যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ
অধিদপ্তরের ভেতর থেকেই প্রশ্নফাঁস
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
২৪২ জন উপজেলা সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জড়িতদের খুঁজে বের করতে গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে। কমিটির সদস্য যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মিজানুর রহমান জানান, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় তিনি বিব্রত। বুঝতে পারছেন না কীভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস হলো। তিনি জানান, শুক্রবার রাতে প্রশ্নপত্র তৈরির সময় তারা সবাই একসঙ্গে ছিলেন। অফিসে অন্য কেউ সেখানে ছিল না। তাহলে কারা করল এটি? সংশ্লিষ্টদের ধারণা, প্রশ্নফাঁস হয়েছে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ভেতর থেকেই। এ ঘটনায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ১৮-২০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন সন্দেহের তালিকায়। টাকার বিনিময়ে টার্গেটকৃত প্রার্থীদের পাশ করাতে পরীক্ষার আগেই তাদের হাতে প্রশ্ন তুলে দেন অধিদপ্তরের ওই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সেখান থেকেই সবার হাতে হাতে প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে পড়ে।
তিন কর্মদিবসের মধ্যে কমিটি তাদের প্রতিবেদন দাখিলের পর জড়িতদের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
অন্যদিকে শিক্ষিত বেকার যুবকদের কাছে সোনার হরিণ সরকারি এই চাকরির পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসে আর কেউ জড়িত আছে কি না, তা নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা। সূত্র জানায়, পরীক্ষার দুদিন আগে একটি প্রভাবশালী মহল থেকে কিছু চাকরিপ্রার্র্থীকে বাছাই ও লিখিত পরীক্ষায় পাশ করানোর প্রক্রিয়া ছিল-এমন অভিযোগের সত্যতা আছে কি না, তা নিয়ে চলছে গোয়েন্দা তদন্ত।
তদন্তের বিষয়ে কমিটির সভাপতি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মাহফুজুল আলম খান যুগান্তরকে বলেন, কমিটি ঘটনার একধিক স্থান পরিদর্শন করেছে। প্রশ্নপত্র ছাপানোর সময় উপস্থিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা হয়েছে। যা পেয়েছি, তা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। আশা করি, সময়মতো প্রতিবেদন দাখিল করতে পারব।
সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া যুগান্তরকে বলেন, ‘প্রশ্নফাঁস ও টাকার বিনিময়ে প্রশ্ন বিক্রি ফৌজদারি অপরাধ। ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের আইনগত এখতিয়ার পুলিশ বা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক)। তারা তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা ও চার্জশিট দাখিল করবে। যে অপরাধী প্রমাণিত হবে, তার শাস্তি হবে। সরকার তাৎক্ষণিকভাবে যে কমিটি করেছে, সে কমিটি তদন্ত করে শুধু প্রশাসনিক কিছু শাস্তির সুপারিশ করবে। এটা তেমন কোনো মজবুত কোনো উদ্যোগ না।’ তিনি আরও বলেন, ‘ফৌজদারি অপরাধে যদি মামলা না হয়, তাহলে বুঝতে হবে ঘটনার সঙ্গে আমলাদের কেউ জড়িত রয়েছেন।’
সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হবে ২৪২ জনকে। এ পদে আবেদন করেছেন ৩ লাখ ১৯ হাজার। রাজধানীতে ৯৮টি কেন্দ্রে শনিবার বাছাই পরীক্ষার আয়োজন করা হয়েছিল। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাওয়ায় শেষ মুহূর্তে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। এতে বিপদে পড়েন পরীক্ষা দিতে আসা চাকরিপ্রার্থীরা। তারা এ ঘটনার প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু করেন।
এদিকে প্রশ্নফাঁসের বিষয়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর এবং একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যুগান্তরের এ প্রতিবেদকের কথা হয়। তারা জানান, এর পেছনে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের ঘটনা থাকতে পারে। পছন্দের প্রার্থীকে পাশ করিয়ে আনতে তাদের কাছে আগের রাতে প্রশ্নপত্র পৌঁছে দেওয়া হয় বলে জানান তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, নিরপেক্ষ তদন্ত হলে সব বেরিয়ে আসবে। তবে প্রশ্ন হলো-নিরপেক্ষ তদন্ত হবে কি না।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উপজেলা সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে প্রথম নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি হয় বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর। নানা কারণে এ নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। বিএনপি সরকার আসার পর ২০ মে আগের বিজ্ঞপ্তি সংশোধন করে নতুন বিজ্ঞপ্তি জারি করে।
যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে শুক্রবার রাতে রাজধানীর মতিঝিলের জীবন বীমা টাওয়ারে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ভাড়া অফিসের চতুর্থ তলায় প্রশ্নপত্র তৈরি করা হয়। সেখানেই রাত সাড়ে ১০টা থেকে প্রশ্নপত্র ছাপানো শুরু হয়। শেষ হয় শনিবার সকাল ৯টায়। প্রশ্নপত্র তৈরি ও ফটোকপি করার সময় কমিটির পাঁচজন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। প্রশ্নপত্র টাইপ করা ও ফটোকপি করার জন্য তাদের সঙ্গে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ১৮ থেকে ২০ জন কর্মচারী ছিলেন। রোববার তদন্ত কমিটির সদস্যরা রাজধানীর মতিঝিলে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে সরেজমিন পরিদর্শন করে তথ্য সংগ্রহ করেছেন।
তদন্ত কমিটির এক সদস্য জানান, এ নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি, ছাপা ও বিতরণের বিষয়গুলো তদন্তের আওতায় আসবে। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কার্যালয় ঘিরে তদন্তে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে নিয়োগ প্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়ার পর ৫ জুলাই যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক গাজী মো. সাইফুজ্জামানকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যুক্ত করা হয়। একই দিন অধিদপ্তরে নতুন মহাপরিচালক নিয়োগ পান দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক মোতাহার হোসেন। এছাড়া যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে বদলি করা হয় যুগ্মসচিব ডিএম আতিকুর রহমানকে। তিনি নির্বাচন কমিশনে ছিলেন।
এদিকে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, স্থগিত হওয়া উপজেলা সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগ পরীক্ষা ১৬ অক্টোবর শুক্রবার বিকাল ৩টায় নেওয়ার তারিখ ও সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। পরীক্ষার্থীদের এসএমএস-এর মাধ্যমে বিষয়টি জানানো হবে। এ পরীক্ষা নেওয়ার জন্য জন্য পাঁচ সদস্যের একটি বিভাগীয় নিয়োগ কমিটি (ডিপিসি) করা হয়েছে। এ কমিটির সভাপতি করা হয় ডিএম আতিকুর রহমানকে। সদস্য সচিব করা হয় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রশাসন) আতিকুর রহমানকে। কমিটির অন্য তিন সদস্য হলেন-যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মিজানুর রহমান, সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) একজন সদস্য ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন সদস্য।
