Logo
Logo
×

Advertisement

শেষ পাতা

প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইট ঘিরে অব্যবস্থাপনার জাল

কাঠগড়ায় বিমানের প্রকৌশল বিভাগ

তিন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্ত দল * প্রতিবেদন দিতে ৩ দিন সময় বাড়িয়েছে কমিটি

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কাঠগড়ায় বিমানের প্রকৌশল বিভাগ

Advertisement

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বহনকারী উড়োজাহাজে বারবার যান্ত্রিক ত্রুটির ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে সরকারের উচ্চপর্যায়। এসব ত্রুটির কারণ জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত কমিটি। সর্বশেষ জাপান সফরে ত্রুটির ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। চার কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে তা দিতে পারেনি কমিটি। প্রতিবেদন দাখিলে আরও তিন কার্যদিবস সময় চেয়েছেন তারা। জানা যায়, বিমানের ফ্লাইটে ত্রুটি রেখেই ছাড়পত্র দিয়েছিলেন প্রকৌশলী। শুধু তাই নয়, ত্রুটি পুরোপুরি নিরসন না করেই এমইএল-এর আওতায় উড়োজাহাজটিকে ঢাকায় ফেরানো হয়। এসব ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে ইতোমধ্যে ফ্লাইটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী দল, নারিতা স্টেশনের কান্ট্রি ম্যানেজার এবং মেইনটেন্যান্স কন্ট্রোল সেন্টারের (এমসিসি) কর্মকর্তাকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এরই মধ্যে প্রত্যাহার করা হয়েছে বিমানের প্রকৌশল বিভাগের পরিচালককে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর ভিভিআইপি ফ্লাইটে যান্ত্রিক ত্রুটির ঘটনায় মূলত তিনটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখছে তদন্ত কমিটি। প্রথমত, বিমানের বহরে একাধিক সচল উড়োজাহাজ থাকা সত্ত্বেও কেন নির্দিষ্ট উড়োজাহাজটি প্রধানমন্ত্রীর সফরের জন্য নির্বাচন করা হয়েছিল এবং এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন। দ্বিতীয়ত, উড়োজাহাজটির অতীত রক্ষণাবেক্ষণ ও কারিগরি রেকর্ডে কী ধরনের ত্রুটি ছিল এবং সেগুলো যথাযথভাবে সমাধান করা হয়েছিল কি না। তৃতীয়ত, নারিতা বিমানবন্দরে দুই ঘণ্টার মধ্যে সমাধানযোগ্য কারিগরি কাজ সম্পন্ন করতে কেন পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা লেগেছিল এবং এ দীর্ঘসূত্রতার পেছনে কোনো ব্যবস্থাপনাগত বা সমন্বয়গত ঘাটতি ছিল কি না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে বহনকারী ফ্লাইটের নিরাপত্তা নিয়ে এমন প্রশ্ন ওঠা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। শুধু কয়েকজন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ কিংবা দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করলেই ঘটনার প্রকৃত কারণ বেরিয়ে আসবে না বলে মনে করছেন তারা। উড়োজাহাজটির কারিগরি ইতিহাস, ছাড়পত্র দেওয়ার প্রক্রিয়া এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে হবে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, ভিভিআইপি ফ্লাইটের ক্ষেত্রে কারিগরি ছাড়পত্র, উড়োজাহাজ নির্বাচন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থায় কোনো ধরনের আপসের সুযোগ নেই। তদন্ত কমিটির বর্ধিত সময়ের মধ্যে শুধু ঘটনার বিবরণ নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি পর্যায়ে কার কী ভূমিকা ছিল, তাও স্পষ্ট করতে হবে। যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। অন্যথায় নারিতার ঘটনা সাময়িক প্রশাসনিক বিতর্কেই সীমাবদ্ধ থাকবে। আড়ালে থেকে যাবে উড্ডয়ন নিরাপত্তাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতার ঘাটতি।

বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত যুগান্তরকে বলেন, ফ্লাইটে ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর উড়োজাহাজটি আর উড্ডয়ন করেনি। বিষয়টি নিয়ে সরকার অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, উড়োজাহাজে ত্রুটি প্রতিরোধে আরও সতর্ক ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নতুন উড়োজাহাজও বহরে যুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। সেগুলো যুক্ত হলে যাত্রীদের আরও উন্নত সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।

যুগান্তরের হাতে আসা এয়ারক্রাফট মেইনটেন্যান্স লগে দেখা যায়, নারিতায় প্রাক-ফ্লাইট পরিদর্শন শেষে ভিভিআইপি কনফিগারেশন ও নিয়ম অনুযায়ী প্রকৌশলী সাদেকুল ইসলাম উড়োজাহাজটির এয়ারওয়ার্দিনেস ও রিলিজ সার্টিফিকেট দেন। অন্যদিকে যাত্রী পরিবহণের ছাড়পত্র দেন ক্যাপ্টেন ইমামুল। কিন্তু উড্ডয়নের উদ্দেশ্যে রানওয়ের দিকে ট্যাক্সি করার সময় ককপিটে একের পর এক কারিগরি ত্রুটির সংকেত দেখা দেয়। এর মধ্যে ছিল স্পয়লার সমস্যা, ফ্লাপ কমান্ড নির্ধারিত অবস্থানে না যাওয়া, বাম পাশের পিটোট হিট এবং র‌্যাম ফ্যানের ত্রুটি। পরিস্থিতি বিবেচনায় ক্যাপ্টেন ইমামুল উড্ডয়ন বাতিল করে উড়োজাহাজটিকে পার্কিং বে-তে ফিরিয়ে নেন।

এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, এতগুলো ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও এর আগে কীভাবে উড়োজাহাজটিকে উড্ডয়নের উপযোগী ঘোষণা করা হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৌশলী সাদেকুল যথাযথ কারিগরি যাচাই ছাড়াই ওই সনদ দিয়েছিলেন। পরে এমইএল (মিনিমাম ইকুইপমেন্ট লিস্ট) বা বিশেষ বিধানের আওতায় ত্রুটি পুরোপুরি মেরামত না করেই ফ্লাইটটি ঢাকায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়। এতে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা কতটা ঝুঁকিতে পড়েছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, উড়োজাহাজের উড্ডয়নযোগ্যতার ছাড়পত্র নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও রক্ষণাবেক্ষণব্যবস্থার পেশাগত দায়বদ্ধতার বিষয়। কোনো ত্রুটির ভুল মূল্যায়ন যাত্রীদের নিরাপত্তাকে সরাসরি ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নারিতার ঘটনার পর উড়োজাহাজটির একাধিক কারিগরি ত্রুটির বিষয় সামনে এসেছে। তদন্ত কমিটি এখন যাচাই করছে, এসব সমস্যা নারিতায় পৌঁছানোর পর নতুন করে দেখা দিয়েছিল, নাকি আগেও এর লক্ষণ পাওয়া গিয়েছিল। এজন্য তিন থেকে ছয় মাসের টেকনিক্যাল লগবুক, ত্রুটি শনাক্তের প্রতিবেদন, মেরামতের নথি এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশের রক্ষণাবেক্ষণ রেকর্ড পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রতিটি ত্রুটির বিপরীতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, মেরামতের পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছিল কি না এবং শেষ পর্যন্ত কার অনুমোদনে উড়োজাহাজটি উড্ডয়নের উপযোগী ঘোষণা করা হয়েছিল-এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

উড়োজাহাজ নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন : বিমানের বহরে একাধিক সচল উড়োজাহাজ থাকা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের জন্য নির্দিষ্ট উড়োজাহাজ (এস২-এজেওয়াই) কেন নির্বাচন করা হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তদন্ত কমিটি উড়োজাহাজ নির্বাচনের প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের নথি যাচাই করছে। ভিভিআইপি ফ্লাইটের ক্ষেত্রে উড়োজাহাজটির কারিগরি সক্ষমতা, সাম্প্রতিক রক্ষণাবেক্ষণের অবস্থা, ত্রুটির ইতিহাস ও বিকল্প উড়োজাহাজের প্রস্তুতি যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বিমানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, এসব প্রশ্নের উত্তর না মিললে ঘটনাটিকে নিছক যান্ত্রিক ত্রুটি হিসাবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, ভিভিআইপি ফ্লাইটের জন্য উড়োজাহাজ নির্বাচনও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

নারিতায় ব্যবস্থাপনা ও লজিস্টিক স্থবিরতা : নারিতা বিমানবন্দরে উড়োজাহাজটির কারিগরি ত্রুটি সমাধানে কেন পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা লেগেছিল, তাও তদন্তের আওতায় রয়েছে। জানা যায়, নারিতা স্টেশনে বিমানের নিয়মিত ফ্লাইট না থাকায় সেখানে নিজস্ব স্থায়ী প্রকৌশলী ছিলেন না। ফলে স্থানীয় গ্রাউন্ড সার্ভিস এজেন্সির (জিএসএ) ওপর নির্ভর করতে হয়। ভিভিআইপি ফ্লাইটের বিষয়টি জানা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় কারিগরি ও লজিস্টিক সহায়তা, যেমন রাডার অ্যাকসেস ও মই সরবরাহে ইচ্ছাকৃত বিলম্ব করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে তদন্ত কমিটি। মেরামত প্রক্রিয়ায় কারা যুক্ত ছিলেন, ঢাকার এমসিসির সঙ্গে যোগাযোগ এবং কারিগরি নির্দেশনা পেতে কত সময় লেগেছে, সেসব তথ্যও যাচাই করা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, ভিভিআইপি ফ্লাইটের জন্য আগাম বিকল্প কারিগরি সহায়তার ব্যবস্থা কেন প্রস্তুত ছিল না।

দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ : ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত কমিটির সদস্যরা বিমানের মেইনটেন্যান্স কন্ট্রোল সেন্টারে (এমসিসি) সরেজমিন উপস্থিত হয়ে উড়োজাহাজের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, কারিগরি লগবুক ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করেছেন। ফ্লাইটের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী দল, নারিতা স্টেশনের কান্ট্রি ম্যানেজার আহমেদ এহসানুল হক এবং এমসিসির আবুল কালাম আজাদসহ সংশ্লিষ্টদের দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দায়িত্বে অবহেলা বা অনিয়মে কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

ভিভিআইপি ফ্লাইটের দায়িত্বে দুদকের মামলার আসামি : পুরো ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রকৌশলী সাদেকুল ইসলাম ভূঁইয়া। ২০১৪ সালে মিসরীয় উড়োজাহাজ সংস্থা ইজিপ্ট এয়ার থেকে দুটি বোয়িং উড়োজাহাজ লিজ নেওয়াকে কেন্দ্র করে শতকোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি তিনি। মামলাটি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন। এমন একজন বিচারাধীন মামলার আসামি কীভাবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ ভিভিআইপি ফ্লাইটের উড্ডয়নযোগ্যতার ছাড়পত্র দেওয়ার মতো স্পর্শকাতর দায়িত্বে বহাল থাকলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ক্ষেত্রে নিয়োগ, দায়িত্ব বণ্টন ও প্রশাসনিক জবাবদিহির বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন।

বিমানের জনসংযোগ মহাব্যবস্থাপক শাহনূর আহমেদ যান্ত্রিক ত্রুটির কথা স্বীকার করে জানিয়েছেন, তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই এ বিষয়ে বিস্তারিত ও দাপ্তরিক ব্যবস্থা জানা যাবে।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

চাঁদার টাকায় আধুনিক অস্ত্রের মজুত

চাঁদার টাকায় আধুনিক অস্ত্রের মজুত

জঙ্গল থেকে জনপদ ইতিহাসের সাক্ষী তিতাখাঁ মিতাখাঁ মসজিদ

ইতিহাসের সাক্ষী তিতাখাঁ মিতাখাঁ মসজিদ

ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগ পাহাড়ে বিচারের নামে দুজনকে পিটিয়ে হত্যা

পাহাড়ে বিচারের নামে দুজনকে পিটিয়ে হত্যা

নিত্য মৃত্যুর ভাঙ্গা-কুয়াকাটা মহাসড়ক একনেকে ঠাঁই হয়নি ছয় লেন প্রকল্পের

একনেকে ঠাঁই হয়নি ছয় লেন প্রকল্পের

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম