Logo
Logo
×

Advertisement

শেষ পাতা

ড্রাইভিং প্রশিক্ষণে ব্যয় হচ্ছে ৫৪০ কোটি টাকা

দেশে-বিদেশে চাহিদা মিলছে না দক্ষ চালক

Advertisement

এম শাহজাহান

এম শাহজাহান

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে-বিদেশে চাহিদা মিলছে না দক্ষ চালক

Advertisement

দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য দক্ষ চালক তৈরির লক্ষ্য নিয়ে ২০২০ সালে শুরু হয়েছিল ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ প্রকল্প। মেয়াদ ছিল ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। এর মধ্যে প্রথম সংশোধনে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৫০১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। এবার দ্বিতীয় সংশোধনে মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এ প্রস্তাবে ব্যয় ৫৪১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা পর্যন্ত উন্নীত করার বিষয় এসেছে। অর্থাৎ মূল বরাদ্দের তুলনায় প্রস্তাবিত ব্যয় বেড়েছে ২৭৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।

এছাড়া কতজন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, কতজন দক্ষ চালক হয়েছেন আর কতজন বিদেশে চাকরি পেয়েছেন-এসবের হিসাবেই রয়েছে অসঙ্গতি। এরই প্রেক্ষিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রকৃত চিত্র, লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং প্রকল্পের বিভিন্ন খাতের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে খোদ পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি)। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

জানা গেছে, বিদেশে দক্ষ চালক পাঠিয়ে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের উদ্দেশ্যে নেওয়া ‘দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ প্রদান’ শীর্ষক সরকারি প্রকল্পটি যেন এখন মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানোর মহোৎসবে পরিণত হয়েছে। দফায় দফায় সংশোধনী এনে প্রকল্পের সময় বাড়ালেও বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন দূরের কথা, প্রশিক্ষণের সংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের। একই সঙ্গে, প্রকল্পের আওতায় অযৌক্তিক খাতেই বিপুল অঙ্কের বাড়তি অর্থ বরাদ্দ চাওয়ার চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে পরিকল্পনা কমিশনের পর্যালোচনায়।

সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. নূরুন্নাহার চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পিইসি সভায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সেখানে উঠে আসে প্রকল্পের ধীরগতি এবং বাজেটের অসঙ্গতির আদ্যোপান্ত। ওই বৈঠকের কার্যপত্র অর্থ মন্ত্রণালয়েও পাঠানো হয়েছে।

এ সংক্রান্ত নথিপত্রে দেখা যায়, বর্তমানে প্রস্তাবিত ২য় সংশোধনীতে আরও ৪১ কোটি টাকা বৃদ্ধি করে পুরো প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৪১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা এবং মেয়াদ আরও ২ বছর বাড়িয়ে ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। অবাক করার বিষয় হলো-ব্যয় ও মেয়াদ দুটোই জ্যামিতিক হারে বাড়লেও কমে যাচ্ছে প্রকল্পের মূল প্রশিক্ষণ লক্ষ্যমাত্রা। এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ২ হাজার ৪০০ জন দক্ষ ড্রাইভার তৈরি করা।

সে অনুযায়ী জুন ২০২৬ পর্যন্ত ১৯ ব্যাচে ৬০ হাজার ৪৬৮ জন ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে। তবে বর্তমান সরকার আগামী পাঁচ বছরে এক লাখ জনশক্তিকে বিদেশে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সে প্রেক্ষিতে আরডিপিপি অনুযায়ী অবশিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ৪১ হাজার ৯৩২ জন। বর্তমান সরকারের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে আরডিপি সংস্থানের অতিরিক্ত ৩৪ হাজার ৮৬৮ জনসহ মোট ৭৬ হাজার ৮০০ জন দক্ষ ড্রাইভার তৈরির লক্ষ্যে প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়। অর্থাৎ প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়লেও প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা কমে গেছে।

পিইসি সভার আলোচনা সূত্রে জানা গেছে, এর নেপথ্যে রয়েছে-অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বৃদ্ধি, প্রশিক্ষকের অভাব, প্রয়োজনীয় যানবাহন না থাকা, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পরীক্ষার দীর্ঘসূত্রতা, লাইসেন্স পাওয়ার জটিলতা ইত্যাদি। প্রকল্প চালুর পর করোনা মহামারির অজুহাত এবং বিআরটিএ’র ধীরগতির কারণে যথাসময়ে পরীক্ষা ও লাইসেন্স ইস্যু করা সম্ভব হয়নি।

ফলে দক্ষ চালক হিসাবে সনদ পেলেও শত শত তরুণ বিআরটিএ’র লাইসেন্সের অভাবে বিদেশে পাড়ি জমাতে পারছেন না। এছাড়া বিদেশগামী চালকদের সহায়তায় প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের যুক্ত থাকার কথা থাকলেও কার্যকর কোনো সহায়তা পাওয়া যায়নি বলে সভায় ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। ফলে প্রশিক্ষণার্থীদের বিদেশ পাঠানোর যে মূল উদ্দেশ্য ছিল, সেটি অনেকটাই থমকে গেছে।

পিইসি সভার সভাপতি ড. নূরুন্নাহার চৌধুরী ওই সভায় নির্দেশ দেন, দেশের মানুষের ট্যাক্সের টাকার অপচয় কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। তিনি বলেন, বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রকল্পের লজিক্যাল ফ্রেমওয়ার্ক এবং রিভাইজড বাজেট পুনর্গঠন করতে হবে। অহেতুক কেনাকাটা বাদ দিয়ে কীভাবে বিআরটিএ’র সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত প্রশিক্ষণার্থীদের লাইসেন্স নিশ্চিত করা যায় এবং তাদের বৈদেশিক কর্মসংস্থান বাড়ানো যায়-সেদিকেই মূল নজর দিতে হবে। এছাড়া পরিকল্পনা কমিশন থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ড্রাইভিং সেশনের মান অক্ষুণ্ন রেখে এবং অতিরিক্ত কেনাকাটার আবদার বাদ দিয়ে পুনরায় ‘আরডিপিপি’ জমা দেওয়া হলেই কেবল চূড়ান্ত অনুমোদনের সুপারিশ করা হবে।

সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে ওই সভায় মহাপরিচালক (বিএমইটি) জামিল আহমেদ বলেন, প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বৈদেশিক কর্মসংস্থানের হার অনেক কম। গত জুন পর্যন্ত প্রকল্পের আওতায় ৬৮ হাজার ৬৯৩ জনের ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে।

এর মধ্যে ২৬ হাজার ১৭৩ জনের দেশে এবং ১৬ হাজার ৭৪ জনের বিদেশে উচ্চদক্ষ ড্রাইভার হিসাবে কর্মসংস্থান হয়েছে। তিনি বলেন, প্রশিক্ষিত ড্রাইভারদের বৈদেশিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া প্রকল্পে পূর্বকালীন প্রকল্প পরিচালক না থাকায় প্রশিক্ষণ পাওয়া যায়নি এবং প্রকল্পের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি।

পিইসি সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চালকদের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের হার স্পষ্টভাবে তুলে ধরা এবং তাদের কর্মসংস্থানের প্রোফাইলসহ ডেটাবেজ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন সভাপতি নূরুন্নাহার চৌধুরী। সংশোধিত প্রকল্পের সিদ্ধান্তেও প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান যুগান্তরকে বলেন, এ ধরনের প্রকল্পের সাফল্য শুধু প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা দিয়ে মাপার সুযোগ নেই। সরকারি অর্থ ব্যয়ের বিপরীতে দক্ষতা অর্জন, চাকরিতে নিয়োগ এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের বাস্তব ফলাফলও যাচাই করতে হবে। ফলে ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য কতটা অর্জিত হয়েছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

প্রকল্প সংশোধনের কারণ জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, করোনা মহামারির কারণে কার্যক্রম সময়মতো শুরু না হওয়া এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী সব যানবাহন কেনার কাজ শুরু করতে না পারায় প্রকল্পের কাজ শেষ করা যায়নি। কার্যবিবরণী অনুযায়ী, ভাতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা, প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা এবং ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব সংশোধিত ডিপিপিতে যুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণ, গ্যাস ও জ্বালানি, ভ্রমণ, আপ্যায়ন, কম্পিউটারসামগ্রী, অফিস সরঞ্জাম ও খুচরা যন্ত্রাংশ কেনার ব্যয়ও পর্যালোচনায় আসে। কিছু খাতের প্রস্তাবিত ব্যয়ের যৌক্তিকতা পুনর্বিবেচনা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাদ দেওয়ার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

মোটরসাইকেলের সামনে নম্বরপ্লেট ইস্যুতে বিআরটিএর নতুন সিদ্ধান্ত

মোটরসাইকেলের সামনে নম্বরপ্লেট ইস্যুতে বিআরটিএর নতুন সিদ্ধান্ত

রাজধানীতে বিআরটিএর র‍্যালি ও লিফলেট বিতরণ

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২৬ রাজধানীতে বিআরটিএর র‍্যালি ও লিফলেট বিতরণ

মোটরসাইকেল চালকদের জন্য স্বস্তির খবর

মোটরসাইকেল চালকদের জন্য স্বস্তির খবর

সব যানবাহনের মালিক-চালকদের বিআরটিএর জরুরি নির্দেশনা

সব যানবাহনের মালিক-চালকদের বিআরটিএর জরুরি নির্দেশনা

‘১৪ বছর ধরে দুর্ভোগ পোহানো গাজীপুর-উত্তরার বাসিন্দাদের প্রতি সুবিচার করেনি সরকার’

‘১৪ বছর ধরে দুর্ভোগ পোহানো গাজীপুর-উত্তরার বাসিন্দাদের প্রতি সুবিচার করেনি সরকার’

বিআরটিএতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান, চারজনকে কারাদণ্ড

বিআরটিএতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান, চারজনকে কারাদণ্ড

আরও পড়ুন

ড্রাইভিং প্রশিক্ষণে ব্যয় হচ্ছে ৫৪০ কোটি টাকা দেশে-বিদেশে চাহিদা মিলছে না দক্ষ চালক

দেশে-বিদেশে চাহিদা মিলছে না দক্ষ চালক

অস্তিত্ব সংকটে কর্ণফুলী পেপার মিল

অস্তিত্ব সংকটে কর্ণফুলী পেপার মিল

সফর নিয়ে বিএনপি নেতারা প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর ঐতিহাসিক ও বড় বিজয়

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর ঐতিহাসিক ও বড় বিজয়

ময়নাতদন্তের পরই তাহসিফের মৃত্যুর কারণ জানা যাবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ময়নাতদন্তের পরই তাহসিফের মৃত্যুর কারণ জানা যাবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম