের করা হবে। সাবরেজিস্ট্রারদের প্রাইজ পোস্টিংয়ে বদলির উদ্দেশ্য সম্পর্কে আইনমন্ত্রী বলেন, বাই রোটেশনে ডিপার্টমেন্টের প্রাইজ পোস্টিংগুলোর যেখানে দুর্নীতির শিকড় গজায়, সেখানে আমরা এভাবে পোস্টিং দেব।’ তিনি বলেন, ‘যে জায়গাটা মনে করছি পাবলিক পারসেপশনে দুর্নীতির আখড়া, সেই জায়গায় সেই সিন্ডিকেট ভাঙার জন্য এই প্রক্রিয়া।’
এই উদ্যোগের ফলে দুর্নীতি কমবে কি না জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘অবশ্যই। আমরা আশা করি। আমরা আশাবাদী।’ তিনি বলেন, ‘মানুষের মানসিকতা পরিবর্তনের কাজ শুধু আইন মন্ত্রণালয়ের নয়, গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব রয়েছে।’ সংবাদ পরিবেশনের সময় কীভাবে বিষয়গুলো উপস্থাপন করা হচ্ছে, সেটিও মানুষের ধারণাকে প্রভাবিত করে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি জানান, দেশে বর্তমানে ৩৭২ জন সাবরেজিস্ট্রার কর্মরত। পদ খালি আছে ১৩৯টি। এগুলো পাইপলাইনে আছে নিয়োগ প্রক্রিয়ার। এ নিয়োগ প্রক্রিয়াগুলো পিএসসির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
একই সঙ্গে কিছু সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাবরেজিস্ট্রারদের কাছ থেকে টাকা ও মাসোহারা চাওয়ার অভিযোগ পাওয়ার কথাও জানান আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেলে সাংবাদিক কিংবা সাবরেজিস্ট্রার হোক, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ সময় তিনি এও বলেন, ‘সাবরেজিস্ট্রারদের বিষয়ে মিডিয়া যত দুর্নীতির রিপোর্ট করেছে, প্রত্যেকটির বিষয়ে আমরা এক্সপ্লানেশন কল করেছি, আমরা আমাদের মতো করে তদন্ত করেছি। তবে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণের অভাবে কোনো অভিযোগকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত বলা যাচ্ছে না।’ আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমি চেষ্টা করছি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া কাউকে যেমন হয়রানি করব না, কিন্তু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তাকে ছাড়ও দেওয়া হবে না।’ তিনি জানান, গত ছয় মাসে ১০ জন সাবরেজিস্টারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সৌভাগ্যবান সেই ১৮ জন
লটারিতে বাছাই হওয়া ১৮ জন সাবরেজিস্টার হলেন-মো. গোলাম মোর্তজা (রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ), অমায়িক বাবু (সদর, সাতক্ষীরা), ফরিদা আক্তার (চিতোষী, চাঁদপুর), অজয় কুমার সাহা (সদর, চুয়াডাঙ্গা), অমিত মঙ্গল চাকমা (সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম), মো. রাসেল মল্লিক (সদর, কুষ্টিয়া), গোবিন্দ সাহা (মনোহরদী, নরসিংদী), মো. মাসুম (নাজিরপুর, পিরোজপুর), এসএম আবু মুসা (নবীনগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া), নাজনিন জাহান (শ্যামনগর, সাতক্ষীরা), মোহাম্মদ হানিফ (দাউদকান্দি, কুমিল্লা), মনীষা রায় (পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও), সিং মং থোয়াই (গাছবাড়িয়া, চট্টগ্রাম), রাজিব মজুমদার (গোপালপুর, টাঙ্গাইল), আলী আজগর (সদর, মুন্সীগঞ্জ), শর্মিলা আহমেদ শম্পা (ঘিওর, মানিকগঞ্জ), আমিনা বেগম (সদর, যশোর) ও টিনু চাকমা (ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম)।
বেলা ১১টায় অনুষ্ঠিত আইন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এ লটারি অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা, অতিরিক্ত সচিব এসএম এরশাদুল আলম, মো. খাদেম উল কায়েস, নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক (আইজিআর) শামীমা আফরোজ, সাবরেজিস্ট্রার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ রমহান খান ও মহাসচিব মাইকেল মহিউদ্দীন আব্দুল্লাহ প্রমুখ।
