ভারতীয় অর্থায়ন বাতিল করে বিকল্প অনুসন্ধান
সিরাজগঞ্জ-বগুড়া রেলপথ নির্মাণ হয়নি ৭ বছরেও
গুরুত্বপূর্ণ ডাবল লাইনের এই রেলপথ বাস্তবায়ন হলে পালটে যাবে উত্তরবঙ্গের অর্থনীতি
Advertisement
শিপন হাবীব
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সিরাজগঞ্জ-বগুড়া সিঙ্গেল-ডুয়েলগেজ লাইন নির্মাণ ২০১৮ সালে একনেকে অনুমোদন হয়। ওই সময় রেলওয়েসংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী পরিকল্পনা দপ্তরের জোর দাবি ছিল-নতুন রেলপথটি যেন ডাবল লাইনে নির্মাণ করা হয়। এমন দাবি এখনো উত্তরবঙ্গের মানুষের।
ভারতীয় এলওসির অর্থায়নে দীর্ঘ ৭ বছরে এ প্রকল্পের অগ্রগতি ১ শতাংশেরও (ক্রমপুঞ্জিত আর্থিক অগ্রগতি) কম! সর্বশেষ এলওসির এ প্রকল্প বাতিল করা হয়। নতুন করে বিকল্প অর্থায়ন খোঁজা হচ্ছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ঢাকা-বগুড়া যাত্রায় সময় কমবে ৪ ঘণ্টার বেশি। আর ডাবল লাইন নির্মাণ হলে এ পথে অর্ধশতাধিক ট্রেন চালানো সম্ভব হবে। সরাসরি উপকৃত হবে উত্তরবঙ্গের ৮ জেলার মানুষ, কৃষি ও অর্থনীতি।
রেলে নতুন করে লাইন নির্মাণ হলে তা অবশ্যই ‘ডাবল লাইন’ হবে-এমন কড়া বার্তার পরও শুধু লুটপাট করতে বার্তাটি মানা হচ্ছে না। কোথাও সিঙ্গেল, কোথাও ডুয়েলগেজ লাইন নির্মাণ চলছে। সিঙ্গেল-ডুয়েলগেজ লাইন তথা এসবের রোলিংস্টক সামগ্রী পুরো বিশ্বেই দুষ্প্রাপ্য।
খোদ রেলওয়ে পরিকল্পনা দপ্তরের বক্তব্য-সিঙ্গেল লাইন কিংবা ডুয়েলগেজ লাইন নির্মাণ মানেই পরবর্তী সময়ে ওইসব প্রকল্প ঘিরে নতুন প্রকল্প গ্রহণ-বাস্তবায়নের পথ খোলা রাখা। আর এর মাধ্যমে বারবার দুর্নীতি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান মঙ্গলবার রাতে যুগান্তরকে বলেন, সিরাজগঞ্জ-বগুড়া রেলপথ নির্মাণ খুবই জরুরি। এ রুট হবে রেলের জন্য দ্রুত সেবা ও সাশ্রয়ের। এলওসির অর্থায়নে এ প্রকল্পটি হওয়ার কথা ছিল। এখন আমরা বিকল্প অর্থায়ন খুঁজছি। চাহিদা অনুযায়ী এ প্রকল্পটি ডাবল লাইন নির্মাণও জরুরি। আমরা নিরাশ হচ্ছি না। অর্থায়ন প্রাপ্তি এবং সব বিষয় বিবেচনায় আমরা সর্বোচ্চটাই করব। আমরা জানি, ডাবল লাইন নির্মাণ হলে পর্যাপ্ত ট্রেন পরিচালনার সঙ্গে সেবা ও সময় দারুণ সাশ্রয় হবে। এ প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আরও বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। রেলে যথাযথ উন্নয়ন ও সুদূরপ্রসারী প্রকল্প বাস্তবায়নে আমরা কাজ করছি। সেবা বাড়িয়ে কীভাবে আয় আরও বাড়ানো যায়, সে বিষয়ে সম্মিলিত কর্মপরিচালনা-নির্দেশনা প্রদান করা হচ্ছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রকল্পটি বিকল্প অর্থায়নে করতে কোমর বেঁধেছে। তবে এখন পর্যন্ত নতুন রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের উদ্বোধন কিংবা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেনি। ডাবল লাইনের এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গের দূরত্ব কমবে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার। সময় বাঁচবে প্রায় চার ঘণ্টা। ঢাকা থেকে সড়কপথে বগুড়া পৌঁছাতে লাগে ৬ ঘণ্টা, সেখানে ট্রেনে যেতে লাগে ১০-১১ ঘণ্টা। নতুন এ লাইন হলে বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ হয়ে মাত্র ৫ ঘণ্টায় ঢাকায় পৌঁছানো সম্ভব।
চলতি বছরের জুনে এ প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণে ১৯০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। ডাবল লাইন অনুযায়ী জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। রেলওয়ে কর্মকর্তাদের ভাষ্য-‘এ প্রকল্প ডাবল লাইন করা হোক। ডুয়েলগেজ নয়। ডাবল লাইন হলে বর্তমান প্রাক্কলিত ব্যয়ের (৯ হাজার ১০০ কোটি টাকা) চেয়ে ২৫ শতাংশেরও কম ব্যয় বাড়বে। ডাবল লাইন হলে ওই পথে প্রায় অর্ধশত ট্রেন পরিচালনা সম্ভব হবে। এটি হবে রেলের সবচেয়ে লাভজনক রুট।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ে পরিকল্পনা দপ্তরের এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, শুরুতেই প্রকল্পটি ডাবল লাইনে নির্মাণ করার জোর দাবি জানিয়ে আসছিল রেল এবং উত্তরবঙ্গের সাধারণ মানুষ। কিন্তু ওই সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, রেলপথমন্ত্রী ও সচিবদের চাপে ডুয়েলগেজ লাইন প্রকল্প নির্মাণের কাজ শুরু হয়।
ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি) অর্থায়নে চলা ওই প্রকল্প শুরুতেই ধাক্কা খায়। প্রকল্পটি ৪ বছরে সমাপ্ত হওয়ার কথা থাকলেও একের পর এক মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানোর কারণে ৭ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি। মূল অনুমোদিত প্রাক্কলনের মধ্যে এলওসির ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৭৯ মিলিয়ন ডলার, যা বৃদ্ধি পেয়ে ৬৭৯ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছে। অতিরিক্ত ঋণের বিষয়ে ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হলেও ভারত কোনো সঠিক উত্তর দেয়নি। এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘এলওসি’র অর্থায়নে এ প্রকল্প আর হচ্ছে না। এটা বাতিল করা হয়েছে। নতুন করে বিকল্প অর্থায়ন খোঁজা হচ্ছে।
বগুড়া শহরে বসবাসরত ব্যাংকার মিজানুর রহমান বলেন, উত্তরবঙ্গ মূলত কৃষিপ্রধান অঞ্চল। শুকনা মরিচ, পাট, ধান, সবজি, আলু ও ভুট্টার মতো ফসলের বিশাল উৎপাদন হয় এই অঞ্চলে। নতুন ডাবল রেললাইন হলে এগুলো স্বল্প খরচে, স্বল্পসময়ে ঢাকায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে। এ অঞ্চলে গড়ে উঠছে ছোট-বড় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। টেক্সটাইল শিল্প, অটোমোবাইল ইত্যাদি। এ রেল রুট শিল্পকারখানার কাঁচামাল আমদানি ও পণ্য পরিবহণ সহজ করে দেবে, যা বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে। এছাড়া বগুড়ার মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারসহ উত্তরবঙ্গে অনেক ঐতিহাসিক স্থান রয়েছে, যেখানে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আগমন বাড়ছে।
সর্বশেষ পিডিপিপির ওপর প্রকল্প যাচাই কমিটির সভা ও সিদ্ধান্ত সূত্রে জানা যায়, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এ প্রকল্পে প্রায় ৬ বছর টাকা দেয়নি ভারত। রেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে বিবেচিত এ প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশেষ বিবেচনায় অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন করে বিকল্প অর্থায়নে এগিয়ে আসছে এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি)।
আরও কয়েকটি দেশ ঋণ প্রদানে এগিয়ে আসছে বলে জানিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। বর্তমান প্রকল্প অনুযায়ী মেইন লাইন ৯৫.০৬ কিলোমিটার এবং লুপস অ্যান্ড ইয়ার্ড হবে ৩৭.৪৯ কিলোমিটার রেলপথ। ২টি মেজর ব্রিজ-করতোয়া ও ইছামতী নদীর ওপর নির্মিত হবে। এছাড়া মাইনর ব্রিজ ২৫টি, বক্স কালভার্ট ৯১টি, রোড ওভারপাস ১টি, রেল ফ্লাইওভার ১টি এবং রোড আন্ডারপাস হবে ১টি। নতুন করে ৮টি স্টেশন নিমাণ হবে। স্টেশনগুলো-সিরাজগঞ্জ জংশন, কৃষ্ণদিয়া, রায়গঞ্জ, চান্দাইকোনা, ছোনকা, শেরপুর, আরিয়া বাজার ও রানীরহাট। এছাড়া বিভিন্ন ক্যাটাগরির লেভেল ক্রসিং গেট নির্মাণ হবে ১০৬টি। ১১টি স্টেশনে কম্পিউটার বেজড সিগন্যালিং সিস্টেম স্থাপিত হবে।
রেলওয়ে পরিকল্পনা, অপারেশন ও পরিবহণ দপ্তর সূত্রে জানা যায়, এ রেলপথটি নির্মাণ হলে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সাধারণ মানুষ কম ভাড়া, কম সময়ের মধ্যে রাজধানীতে আসা-যাওয়া করতে পারবে। রুটটি ঢাকার সঙ্গে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ‘আর্থসামাজিক করিডর’ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হবে। ইতোমধ্যে ডাবল লাইন যমুনা রেলসেতু দিয়ে ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছে। বগুড়া চেম্বার অব কমার্স সূত্র বলছে, এ রুটে ডাবল লাইন হলে উত্তরাঞ্চলের অন্তত ৮টি জেলা সরাসরি উপকৃত হবে।
প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো. মনিরুল ইসলাম ফিরোজী যুগান্তরকে বলেন, প্রকল্পটি এ মুহূর্তে রেলের জন্য বিশেষ অগ্রাধিকার প্রকল্প। আমরা ডাবল লাইনের অনুযায়ী জায়গা অধিগ্রহণ করছি। অধিগ্রহণ প্রায় শেষ পর্যায়ে। আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত। অর্থায়ন নিশ্চিত হলেই টেন্ডার প্রক্রিয়ার দিকে যাব।
রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মো. নাজমুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, রেলে আয় বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। ডাবল লাইন নির্মাণ মানেই চলমান ট্রেনের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণের বেশি ট্রেন পরিচালনা করা।
রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ফরিদ উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন এ রুট বাস্তবায়িত হলে পুরো পশ্চিমাঞ্চল রেলে আমূল পরিবর্তন আসবে। আর ডাবল লাইন নির্মিত হলে পালটে যাবে গোটা উত্তরবঙ্গের চিত্র। যাত্রী ও মালামাল পরিবহণে রেলের আয় বাড়বে লাফিয়ে।
রেলওয়ে মহাপরিচালক প্রকৌশলী আফজাল হোসেন বলেন, সিরাজগঞ্জ-বগুড়া রেলপথ বাস্তবায়নে আমরা সর্বোচ্চ কাজ করছি। আশা করছি, বিকল্প অর্থায়নের মাধ্যমে এ প্রকল্পটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারব।
