রাজউকের বরাদ্দ
অসামান্য অবদান ছাড়া পাওয়া প্লট বাতিল হচ্ছে
Advertisement
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজউকের ১৩-এ বিধিতে সরকারি চাকরি, জনসেবা ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসাবে বিশেষ বিবেচনায় প্লট বরাদ্দের সুযোগ ছিল। কিন্তু সেই যোগ্যতা পূরণ না করেই অনেকে এ বিধির আওতায় প্লট পেয়েছেন। এমন প্লটগুলো বাতিল করতে চায় সরকার। এ নিয়ে উচ্চ আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে রাজউক। নির্দেশনা পেলেই কাজ শুরু করবেন সংশ্লিষ্টরা।
এ সংক্রান্ত অনিয়ম তদন্ত কমিটির চেয়ারম্যান এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের (গ্রেড-১) সাবেক মহাপরিচালক মহ. মনিরুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, ‘১৩-এ ধারায় বিশেষ অবদান রাখার বিষয়ে প্লট বরাদ্দের সুযোগ ছিল। কিন্তু ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত এক হাজার ৪৬৬টি প্লটের তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। সেখানে অনেক অনিয়ম ও দুর্নীতি পাওয়া গেছে। এ নিয়ে ধাপে ধাপে কয়েকটি প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। সময় স্বল্পতার কারণে আরও অনেক প্লটের বিষয়ে কাজ করা যায়নি। এ বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা অসুরণ করে কাজ করবে রাজউক।’
এক প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই অতিরিক্ত সচিব বলেন, ‘সরকারের সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ-সদস্য, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, সরকারি কর্মকর্তারা আইন ভেঙে প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন। রাজউকের উত্তরা, পূর্বাচল ও ঝিলমিলসহ সব প্রকল্পে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে।’
রাজউক সূত্রে জানা যায়, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, সংসদ-সদস্য, শিল্পী (বিশেষ অবদান), মুক্তিযোদ্ধা ছাড়া অন্যদের প্লট বাতিল হবে। তবে সেসব প্লটের বেশির ভাগ বুঝে নিতে পারবে না রাজউক। কারণ ৯৫ শতাংশই ইতোমধ্যে মালিকানা হস্তান্তর করেছে। এছাড়া যাদের নিবন্ধন হয়েছে এবং প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, তারা চাইলে এখনো বিক্রি করে দিত পারেন। অন্যদিকে যাদের নিবন্ধন প্রক্রিয়া বাকি রয়েছে, তাদেরটা রাজউক বুঝে নিতে পারবে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, রাজউকের বিশেষ বিবেচনায় প্লট বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ যাচাইয়ে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক মহ. মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে আরও ছিলেন প্রকৌশলী আলমগীর হাসিন ও রাজউকের সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ)। কমিটি পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের ৯৪৪টি, ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্পের ২৬০টি এবং উত্তরা আদর্শ শহর প্রকল্পের ২২১টিসহ মোট এক হাজার ৪২৫টি প্লটের বরাদ্দ পর্যালোচনা করেছে।
তথ্যানুসন্ধানে আরও জানা যায়, টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট, ১৯৫৩-এর ১০২ ধারার ক্ষমতাবলে প্রণীত ১৯৬৯ সালের ভূমি বরাদ্দ বিধিমালার আওতায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্লট বরাদ্দ কার্যক্রম পরিচালিত হতো। ১৯৮৬ সালে বিধিমালায় ১৩-এ বিধি যুক্ত করে সরকারি চাকরি, জনসেবা ও সরকার নির্ধারিত জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য বিশেষ বিবেচনায় প্লট বরাদ্দের সুযোগ রাখা হয়। এটি ‘অসামান্য অবদান’ বা ‘সংরক্ষিত কোটা’ হিসাবে পরিচিত। মূল বিধান অনুযায়ী, বরাদ্দপ্রত্যাশীর আবেদন ও সরকারের সুপারিশ প্রয়োজন ছিল এবং বরাদ্দের ক্ষেত্রে বিধিমালার ৯ নম্বর বিধির শর্ত প্রযোজ্য ছিল। ২০০৯ সালে ১৩-এ বিধি সংশোধন করে মন্ত্রী, সংসদ-সদস্য, বিচারপতি, সরকারি চাকরিজীবী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশা ও শ্রেণির ব্যক্তির আবেদন করার সুযোগ উল্লেখ করা হয়। সরকারের অনুমোদনের পর রাজউকের বোর্ড সভায় বরাদ্দ চূড়ান্ত করা হতো। তবে অসামান্য অবদানের পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে প্লট বরাদ্দ দেওয়ায় ব্যবস্থাটি সমালোচিত হয়।
এদিকে ২৮ এপ্রিল ২০২৪ ‘রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (ভূমি, প্লট, স্পেস ও ফ্ল্যাট বরাদ্দ) বিধিমালা, ২০২৪’ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। এর ২৮(১) বিধির মাধ্যমে ১৯৬৯ সালের বিধিমালা রহিত হয়। এর সঙ্গে পুরোনো ১৩-এ বিধিও রহিত হয়। তবে নতুন বিধিমালার ৭ নম্বর বিধিতে বিভিন্ন পদ ও পেশার ব্যক্তিদের জন্য আবাসিক প্লটের কোটা সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। পরে ২০ নভেম্বর ২০২৪ তারিখের বিধিবদ্ধ নিয়ন্ত্রণমূলক আদেশ (এসআরও) নম্বর ৩৯৯-আইন/২০২৪-এর মাধ্যমে নতুন বিধিমালা সংশোধন করা হয়। সংশোধনীটি ২৮ নভেম্বর বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত হয়। এতে ৭ নম্বর বিধি প্রতিস্থাপন করে পদ ও পেশাভিত্তিক কোটা সংরক্ষণের পরিবর্তে ক্ষতিগ্রস্ত ও মূল অধিবাসীদের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক আবাসিক প্লট সংরক্ষণের বিধান রাখা হয়। তবে বিধিমালা রহিত হওয়ায় আগের সব বরাদ্দ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়নি। ২০২৪ সালের বিধিমালার ২৮(২) বিধিতে আগের বিধিমালার অধীনে সম্পন্ন কাজ, গৃহীত ব্যবস্থা, জারি করা আদেশ ও নোটিশ নতুন বিধিমালার অধীনে সম্পন্ন হয়েছে বলে গণ্য করার বিধান রয়েছে। অনিষ্পন্ন কার্যধারাও যতদূর সম্ভব নতুন বিধিমালার অধীনে নিষ্পত্তির কথা বলা হয়েছে।

