ভারত থেকে আমদানি করা চালে ক্ষতিকর উপাদান
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভারত থেকে আমদানি করা ১৩৫ টন চালে ক্যানসারের উপাদান পাওয়া গেছে। চট্টগ্রাম ও ঢাকার সরকারি গুদামে রাখা ওই চালের নমুনায় সম্ভাব্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী বিষাক্ত উপাদান ‘আফলাটক্সিন’-এর উপস্থিত রয়েছে বলে জানান খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। এ ঘটনার পর অধিকতর পরীক্ষার জন্য ওই চালানের ৯ হাজার ৫০০ টন চাল বিতরণ সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে খাদ্য অধিদপ্তর। এ দিকে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল চালে ক্ষতিকর আফলাটক্সিন পাওয়ার দাবি প্রত্যাখ্যান করে গণমাধ্যমকে বলেছে এটা হতেই পারে না।
সরবরাহকারীর শিপিং এজেন্ট সেভেন সিজ শিপিং লাইনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী আকবর অভিযোগ করে গণমাধ্যমকে বলেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি সরবরাহকারীর সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, এমনটা চলতে থাকলে কোনো আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী বাংলাদেশে খাদ্যশস্য সরবরাহে আগ্রহ দেখাবে না, যা দেশকে বিপাকে ফেলবে। এদিকে প্রাথমিক নমুনাগুলো পুরো চালানের সঠিক প্রতিনিধিত্ব করেছিল কিনা তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। খাদ্য বিভাগ এখনো চালে থাকা বিষাক্ত উপাদানের সুনির্দিষ্ট ঘনত্ব প্রকাশ করেনি, কিংবা চিহ্নিত চালের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বা অন্যান্য গুদামে আরও পরীক্ষা চালানো হবে কিনা সে বিষয়েও স্পষ্ট কিছু জানায়নি।
এ বিষয়ে কথা বলতে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) এম জসিম উদ্দিন খানের সঙ্গে কথা বলতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। খুদে বার্তায় প্রতিবেদকের পরিচয় দিয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি সাড়া দেননি। চাইলে খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক সংগ্রহ মো. মনিরুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, ভারত থেকে আমদানি করা ওই ১৩৫ টন চাল গ্রহণ করব না বলে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছি। প্রাথমিক তদন্তে চালে ক্ষতিকর ‘আফলাটক্সিন’ উপস্থিত পাওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকার জনস্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানান মনিরুজ্জামান। এক প্রশ্নে মনিরুজ্জামান জানান, সিঙ্গাপুরভিত্তিক অ্যাগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এ চাল সরবরাহ করেছে।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. কাজী শিরীন আক্তার জাহান গণমাধ্যম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত চালে আফলাটক্সিন তৈরি হতে পারে। নমুনায় যা শনাক্ত হয়েছে, তার মাত্রা সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সহনীয় মাত্রা অতিক্রম করলে আফলাটক্সিন স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
১৭ আগস্ট চট্টগ্রামের হালিশহর ও দেওয়ানহাট সেন্ট্রাল স্টোরেজ ডিপোর (সিএসডি) চালের স্তূপ থেকে তিন সদস্যের একটি ব্রি প্রতিনিধিদল নমুনা সংগ্রহ করে। পরীক্ষায় হালিশহর এবং ঢাকার একটি সরকারি গুদামের চালের নমুনায় এই বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি মেলে। এমন ফলাফলের পর ওই চালান থেকে গ্রহণ করা পুরো ৯ হাজার ৫০০ টন চালের বিতরণ স্থগিত করে খাদ্য অধিদপ্তর। হালিশহর সিএসডির ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) মাহমুদ হাসান যুগান্তরকে বলেন, খাদ্য কর্মকর্তারা এই লটের চাল দুবার পরীক্ষা করেছেন এবং ডিপো কর্তৃপক্ষকে চাল বিতরণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে পরীক্ষার আনুষ্ঠানিক ফলাফল এখনো ডিপোতে পৌঁছায়নি। মাহমুদ হাসান আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে আপনারা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলুন। তারা সব জানেন।
আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রতি টন ৩৫৩ দশমিক ১১ ডলার দরে ৫০ হাজার টন চাল আমদানির চুক্তির অংশ হিসাবে এই চাল সরবরাহ করেছিল সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল’। এর মধ্যে প্রায় ১০ হাজার ৮৭৮ টন ওজনের চূড়ান্ত চালানটি নিয়ে এমভি এইচটি পাইওনিয়ার জাহাজটি ২১ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়। পরদিন খাদ্য কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে নমুনা সংগ্রহ করে গবেষণাগারে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়।
প্রাথমিক প্রতিবেদনে চাল মানুষের খাওয়ার উপযোগী বলে ঘোষণা করা হয় এবং কর্তৃপক্ষ ২৪ ও ২৫ জুলাই চালান খালাসের অনুমতি দেয়। এরপর চালগুলো ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুরের সরকারি গুদামগুলোতে পাঠানো হয়। তবে পরবর্তীতে গুদামের কর্মকর্তারা চালানের একাংশের মান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং কিছু চাল অত্যন্ত নিম্নমানের ও খাওয়ার অনুপযোগী বলে উল্লেখ করেন। নিম্নমানের কারণে বন্দর থেকেই প্রায় ১ হাজার ৩৭৮ টন চাল জাহাজে ফেরত পাঠায় কর্তৃপক্ষ এবং অবশিষ্ট ৯ হাজার ৫০০ টন চাল গ্রহণ করা হয়।
এরপর খাদ্য অধিদপ্তর চালের অধিকতর পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন। তবে মহাপরিচালক (ডিজি) এম জসিম উদ্দিন খান পরীক্ষা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত চাল বিতরণ স্থগিতের নির্দেশ দেন বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্তকর্তারা। তবে আফলাটক্সিন পাওয়ার এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল। তাদের দাবি, বাংলাদেশের খাদ্য কর্মকর্তা এবং সরবরাহকারীর যৌথভাবে সংগৃহীত নমুনা ভারতের একটি পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়েছিল এবং তা চুক্তির শর্তাবলি পূরণ করেছিল। গণমাধ্যমে পাঠানো এক ইমেইলে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ব্রিতে পরীক্ষা করা সিলগালা যৌথ নমুনায় কোনো আফলাটক্সিন পাওয়া যায়নি।
সরবরাহকারী আরও জানায়, মান বজায় রাখতে তারা যথাযথ কার্যপ্রণালি অনুসরণ করেছিল এবং বিতরণ স্থগিত করার আগে এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। সরবরাহকারী শিপিং এজেন্ট সেভেন সিজ শিপিং লাইনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী আকবর গণমাধ্যমকে বলেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি সরবরাহকারীর সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, এমনটা চলতে থাকলে কোনো আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী বাংলাদেশে খাদ্যশস্য সরবরাহে আগ্রহ দেখাবে না।
