অস্তিত্ব সংকটে কর্ণফুলী পেপার মিল
Advertisement
সুশীল প্রসাদ চাকমা, রাঙামাটি
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
কর্ণফুলী পেপার মিলের পাল্পিং ইউনিটটি কয়েক বছর ধরে বন্ধ থাকায় আমদানি করা পাল্প ও পুরোনো কাগজের ওপর ভর করে কোনোমতে টিকে আছে প্রতিষ্ঠানটি -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কর্ণফুলী পেপার মিল লিমিটেড (কেপিএম) কেবল একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতার এক ঐতিহাসিক প্রতীক। রাঙামাটির পাহাড়ঘেরা নৈসর্গিক পরিবেশে স্থাপিত প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠার থেকে কাগজ উৎপাদনে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে অনন্য অবদান রেখেছে। অথচ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম কাগজকলটি এখন নিভুনিভু করে জ্বলছে।
নানা অনিয়ম-দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় এটি জৌলুস হারিয়েছে। আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবলের অভাব আর কাঁচামালের সংকটে বাড়ছে লোকসানের অঙ্ক। তবে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিকে পুনরুজ্জীবন দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, দেওয়া হয়েছে আধুনিকায়নের প্রস্তাব। এখন আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া ও যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি আবারও দেশের কাগজ খাতের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
জানা যায়, ১৯৫৩ সালে রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার চন্দ্রঘোনায় ৫০১ একর জমিতে স্থাপিত হয় কেপিএম। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সেকেলে ও জরাজীর্ণ বিকল যন্ত্রপাতি, তীব্র কাঁচামাল সংকট, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতিবাজ চক্রের সিন্ডিকেট এবং পুঞ্জীভূত লোকসানের ভারে ন্যুব্জ হয়ে আছে মিলটি, যা এখন অস্তিত্ব সংকটে।
গৌরবের ইতিহাস ও বর্তমান হালচাল : বিদেশি সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত কেপিএম ১৯৫৩ সালের ১৬ অক্টোবর বাণিজ্যিকভাবে প্রথম কাগজ উৎপাদন শুরু করে। সে সময়ে এর বার্ষিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩০ হাজার টন। রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাটির বার্ষিক নিজস্ব পাল্প (কাগজ তৈরি মণ্ড তৈরি) উৎপাদন ক্ষমতা ২৪ হাজার টন।
এটি পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (পিআইডিসি) (১৯৫৩-১৯৫৮), দাউদ (১৯৫৯-১৯৭১), পেপার অ্যান্ড বোর্ড করপোরেশন (১৯৭১-৭৪) এবং এরপর থেকে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।
২০০১ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক ছিল। সে সময়ের মুনাফায় পাশেই গড়ে তোলা হয় কর্ণফুলী রেয়ন মিলস। তবে দুই দশকে সেই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। মিলের মূল পাল্পিং ইউনিটটি টানা কয়েক বছর ধরে সম্পূর্ণ বন্ধ।
এতে নিজস্ব প্রযুক্তিতে বাঁশ ও কাঠ থেকে মণ্ড তৈরি করতে পারছে না মিলটি। আমদানি করা মণ্ড ও দেশীয় অকেজো ছেঁড়া কাগজের ওপর নির্ভর করে এতে উৎপাদন চলছে। আগে প্রতিদিন গড়ে ১০০ টনের বেশি কাগজ উৎপাদন হতো, সেখানে বর্তমানে উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র ১০ থেকে ৩৫ টনে।
আর্থিক লোকসান : কেপিএম সর্বশেষ লাভের মুখ দেখেছিল ২০০৮-০৯ অর্থবছরে। এরপর থেকে প্রতিবছরই লোকসানের পাল্লা ভারী হচ্ছে। বেসরকারি কলগুলো যেখানে প্রতি টন কাগজ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করছে, সেখানে কেপিএম প্রতি টন প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায় ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। বর্তমানে কর্মরত কয়েকশ স্থায়ী ও অস্থায়ী শ্রমিক-কর্মচারীর বেতন-ভাতা এবং প্রশাসনিক ব্যয় মেটাতে প্রতি মাসে মিল কর্তৃপক্ষের ন্যূনতম ৫ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে।
অন্যদিকে অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের গ্র্যাচুইটি ও বকেয়া পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। কাঁচামাল সরবরাহকারী স্থানীয় ব্যবসায়ীদেরও প্রায় ৩৫ কোটি টাকা বকেয়া পড়ে আছে। সব মিলিয়ে বছরে গড়ে ৪৫ কোটি টাকা লোকসান দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে বিসিআইসির কাছে কেপিএমের প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ঋণ আছে। বিসিআইসির তথ্যমতে, গত ১০ বছরে কেপিএম লোকসান দিয়েছে ৪৫৩ কোটি টাকার বেশি।
সিন্ডিকেট ও দুর্নীতি : কেপিএমের এই বিপর্যয়ের পেছনে অনিয়ম ও দুর্নীতিই অন্যতম কারণ। বছরের পর বছর ধরে কর্মকর্তা, কর্মচারী ও কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর সমন্বিত সিন্ডিকেট মিলটিকে ভেতরে ভেতরে ফোকলা করে দিয়েছে। বিগত সময়ে দরপত্র (টেন্ডার) প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতার অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া ট্যালকম পাউডার ও রোলার আমদানির নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের নজিরও রয়েছে। মিলের যন্ত্রাংশ ক্রয়ের নামে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি এবং কাঁচামাল ক্রয়ে অতিরিক্ত মূল্য দেখানোর মাধ্যমে সরকারের বিপুল অর্থ লোপাট হয়েছে। এতে কিছু কর্মকর্তারও মদদ ছিল।
কাঁচামাল ও পানির তীব্র সংকট : পার্বত্য অঞ্চলের বনাঞ্চল থেকে বাঁশ ও পাল্প-উড সংগ্রহের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি নবায়ন না হওয়ায় এবং বন উজাড়ের কারণে কেপিএম দেশীয় কাঁচামাল হারিয়েছে। এর বাইরে শুষ্ক মৌসুমে কর্ণফুলী নদীর পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাওয়ায় ওয়া¹া পাম্প হাউজ সচল রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। প্রয়োজনীয় পানির তীব্র সংকটের কারণে অনেক সময় উৎপাদন দিনভর বন্ধ রাখতে হয়।
বাঁচানোর চেষ্টা : প্রতিষ্ঠানটিকে পুনরুজ্জীবন দিতে বিসিআইসি ও সরকারের পক্ষ থেকে ৩৬ হাজার কোটি টাকার (৩ বিলিয়ন ডলার) একটি আধুনিকায়ন প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। যার লক্ষ্য-৫ বছরে ছয়টি অত্যাধুনিক প্ল্যান্ট স্থাপন করে বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ১ লাখ টনে নিয়ে যাওয়া।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এই মেগা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে মিলের দুর্নীতিগ্রস্ত সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে এবং কাঁচামাল সরবরাহের সুনির্দিষ্ট উৎস নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বিপুল অর্থের অপচয় ছাড়া কেপিএমের সুদিন ফিরবে না।
শ্রমিক, কর্মচারী ও ব্যবসায়ীদের দাবি : কেপিএম দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধ এবং দ্রুত পূর্ণরূপে মিলটি চালুর দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের রাঙামাটি জেলা শাখা। জেলা সভাপতি মো. আবদুস সালাম ও সাধারণ সম্পাদক মো. নুর জামাল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতা বন্ধ থাকায় মিলের শ্রমিকরা পরিবার নিয়ে চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। এটি শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিও।
প্রিয়তোষ চন্দ, নিপুল কান্তি দেসহ সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও ব্যবসায়ীরা বলেন, ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া হলেও কেপিএম পাওনা আটকে রেখেছে। ঠিকাদার ও ব্যবসায়ীদের প্রায় ৩৫ কোটি টাকার বিল বকেয়া রয়েছে। অথচ কর্তৃপক্ষের কার্যাদেশের ভিত্তিতে যথাযথভাবে মিলে নির্দিষ্ট সময়ে কাঁচামাল সরবরাহ দেওয়া হয়েছে। কাজ শেষ করে জামানতের টাকাও ফেরত দেওয়া হচ্ছে না।
উৎপাদন খরচ কমানো বড় চ্যালেঞ্জ : বর্তমানে কেপিএম প্রতি টন কাগজ উৎপাদনে ৩৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা লোকসান গুনছে। এর কারণ প্রতি টন কাগজ উৎপাদনের খরচ ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা, অথচ বিক্রয়মূল্য ৯৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা।
কর্মকর্তারা বলছেন, স্থানীয় বাঁশ ও গাছ সংগ্রহ বন্ধ থাকায় পুরোনো কাগজ এবং ব্যয়বহুল আমদানি করা পাল্পের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। কর্তৃপক্ষ জানায়, আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবলের অভাবে এখন কাগজকলটির বার্ষিক উৎপাদন ঠেকেছে মাত্র ২ হাজার থেকে ৬ হাজার টনে। বর্তমানে কর্ণফুলী পেপার মিলে ৪১ কর্মকর্তা, ৩৯ কর্মচারী ও ১৮০ শ্রমিক রয়েছেন। অথচ এক দশক আগেও এখানে ৫ হাজার জনবল ছিল।
যা বলছেন কর্তৃপক্ষ : কেপিএমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বাঁশ ও পাল্প-উড বিশেষজ্ঞ মো. শহীদ উল্লাহ বলেন, প্রতিষ্ঠানটির বেশির ভাগ পুরোনো যন্ত্রপাতি প্রায় অকেজো। কিছু তো মেরামতেরও উপযোগী নেই। এজন্য ইতোমধ্যে পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা পুনরুদ্ধারে বিসিআইসির মাধ্যমে শিল্প মন্ত্রণালয়ে একটি প্রকল্প প্রস্তাব জমা দিয়েছে কেপিএম। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পেলে কারখানাতে বছরে ১ লাখ টন কাগজ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি ঘুরে দাঁড়ালে কাগজের বাজারের মূল্য নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিও সমৃদ্ধ হবে।
রাঙামাটির সংসদ-সদস্য দীপেন দেওয়ান বলেন, কেপিএমের এমন দুরবস্থার জন্য দায়ী তৎকালীন কর্তৃপক্ষের গাফিলতি। যন্ত্রগুলো যখন সংস্কারের দরকার ছিল, তখন সে কাজ করা হয়নি। এটিকে শুধু বাঁচিয়ে রাখাই নয়, লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসাবে চালু করতে হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বেকারত্ব দূরীকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কেপিএমকে দ্রুত পুনরায় চালুর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। এ লক্ষ্যে সরকার কাজ শুরু করেছে।
