এইচআরএসএসের প্রতিবেদন
৯ মাসে নির্যাতন-হয়রানি ৫১৮ সাংবাদিককে
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে সারা দেশে ২৮৮টি ঘটনায় ৫১৮ সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনায় ২৯৭ জন আহত, ৮৭ জন লাঞ্ছিত এবং ৭৭ জন হুমকির মুখে পড়েছেন। আটক হয়েছেন ২০ সাংবাদিক। সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬-এর অধীনে ৫১ সাংবাদিককে আসামি করে ১৯টি মামলা করা হয়েছে।
সোমবার মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের ১৬টি জাতীয় দৈনিকের সংবাদ, সংগঠনটির নিজস্ব তথ্য সংগ্রহ এবং তথ্য অনুসন্ধানের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৭৩ : প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত নয় মাসে সারা দেশে ১ হাজার ১৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৭৩ জন নিহত এবং ৬ হাজার ৪৭৩ জন আহত হয়েছেন। এসব ঘটনার ৯১ শতাংশই বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং দলটির সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সংঘর্ষকেন্দ্রিক। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ৩৪২টি ঘটনায় ৪০ জন নিহত ও ২ হাজার ৬৩২ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষের ৩২১টি ঘটনায় ১১ জন নিহত ও ২ হাজার ১৯০ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষের ৯৩টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৯ জন এবং আহত হয়েছেন ৫৪৫ জন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির ৪৬, জামায়াতের ৮ ও আওয়ামী লীগের ৬ জন রয়েছেন।
মব সহিংসতায় নিহত ১৮৭ : এ সময়ে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাগবিতণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননা, ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টাসহ বিভিন্ন অভিযোগে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ৩৯৮টি ঘটনা ঘটেছে। এতে ১৮৭ জন নিহত এবং ৪০১ জন আহত হয়েছেন। নির্বাচনকেন্দ্রিক ৪০২ সহিংসতায় ১৩ জন নিহত ও ২ হাজার ৬২৩ জন আহত হয়েছেন। এ সময়ে নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ৬ শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ও নির্বাচনি কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
কারাগারে ৯৫ বন্দির মৃত্যু : গত নয় মাসে কারাগারে ৯৫ বন্দির মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪০ কয়েদি এবং ৫৫ হাজতি। মৃতদের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ২০ জন, বিএনপির একজন এবং সাধারণ বন্দি হিসাবে ৭৪ জনের পরিচয় নথিভুক্ত রয়েছে। এ সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে ও নির্যাতনের শিকার হয়ে ১২ জন, গুলিবিদ্ধ হয়ে দুজন এবং বন্দুকযুদ্ধে তিনজন নিহত হয়েছেন। এছাড়া বাহিনীর ধাওয়া খেয়ে পালানোর সময় বিভিন্ন ঘটনায় অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
নির্যাতনের শিকার ২ হাজার ৪০৪ নারী ও কন্যাশিশু : গত নয় মাসে ২ হাজার ৪০৪ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্তত ৬৫৭ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩৯২ জনের বয়স ১৮ বছরের কম। এ সময়ে ১৩০ নারী ও কন্যাশিশু সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৯ জনকে। এছাড়া ৬৯৬ জন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। পারিবারিক সহিংসতায় ৪৫৭ জন নারী নিহত, ২৭৯ জন আহত এবং ২১৯ জন আত্মহত্যা করেছেন। একই সময়ে ১ হাজার ৮১০ শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত ৪৯৪টি শিশু প্রাণ হারিয়েছে।
সংখ্যালঘু ও শ্রমিক নির্যাতন : গত নয় মাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৫৬টি হামলার ঘটনায় ৬২ জন আহত হয়েছেন। ২১টি মন্দির, ২০টি প্রতিমা ও ৪৭টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর হয়েছে। অন্যদিকে, ৫৮২টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় ১৪৫ জন নিহত এবং ১ হাজার ২৬৩ জন আহত হয়েছেন। কর্মক্ষেত্রে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও সুরক্ষাসামগ্রীর অভাবে দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৩৯০ শ্রমিক। এ সময়ে নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থান থেকে ৪৯১ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৪৩টি হামলার ঘটনায় ১৩ জন নিহত ও ৩৯ জন আহত হয়েছেন। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তেও সহিংসতা ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে রাষ্ট্র ও সমাজের সবস্তরের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। রাজনৈতিক ও মব সহিংসতা, সাংবাদিক নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, নারী-শিশু নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যুর মতো ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
