যুদ্ধে হুমকিতে সৌদি আরবের শ্রমবাজার
রেমিট্যান্স যোদ্ধারা বিপাকে
Advertisement
হক ফারুক আহমেদ ও সাইফ আহমাদ
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশের রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের প্রধান গন্তব্য সৌদি আরব। সম্প্রতি সেখানে ইয়েমেনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে এক অর্থে কোনো ফ্লাইট রিয়াদে যাচ্ছে না। সময়মতো কাজে ফিরতে না পেরে সৌদি প্রবাসীদের মধ্যে প্রতিদিন বাড়ছে হতাশা। যথাসময়ে ফিরতে না পারলে চাকরি থাকবে কিনা তা নিয়েও সংশয়ে আছেন তারা। যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে ফ্লাইট বাতিলের এই ধারাবাহিক অবস্থা চলতে থাকবে বলে জানানো হয়েছে বেবিচকের পক্ষ থেকে। এই অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে এবং সৌদি প্রবাসীরা তারিখমতো কাজে না ফিরতে পারলে দেশের রেমিট্যান্স, অর্থনীতি, জ্বালানিসহ আরও নানা খাতে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। বিদেশে বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার সৌদি আরব সংকুচিত হয়ে পড়লে বেকারত্ব বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, সৌদি আরবে সাম্প্রতিক সময়ে হামলার ঘটনায় দেশটিতে আমাদের শ্রমিকদের যেতে সাময়িক সমস্যা হচ্ছে। নিরাপত্তাজনিত কারণেই ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে। সৌদি আরবের শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সার্বিক বিষয়গুলোর খোঁজখবর নিচ্ছি। আমরা চাই প্রতিটি প্রবাসী নিরাপদে সেখানে ফিরুক। সব সমস্যা সমাধানে সরকার সচেষ্ট।
নোয়াখালী থেকে ঢাকায় এসেছিলেন সৌদি আরবের রিয়াদ প্রবাসী শামীম হোসেন। দেশে ছুটি কাটিয়ে রোববার দুপুরে তার ফেরার কথা ছিল। আগেই বিমানের টিকিট কেটে যাত্রার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে জানতে পারেন, তার ফ্লাইট বাতিল। এখন কবে কর্মস্থলে ফিরতে পারবেন, তা তিনি জানেন না। ঠিক সময়ে কাজে যোগ দিতে না পারলে চাকরি নিয়ে সমস্যায় পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে তার। রোববার দুপুরে বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনালের বাইরে দাঁড়িয়ে শামীম বলেন, ‘রিয়াদে যাওয়ার জন্য বিমানের টিকিট কেটে আগস্টে দেশে এসেছিলাম। দেশের বাড়ি নোয়াখালী থেকে ঢাকায় এসে ফ্লাইট ধরার প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। এখন হঠাৎ ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বিপাকে পড়েছি। কবে যেতে পারব, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছি। সৌদি আরবে আমার কাজ আছে। তারিখমতো ফিরতে না পারলে সমস্যায় পড়তে হবে। ফ্লাইটের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত জানানো হলে আমাদের ভোগান্তি কিছুটা কমত।
শামীমের মতো হাজার হাজার প্রবাসীর যাত্রা আটকে গেছে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতিতে। শনিবার রাত থেকে গতকাল বুধবার পর্যন্ত ঢাকা থেকে রিয়াদগামী বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কর্মস্থলে ফেরার অপেক্ষায় থাকা প্রবাসীরা। কেউ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় এসে বিমানবন্দরে আটকে গেছেন, কেউ বিকল্প পথে সৌদি আরবে যাওয়ার চেষ্টা করেও নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না। এর মধ্যে বিকল্প রুটের টিকিটের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে আর্থিক চাপেও পড়েছেন যাত্রীরা।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তথ্যানুযায়ী, সৌদি আরবে হুথি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক আক্রমণে একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হওয়া অব্যাহত রয়েছে। বুধবার বিকাল পর্যন্ত গত ৪ দিনে ১০০টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। আর আটকা পড়েছেন ১৫ হাজারের বেশি যাত্রী। বেবিচকের মুখপাত্র কাওছার মাহমুদ যুগান্তরকে বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে ফ্লাইট বাতিলের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। বুধবার সরেজমিন বিমানবন্দরে দেখা যায়, রিয়াদগামী যাত্রীরা হাতে টিকিট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে এয়ারলাইন্সের কাউন্টারে খোঁজখবর নিচ্ছেন। কেউ ফোনে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলছেন, কেউ আবার বিকল্প ফ্লাইটের সন্ধান করছেন। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা অন্য পরিবহণে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় আসার পর ফ্লাইট বাতিলের খবর পেয়ে অনেকেই দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
বিকল্প পথেও অনিশ্চয়তা : সরাসরি ফ্লাইট বন্ধ থাকায় বিকল্প পথে সৌদি আরবে যাওয়ার চেষ্টা করছেন চাঁদপুরের সামিউল হাসান। তবে কাতার এয়ারওয়েজের টিকিটের অস্বাভাবিক দাম দেখে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি। তার আশঙ্কা, শেষ পর্যন্ত যেতে হলে ধারদেনা করেই টিকিট কিনতে হবে। সামিউল হাসান বলেন, সরাসরি ফ্লাইট বন্ধ, তাই ভাবছিলাম কাতার হয়ে সৌদি আরবে যাব। কিন্তু কাতার এয়ারওয়েজের টিকিটের যে দাম দেখছি, এত টাকা তো আমার কাছে নেই। যেতে হলে ধারদেনা করেই যেতে হবে। কিন্তু পরে সেই টাকা কীভাবে শোধ করব, সেটাই বুঝতে পারছি না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সৌদি আরবে কর্মস্থলে ফেরার ক্ষেত্রে ভিসার মেয়াদ, নিয়োগকর্তার নির্ধারিত যোগদানের সময় এবং অন্যান্য প্রশাসনিক শর্তের বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে অনেক প্রবাসী পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষা না করে বিকল্প রুটে টিকিট কাটছেন। কিন্তু ঢাকা-মদিনা ও ঢাকা-জেদ্দা রুটসহ বিভিন্ন বিকল্প গন্তব্যের টিকিটের দাম দ্রুত বাড়ছে। যাদের নির্ধারিত সময়ে সৌদি আরবে পৌঁছানো জরুরি, তাদের বাড়তি অর্থ ব্যয় করেও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হচ্ছে।
বাতিল একাধিক এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট : ঢাকা থেকে রিয়াদগামী বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে ৪১টি। বিমানের ফ্লাইট ১৭টি, ইউএস বাংলার ১০টি, সৌদিয়ার ৭টি এবং রিয়াদ এয়ারের ৭টি। এছাড়া ট্রানজিট ফ্লাইট বাতিল হয়েছে ৫৯টি। এর মধ্যে ইন্ডিগোর ২২টি, সালাম এয়ারের ৭টি, ইজিপ্ট এয়ারের ১টি, এমিরেটস এয়ারের ১৪টি, কাতার এয়ারওয়েজের ৭টি এবং ফ্লাই দুবাইয়ের ৬টি, এয়ার এন্ডিয়া ২টি।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ বলেন, সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যাত্রীদের নিজ নিজ এয়ারলাইন্সের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরবর্তী যাত্রার বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে বিমানবন্দরে আসার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
এদিকে যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আশঙ্কা এড়াতে বিকল্প হিসাবে সৌদি আরবের দাম্মাম ও মদিনাগামী ফ্লাইটে যাত্রীদের পাঠানোর চেষ্টা করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। আসন খালি থাকা সাপেক্ষে বিনা খরচে অন্য ফ্লাইটে যাত্রীদের সমন্বয় করা হবে। সোমবার বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাদের বিকল্প ফ্লাইটে পাঠানোর চেষ্টা চলছে।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, দেশে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে সৌদি আরব থেকে। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তা রেমিট্যান্স প্রবাহেও সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। যারা সৌদি যেতে পারছেন না, যারা দেশে এসে আটকা পড়েছেন এবং সৌদিতে যেসব বাংলাদেশি কাজ করছেন তারা সবাই এখন সমস্যায় পড়েছেন। সমস্যা সমাধানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে একযোগে সমস্যার সমাধানে কাজ করতে হবে।
এদিকে গত মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ বিন জাফর আবিয়াহ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এ সময় সৌদি আরবে সাম্প্রতিক হামলায় নিহত দুই বাংলাদেশির লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে সৌদি আরবের সহায়তা চান শামা ওবায়েদ। প্রতিমন্ত্রী ওই হামলায় আহত বাংলাদেশিদের সৌদি কর্তৃপক্ষের দেওয়া চিকিৎসা ও সেবার জন্যও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি উত্তেজনা প্রশমনের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, উত্তেজনা নিরসন এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে সংলাপ ও কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, মনে হচ্ছে না যে এই যুদ্ধ একটা লম্বা সময়ের জন্য চলবে। কারণ এ রকম একটা সংকট চলতে থাকলে তা কাউকেই লাভবান করবে না। সৌদি আরব হয়তো নিজেরাই চেষ্টা করবে যাতে যত দ্রুত সম্ভব এ সমস্যার সমাধান করা যায়। তিনি আরও বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের উচিত হবে মন্ত্রী পর্যায়ের এক বা একাধিকজনকে স্পেশাল এনভয় হিসাবে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো। কাউকে সৌদি আরব, কাউকে আরব আমিরাতে, কাউকে কুয়েতে পাঠানো। তাতে সত্যিকারের অবস্থা বা কোথায় বাস্তবতা কী তা বোঝা যাবে।
প্রসঙ্গত, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৌদি আরবে গেছেন ৬ লাখের বেশি বাংলাদেশি। বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, এই সময়ে দেশটি থেকে ৫৮৫ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আগের বছরের তুলনায় এটি ৩৭ শতাংশ বেশি।
