Logo
Logo
×

Advertisement

শেষ পাতা

জাতীয় যুব দিবস আজ

সনদ বাড়ছে কর্ম নেই

Advertisement

আরমান হেকিম

আরমান হেকিম

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সনদ বাড়ছে কর্ম নেই

Advertisement

দেশে শিক্ষিত যুবকের সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারীর সংখ্যাও। কিন্তু সেই অনুপাতে তৈরি হচ্ছে না কর্মসংস্থান। উচ্চশিক্ষা শেষ করেও বেকারত্বের কশাঘাতে ধুঁকছে বিপুলসংখ্যক যুবক। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলছে, দেশে উচ্চশিক্ষিত যুবকদের বেকারত্বের প্রতি ১০০ জনের ৩৬ জনই বেকার। সরকারি পরিসংখ্যানও বলছে, স্নাতকধারীদের তুলনায় মাধ্যমিক পাশ করা ব্যক্তিরা কম বেকার। অর্থাৎ, শিক্ষার স্তর যত উঁচু, বেকারত্বের হারও তত বেশি।

এমন বাস্তবতায় আজ পালিত হচ্ছে জাতীয় যুব দিবস। ‘দক্ষ যুব গড়বে দেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে নানা আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। এ উপলক্ষ্যে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টজনরা।

রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বাণীতে বলেছেন, সংগঠিত, দক্ষ ও অঙ্গীকারবদ্ধ যুবসমাজ দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তরুণদের মানসম্মত শিক্ষা, আধুনিক প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করতে সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেছেন, যুবসমাজ একটি জাতির প্রাণশক্তি এবং উন্নয়নের প্রধান নির্ধারক। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাণীতে বলেন, যুবসমাজ যে কোনো জাতির প্রাণশক্তি ও অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি। স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা, জাতীয় সংকট উত্তরণ এবং দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় যুবসমাজের অবদান অনস্বীকার্য। তিনি বলেন, স্বাধীনতা অর্জন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংকট মোকাবিলা ও উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় দেশের যুবসমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

জাতীয় যুব দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক জানান, এবারের দিবসে ৪ জন যুব সংগঠক এবং ১০ জন সফল আত্মকর্মীকে জাতীয় যুব পুরস্কার দেওয়া হবে। বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে দিবসের মূল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। যুবসমাজের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে ৫৫টি প্রতিষ্ঠান নিয়ে চাকরি মেলার আয়োজন করা হয়েছে। এতে পর্যায়ক্রমে ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার জনের চাকরির সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্য রয়েছে। এছাড়া সারা দেশে ১২ হাজার নবায়নযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপন, যুবকদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ ও যুব ঋণ বিতরণের কর্মসূচি রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে দেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছেন প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ যুবক। বিপরীতে এ সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে ৮৭ লাখ। অর্থাৎ, শ্রমবাজারে প্রবেশ করা মানুষের তুলনায় কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে অনেক কম। অন্যদিকে সরকারের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) কৌশলপত্র অনুযায়ী, দেশে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি প্রায় ৫৫ লাখ যুবক শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা কোনো প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত নেই। কর্মজীবনে প্রবেশের প্রস্তুতি ও কাজের সুযোগ-দুই ক্ষেত্রেই পিছিয়ে রয়েছেন বিপুলসংখ্যক তরুণ।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, দেশে শিক্ষিত যুবকের সংখ্যা বাড়লেও সে অনুযায়ী কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। এর পেছনে শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা ও দক্ষতার ঘাটতি বড় কারণ। ফলে উচ্চশিক্ষিত হয়েও তারা বেকার থাকছেন। বিবিএস-এর শ্রমশক্তি জরিপ-২০২৪-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষে দেশে বেকারের সংখ্যা ছিল ২৬ লাখ ২০ হাজার। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ২৪ লাখ ৬০ হাজার। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে বেকারের সংখ্যা বেড়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার। শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্নকারীদের বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ। উচ্চমাধ্যমিক শেষ করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এ হার ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ। মাধ্যমিক পাশ করা ব্যক্তিদের বেকারত্বের হার ২ দশমিক ৯১ শতাংশ। আর কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেই-এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এ হার মাত্র ১ দশমিক ২৫ শতাংশ। ফলে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেও চাকরি না পাওয়ার বাস্তবতা দেশের শ্রমবাজারের বড় সংকট হয়ে উঠেছে।

আইএমএফ-এর ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সাময়িকীর সেপ্টেম্বর ২০২৬ সংস্করণে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত যুবকদের বেকারত্বের হার ৩৬ শতাংশ। সংস্থার বিশ্লেষণে ১৫ থেকে ২৪ বছরের যুব জনগোষ্ঠী হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে। এ বয়সিদের সামগ্রিক বেকারত্বের হার ১০ শতাংশের কম হলেও উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে এ হার বেশি। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে উচ্চশিক্ষিত যুবকদের বেকারত্বের হারে তৃতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ। এর মধ্যে বেকার শ্রীলংকায় ৪৩, ভারতে ৪২ এবং বাংলাদেশে ৩৬ শতাংশ। এরপর রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ফিলিপিন্স, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও জাপান। আইএমএফ-এর মতে, উচ্চশিক্ষিত যুবকদের তুলনায় চাকরির বাজারে উপযুক্ত পদের সংখ্যা কম থাকায় এ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতার চিত্রও ক্রমেই কঠিন হচ্ছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা অনুযায়ী, বিডিজবস ডটকমে বর্তমানে প্রায় ৫০ লাখ চাকরিপ্রার্থীর প্রোফাইল রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই লাখ চাকরিপ্রার্থী এ প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করে পছন্দের চাকরি খোঁজেন। দুই বছর আগে এ সংখ্যা ছিল প্রায় দেড় লাখ। অর্থাৎ এ সময়ে চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ৩৩ শতাংশের বেশি। একটি পদের বিপরীতে গড়ে ২৮৭ জনের বেশি আবেদন করছেন। কোভিড মহামারির আগের পাঁচ বছরে একটি পদের বিপরীতে গড়ে ১৭৩ জন আবেদন করতেন। অর্থাৎ একই ধরনের চাকরিতে প্রতিযোগিতা বেড়েছে প্রায় ৬৬ শতাংশ। কর্মসংস্থানের ঘাটতির পাশাপাশি চাকরিদাতাদের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরিতেও পিছিয়ে বাংলাদেশ। কিউএস ওয়ার্ল্ড ফিউচার স্কিলস ইনডেক্স-২০২৫ অনুযায়ী, চাকরিদাতাদের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরির সক্ষমতায় ৮১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৬৭তম। অন্যদিকে বিবিএস-এর ‘স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস’ অনুযায়ী, দেশের সামগ্রিক এনইইটি হার প্রায় ৪১ শতাংশ। অর্থাৎ শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণের বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর হারও উল্লেখযোগ্য। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) হিসাবে, এ হার বৈশ্বিকভাবে ২২ শতাংশ। নারীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। দেশে যুব নারীদের প্রায় ৬২ শতাংশ শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণের বাইরে। অর্থাৎ শুধু চাকরি না পাওয়া নয়, বিপুলসংখ্যক যুবক-যুবতি শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থেকেও বিচ্ছিন্ন রয়েছেন।

প্রযুক্তির পরিবর্তনও শ্রমবাজারের চ্যালেঞ্জ বাড়াচ্ছে। আইএমএফ-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারে। ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে বর্তমান কর্মীবাহিনীর প্রায় ৪০ শতাংশের দক্ষতা শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের প্রায় ২২ শতাংশ কর্মীকে নতুন পেশার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। ফলে প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষতা তৈরি করতে না পারলে বাংলাদেশের যুবকদের কর্মসংস্থানের সংকট আরও বাড়তে পারে। অথচ যুব জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় সম্ভাবনা। দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সি। অর্থনীতির ভাষায় এটি জনমিতিক লভ্যাংশ বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড। এই জনগোষ্ঠীকে শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারলে শিল্প ও সেবা খাতে উৎপাদনশীলতা বাড়বে, সম্প্রসারিত হবে কর্মসংস্থান। বিদেশে দক্ষ কর্মী পাঠানো সম্ভব হলে তাদের আয়ও বাড়বে। কিন্তু বিপুল এই যুবশক্তিকে কাজে লাগাতে না পারলে জনমিতিক লভ্যাংশের সম্ভাবনাও হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

জাতীয় যুব দিবস আজ সনদ বাড়ছে কর্ম নেই

সনদ বাড়ছে কর্ম নেই

খাগড়াছড়িতে প্রথম আয়োজন আল্ট্রা ট্রেইল ম্যারাথনে ১৮৫ দৌড়বিদ

আল্ট্রা ট্রেইল ম্যারাথনে ১৮৫ দৌড়বিদ

বিচার বিভাগ পৃথক্করণ দিবস আজ সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয়ের অপেক্ষা থেকেই গেল

সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয়ের অপেক্ষা থেকেই গেল

ভারত থেকে আমদানি করা চালে ক্ষতিকর উপাদান

ভারত থেকে আমদানি করা চালে ক্ষতিকর উপাদান

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম