প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তিন অনুপ্রেরণাদায়ীর সাক্ষাৎ
দেশে আপনাদের মতো মানুষের অনেক প্রয়োজন
Advertisement
বাসস
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সচিবালয়ে বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে নিজ কর্ম ও উদ্যোগে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী তিন ব্যক্তি-আলতাফ হোসেন, নায়লা শারাফ ও রেজাউল কিবরিয়া বাবুল -পিএমও
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘সমাজ ও দেশের কল্যাণে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কাজ করা মানুষের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের উদ্যোগ অন্যদেরও ভালো কাজে এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করবে।’ বুধবার সচিবালয়ে নিজ কর্ম ও উদ্যোগের মাধ্যমে সমাজে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করা তিন অনুপ্রেরণাদায়ী ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তিনি এসব কথা বলেন।
তিন অনুপ্রেরণাদায়ীর মধ্যে ছিলেন বুয়েট থেকে পাশ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা বেছে নেওয়া নায়লা শারাফ, দুই হাত না থাকা সত্ত্বেও বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা মো. আলতাফ হোসেন এবং নিজ উদ্যোগে হাজার হাজার গাছ লাগানো রেজাউল কিবরিয়া বাবুল। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু এ কথা জানান।
উপ-প্রেস সচিব জানান, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন অনুপ্রেরণাদায়ী ব্যক্তিরা। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তাদের জীবনসংগ্রাম, ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ও সমাজের কল্যাণে পরিচালিত কার্যক্রমের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। তারেক রহমান এসব ব্যক্তির কাজের প্রশংসার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সহযোগিতারও আশ্বাস দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশ গঠনে আপনাদের মতো মানুষের অনেক প্রয়োজন। আপনাদের মতো সবাই এগিয়ে এলে দেশ গঠন সহজ হবে।’
হাসান শিপলু জানান, সাক্ষাৎকালে নায়লা শারাফের ব্যতিক্রমী পেশা নির্বাচনের বিষয়টি উঠে আসে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে পড়ালেখা শেষ করে তিনি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) সহকারী প্রকৌশলী হিসাবে যোগ দেন। পরে জনতা ব্যাংকেও কর্মকর্তা হিসাবে কাজ করেন। ৩৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়েও তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ না দিয়ে শিশুদের শিক্ষাদানের পথ বেছে নেন। সাত বছর ধরে নেত্রকোনার পাঁচআননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন নায়লা। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাঠদান সহজ করতে নিজেই তৈরি করেন শিক্ষা উপকরণ ও ডিজিটাল কনটেন্ট।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা আরেক অনুপ্রেরণাদায়ী ব্যক্তি হলেন নরসিংদীর মো. আলতাফ হোসেন। জন্ম থেকেই তার দুই হাত নেই। তবে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। পা দিয়ে লেখা শিখে তিনি ২০০৭ সালে নরসিংদীর পাঁচদোনায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘প্রতিভা দুঃখু মিয়া কিন্ডারগার্টেন স্কুল’। নিজের সঞ্চয় ও পৈতৃক জমি বিক্রির অর্থ দিয়ে গড়ে তোলা বিদ্যালয়ে বর্তমানে ১৪৫ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। শিক্ষক রয়েছেন ১০ জন। পা দিয়েই তিনি লেখালেখি ও বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেন। প্রধানমন্ত্রী তার কথা শুনে নতুন স্কুলভবন নির্মাণ করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন বলেও জানান উপ-প্রেস সচিব।
অন্যদিকে ভোলার চরফ্যাশনের রেজাউল কিবরিয়া বাবুল দীর্ঘদিন ধরে নিজ উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ করে এলাকায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ইমামতির পাশাপাশি প্রায় তিন দশক তিনি নিজের অর্থ ও শ্রম দিয়ে বিভিন্ন সড়কের পাশে হাজার হাজার গাছ লাগিয়েছেন। পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে নার্সারি গড়ে তোলার পর তিনি উৎপাদিত চারা বিভিন্ন এলাকায় রোপণ শুরু করেন। তার লাগানো অধিকাংশ গাছই এখন পথচারীদের ছায়া দিচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী সবার উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে উৎসাহ দেন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
মানুষ গড়াই জীবনের বড় অর্জন
প্রচলিত অর্থে ভালো বেতন, পদমর্যাদা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠার সুযোগ ছিল তার সামনে। কিন্তু এসবের কোনোটিই তাকে ধরে রাখতে পারেনি। নায়লা শারাফ বেছে নিয়েছেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা। গত সাত বছর ধরে নেত্রকোনা সদর উপজেলার পঞ্চাননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসাবে কাজ করছেন তিনি। প্রান্তিক পরিবারের শিশুদের পড়ানো ও তাদের মানুষ হিসাবে গড়ে তোলাকেই জীবনের বড় অর্জন মনে করেন বুয়েটের এই সাবেক শিক্ষার্থী। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাঠদান সহজ করতে নিজেই তৈরি করেন শিক্ষা উপকরণ ও ডিজিটাল কনটেন্ট।
নায়লার শিক্ষাজীবনের শুরু ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে। এরপর বুয়েট থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পড়াশোনা শেষে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) সহকারী প্রকৌশলী হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন। তবে কাজের পরিবেশ ও কিছু অনিয়মের সঙ্গে আপস করতে না পেরে অল্প সময়ের মধ্যেই চাকরি ছেড়ে দেন। এরপর যোগ দেন জনতা ব্যাংকে এক্সিকিউটিভ অফিসার পদে। কিন্তু ব্যাংকের চাকরির যান্ত্রিকতাও তাকে টানেনি। পরে ৩৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হলেও সেই চাকরিতে যোগ দেননি। নায়লা শারাফের এমন ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত ও সুন্দর কাজের জন্য মানুষের ভালোবাসার পাশাপাশি এবার ধন্যবাদ পেলেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে থেকেও। দেশ গঠনে যেন তাদের মতো মানুষের অনেক প্রয়োজন সেই কথাও উল্লেখ করেন সরকারপ্রধান।
পা দিয়েই ছড়াচ্ছেন শিক্ষার আলো
১৯৬২ সালে নরসিংদী সদর উপজেলার নগর পাঁচদোনা এলাকায় জন্ম আলতাফ হোসেনের। জন্ম থেকেই দুই হাত নেই। তাই দাদা আদর ও আক্ষেপ মিশিয়ে নাম রেখেছিলেন দুঃখু মিয়া। যেন নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দুঃখ তার জীবনের অংশ। কারণ হাত না থাকায় ছোটবেলা থেকেই নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। পদে পদে পেরোতে হয়েছে নানা বাধা। কিন্তু জীবনযুদ্ধে হার মানেননি আলতাফ। যিনি এলাকায় দুঃখু মিয়া নামে পরিচিত। অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর মনোবলের কারণে শত প্রতিবন্ধকতা তার চলার পথ থামিয়ে দিতে পারেনি।
আলতাফ পা দিয়ে লিখেই শেষ করেছেন পড়াশোনা। চাকরির জন্য ঘুরেছেন বিভিন্ন দপ্তরে। চাকরি মেলেনি। পরে পা দিয়ে লেখার দক্ষতা অর্জন করে ২০০৭ সালে নরসিংদীর পাঁচদোনায় প্রতিষ্ঠা করেন প্রতিভা দুঃখু মিয়া কিন্ডারগার্টেন স্কুল। নিজের সঞ্চয় ও পৈতৃক জমি বিক্রির অর্থে গড়ে তোলা বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ১৪৫ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। শিক্ষক রয়েছেন ১০ জন। পা দিয়ে লেখালেখি করার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন কার্যক্রমও পরিচালনা করেন আলতাফ। তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও মহতী কাজের প্রসংশা এখন দেশব্যাপী। বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সচিবালয়ে তার কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করেন আলতাফের সঙ্গে। তার এই জীবনসংগ্রাম ও উদ্যোগের কথা শুনে বিদ্যালয়টির জন্য নতুন ভবন নির্মাণের আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী।
সড়কের পাশে গড়েন সবুজের আবরণ
স্থানীয়দের কাছে রেজাউল কিবরিয়া বাবুল ইমাম হিসাবেই পরিচিত। ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ওমরপুর ইউনিয়নের কালাপানিয়া বাজার বাইতুল মামুর জামে মসজিদে তিনি ইমামতি করেন। তবে বৃক্ষপ্রেমী হিসাবেও তার রয়েছে আলাদা পরিচিতি। ইমামতির পাশাপাশি অবসর সময়ে ব্যস্ত থাকেন গাছ লাগানো ও পরিচর্যা নিয়ে। প্রায় তিন দশক ধরে নিজের অর্থ ও শ্রম দিয়ে বিভিন্ন সড়কের পাশে হাজার হাজার গাছ লাগিয়েছেন। পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে নার্সারি গড়ে তোলেন তিনি। সেখান থেকে উৎপাদিত চারা বিভিন্ন এলাকায় রোপণ শুরু করেন। তার লাগানো অনেক গাছ এখন বড় হয়ে পথচারীদের ছায়া দিচ্ছে। ইমামতির পাশাপাশি এই কাজ করছেন প্রায় ৩০ বছর ধরে। নিজের অর্থ ও উদ্যোগে বিভিন্ন সড়কের পাশে হাজার হাজার গাছের চারা রোপণ ও পরিচর্যা করে গড়ে তুলেছেন সবুজের আবরণ। তার লাগানো সারি সারি তালগাছে বদলে গেছে গ্রামের একটি সড়কের চিত্র।
১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ভূঁঁইয়ারহাট এলাকায় একটি নার্সারি গড়ে তোলেন। সেখান থেকে উৎপাদিত ও সংগ্রহ করা বিভিন্ন জাতের গাছের চারা এলাকার সড়কের পাশে রোপণ করতে শুরু করেন। একই সঙ্গে মাইকিং করে স্থানীয়দের গাছ লাগাতে উৎসাহিত করতেন। বুধবার প্রধানমন্ত্রী তিনিসহ আরও দুইজনকে ডেকে তিনজনের উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, সমাজ ও দেশের কল্যাণে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কাজ করা মানুষের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের উদ্যোগ অন্যদেরও ভালো কাজে এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করবে।
