আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সভা
বড় ঋণের সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ টানার চেষ্টা
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশের অর্থনীতিতে গতি বাড়াতে দাতা সংস্থাগুলোর বড় ঋণ সহায়তার পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ টানার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কাছে আরও বেশি বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে।
বুধবার ব্যাংককে চলমান আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সাধারণ সভার সাইড লাইনে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ এবং চীনের এক্সিম ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে এ আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে আইএমএফ থেকে সাড়ে চার বিলিয়ন ডলারের ঋণ নিয়ে দরকষাকষি করেছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংক থেকেও ঋণ পাওয়ার চেষ্টা চলছে। এর পক্ষে দাতা সংস্থাগুলোকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল যুক্তি তুলে ধরে জানিয়েছে, বাংলাদেশ বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও চড়া দামের মাশুল গুনতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের সংস্কারের পরিকল্পনা জানানো হয়েছে। তবে ঋণ সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি।
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে চলমান বিশ্বব্যাংক আইএমএফ-এর বার্ষিক সভায় বৈশ্বিক ঋণ, জ্বালানি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং ডিজিটাল আর্থিক সেবার নিরাপত্তা গুরুত্ব পেয়েছে। এছাড়া বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার ওপর জোর দিয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চলমান প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন দ্রুত করা এবং অর্থ ছাড়ের গতি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গতকাল সম্মেলনের তৃতীয় দিনে বিভিন্ন ইভেন্ট ও সাইড ইভেন্টে যোগদানের পর পৃথক পৃথক ব্রিফিং করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বিগত দিনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেমন কিছু পাইনি। আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনেক বিমান কিনছি, তেল, সয়াবিনসহ বিভিন্ন পণ্য ও কমোডিটি আমদানি করছি। তাদের কাছ থেকে বাড়তি সহায়তা আসা উচিত। তারা এ বিষয়ে একমত হয়েছে। এখন দেখা যাক। তিনি বলেন, সরকারের অর্থনৈতিক নীতিতে ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ও যৌথ বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গেও দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের অর্থনৈতিক নীতির মূল জোর হচ্ছে বিনিয়োগ। আমরা সরাসরি বিনিয়োগ ও যৌথ বিনিয়োগের দিকে বেশি যেতে চাই।’
যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানির বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, এয়ারক্র্যাফট, তেল, সয়াবিনসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানির কারণে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের পাশাপাশি বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যেও এর প্রভাব পড়ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের জোর দিয়ে বলেছি, বাংলাদেশ যখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এত বেশি আমদানি করছে এবং দুই দেশের সম্পর্ক যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে, এখন যদি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই সমর্থন না আসে, তাহলে আর কবে আসবে? আমরা যে সহায়তাগুলো আশা করছি, সেগুলো এখন আসা উচিত।’ বাংলাদেশের এ অবস্থানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো একমত হয়েছে। তবে প্রত্যাশিত সহায়তা বাস্তবে কতটা এবং কীভাবে পাওয়া যায়, তা দেখার বিষয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক প্রসঙ্গে এদিন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত চরিত্র এবং সাম্প্রতিক বহিঃস্থ ধাক্কার বিষয়টি উঠে এসেছে। তিনি বলেন, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের নিজস্ব কৌশল রয়েছে এবং তা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের বিষয়ে অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। অর্থায়ন নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে দরকষাকষি অব্যাহত থাকবে। উপদেষ্টা বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমরা কীভাবে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাজ করছি, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা তৈরি হয়েছে। তারা আমাদের কৌশলকে বাস্তবসম্মত মনে করছেন এবং অর্থায়নের বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছেন।’ তিনি আশা প্রকাশ করেন, চলমান আলোচনা ও দরকষাকষির মাধ্যমে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের বিষয়ে অগ্রগতি হবে। এতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, সংস্কার বাস্তবায়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
ড. তিতুমীর বলেন, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনায় তিনটি বিষয়ে স্পষ্ট ঐকমত্য পাওয়া গেছে। প্রথমত, বর্তমান সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে এবং সেই পরিস্থিতি আড়াল না করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে তা পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিয়েছে। দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে নতুন চাপ তৈরি হলেও তা মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া কৌশলের প্রতি অংশীদারদের আস্থা রয়েছে। তৃতীয়ত, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, ব্যাংক খাত সংস্কার এবং দারিদ্র্য কমাতে সরকারের নির্ধারিত কর্মসূচিগুলোকে তারা বাস্তবসম্মত বলে মনে করছেন।
‘আমরা সমস্যাগুলো কার্পেটের নিচে না রেখে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে মোকাবিলা করছি। আমাদের নিজস্ব কৌশল রয়েছে এবং সেই কৌশলের প্রতি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা তৈরি হয়েছে,’ বলেন উপদেষ্টা। তিনি জানান, সরকারের সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের বিষয়ে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, চীনের এক্সিম ব্যাংক এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে দরকষাকষির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের বিষয়ে অগ্রগতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ফ্যামিলি কার্ড ও ফারমার্স কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রশংসা পেয়েছে।
এদিকে চলমান বার্ষিক সভার তৃতীয় দিনে গতকাল নয়টি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক বিষয়ে বিভিন্ন সেমিনার ও ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইস্যুতে পাঁচটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। বৈশ্বিক ঋণের বোঝা ও ঋণ পরিশোধের ব্যয় নিয়েও উদ্বেগ উঠে এসেছে। আইএমএফের আলোচনায় উচ্চ সুদ, সরকারি ঋণ বৃদ্ধি এবং বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় বেড়ে গেলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো খাতে অর্থের জোগান সীমিত হতে পারে।
বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ : বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় বেসরকারি পুঁজি কাজে লাগিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। নতুন শিল্পকারখানা, উৎপাদন সম্প্রসারণ ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন।
ডিজিটাল লেনদেনে প্রতারণা ঠেকাতে ‘ব্যাংকক ব্লুপ্রিন্ট’ : গতকাল বার্ষিক সভার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল ‘ব্যাংকক ব্লুপ্রিন্ট ফর ফ্রড-রেজিলিয়েন্ট ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস’। এর লক্ষ্য প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক প্রতারণা মোকাবিলায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো। বাংলাদেশে মোবাইল আর্থিক সেবা, অনলাইন ব্যাংকিং ও ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে পরিচয় জালিয়াতি, প্রতারণামূলক লেনদেন ও সাইবার হামলার ঝুঁকিও বাড়ছে। এসব ঝুঁকি কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে দ্রুত তথ্য বিনিময় এবং প্রতারণা শনাক্তের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

