Logo
Logo
×
   

সাহিত্য সাময়িকী

শতবর্ষে মুসলিম সাহিত্য সমাজ

Icon

আহমেদ বাসার

প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

শতবর্ষে মুসলিম সাহিত্য সমাজ

বাঙালি মুসলমানদের বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার ইতিহাস খুব একটা দীর্ঘ নয়। ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজির বাংলা জয়ের মধ্য দিয়েই এ অঞ্চলে মুসলমানদের অগ্রযাত্রা সূচিত হয়েছিল। পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর ইংরেজদের হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত হলে মুসলমানরা ধীরে ধীরে নিজেদের গুটিয়ে নিতে থাকে। ধর্মীয় আবেগে আত্মবিভোর থেকে রাষ্ট্রীয় সব কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। ইংরেজি শিক্ষাও তারা একই কারণে প্রত্যাখ্যান করে। ফলে সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে তারা ছিটকে পড়ে। এ শূন্যস্থান পূরণ করে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়। তারা ইংরেজদের খুব কাছাকাছি চলে আসে। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে তারা সম্মানজনক পদ-পদবি লাভ করে। পাশাপাশি চিন্তা ও চেতনাগত দিক থেকে তাদের অগ্রগতিও ত্বরান্বিত হয়। ফলে উনিশ শতকে বাংলার রেনেসাঁস সংঘটিত হলেও বাঙালি মুসলমানদের তা খুব একটা স্পর্শ করেনি। বাঙালি মুসলমানরা রেনেসাঁর চেতনায় উজ্জীবিত হয় ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর। আরও স্পষ্টভাবে বললে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে ১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর। সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হল (বর্তমানে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল)-এর ছাত্র সংসদের অফিসকক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জন্ম লাভ করে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’। অনুষ্ঠানটির সভাপতিত্ব করেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ (বর্তমান ঢাকা কলেজ)-এর কয়েকজন ছাত্র-শিক্ষকের প্রচেষ্টায় যাত্রা শুরু করেছিল মুসলিম সাহিত্য সমাজ। মুসলিম সাহিত্য সমাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা হলেন মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক (১৮৬০-১৯৩৩), আবুল হুসেন (১৮৯৬-১৯৩৮), কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০), কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১), আবুল ফজল (১৯০৩-১৯৮৩), মোতাহের হোসেন চৌধুরী (১৯০৩-১৯৫৬), আবদুল কাদির (১৯০৬-১৯৮৪) প্রমুখ। মুসলিম সাহিত্য সমাজের আগে কলকাতায় হিন্দু মনীষীদের তৎপরতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’ (১৮৯৪)। সেখানে মুসলমানদের উপস্থিতি ছিল নগণ্য। এর প্রতিক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’ (১৯১১)। কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত এ সংগঠনটি সম্পর্কে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘ইংরেজি ১৯১০ সালে আমি বি. এ পাশ করি। ওই সময় কলকাতায় কয়েকটি উৎসাহী যুবকের সঙ্গে আমার যোগাযোগ স্থাপিত হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক, মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরী, মঈনুদ্দীন হুসায়ন প্রভৃতি। সবার মধ্যে জ্বলন্ত উৎসাহী ছিলেন মৌলভী মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক। আমরা কয়েকটি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভ্য ছিলাম। সেখানে হিন্দু-মুসলমান কোনো ভেদ না থাকলেও আমাদের সাহিত্যিক দারিদ্র্যের দরুন আমরা বড়লোকের ঘরে গরিব আত্মীয়ের মতো মন-মরা হয়ে তার সভায় যোগদান করতাম। আমাদের মনে হলো বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সঙ্গে সম্বন্ধ বিচ্ছেদ না করেও আমাদের একটি নিজস্ব সাহিত্য সমিতি থাকা উচিত।’ তার এ মন্তব্য থেকে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ প্রতিষ্ঠার তাগিদ ও প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে ধারণা পাওয়া যায়। মুসলিম সাহিত্য সমাজ যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখনো বাঙালি মুসলমানরা ছিলেন চিন্তা-চেতনায় যথেষ্ট অনগ্রসর ও গোঁড়া প্রকৃতির। প্রগতিশীল বহু লেখক ও অগ্রসর মানুষদের পদে পদে হেনস্তার শিকার হতে হতো। সংগঠনটির অন্যতম কারিগর আবুল হুসেনকেও কম বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হয়নি। তার বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে ১৯২৯ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার নবাব বাড়িতে বিচার সভার আয়োজন করা হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলমান ছাত্রী ফজিলাতুন্নেছা জোহা শাড়ি পরে ক্লাস করতে এলে আড়াল থেকে তার দিকে ঢিল ছুঁড়ে মারা হতো। এ পরিপ্রেক্ষিতে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন শুরু করে। সংগঠনটির বার্ষিক মুখপত্র ছিল শিখা পত্রিকা। পত্রিকাটির মটো ছিল-‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’। ১৯২৭ সাল থেকে টানা পাঁচ বছর পত্রিকাটির প্রকাশ অব্যাহত থাকে। আবুল হুসেন, কাজী মোতাহার হোসেন, আবদুর রশীদ ও আবুল ফজল পর্যায়ক্রমে পত্রিকাটি সম্পাদনা করেন। মুসলিম সাহিত্য সমাজের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে শিখা পত্রিকার পঞ্চম বর্ষের সংখ্যায় বলা হয়েছে ‘সত্যপ্রীতি ও সাহিত্যচর্চা’। সাধারণত সাহিত্য সমাজের সভায় পঠিত প্রবন্ধগুলোই পত্রিকায় প্রকাশিত হতো। শিখা পত্রিকা সম্পর্কে আবুল ফজল বলেছেন, ‘শিখার টাইটেল পৃষ্ঠায় একটি ক্ষুদ্র রেখাচিত্র ছিল, শুনেছি তা-ও এঁকেছিলেন আবুল হুসেন সাহেব। একটি খোলা কুরআন শরিফ-মানব বুদ্ধির আলোর স্পর্শে কুরআনের বাণী প্রদীপ্ত হয়ে উঠেছে, এ ছিল রেখাচিত্রটির মর্ম। কিন্তু এর একটা কদর্থ বের করতে বিরুদ্ধবাদীদের বেগ পেতে হয়নি। তারা এর অর্থ রটালেন মুসলিম সাহিত্য সমাজের সমর্থকরা কুরআনকে পুড়িয়ে ফেলে শুধু মানব বুদ্ধিকেই দাঁড় করাতে চাচ্ছে। বলাই বাহুল্য, গোড়া থেকেই গোঁড়ারা মুসলিম সাহিত্য সমাজের বিরোধী ছিল।’

মুসলিম সাহিত্য সমাজ ও কল্লোল গোষ্ঠী প্রায় সমসাময়িক। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা গোঁড়া পশ্চাৎপদ ভাবনা থেকে সরে এসে আধুনিক চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। সাহিত্য সমাজের অন্যতম ব্যক্তিত্ব আবুল হুসেন ‘বাঙালি মুসলমানের শিক্ষা সমস্যা’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘কেন মুসলমানের এই দুর্গতি? এ প্রশ্নের উত্তর এককথায় দিতে গেলে বলতে হবে আমাদের শিক্ষা নাই- জ্ঞানের সঙ্গে বহুদূর ক্ষতি ও বিরোধ করে বসেছি এবং বিজ্ঞান ও আর্টকে আমাদের শিক্ষা কেন্দ্র হতে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছি-এই ভয়ে, পাছে তাতে আমাদের ধর্ম নষ্ট হয়।’ এ থেকে তৎকালীন সামাজিক চিন্তাপ্রবাহের চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

নারী স্বাধীনতার বিষয়েও তারা ছিলেন সচেতন। হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের নারীরা মুসলিম সাহিত্য সমাজ ও শিখা পত্রিকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তারা বিভিন্ন কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণও করতেন। বিশেষ করে প্রবন্ধ পাঠ ও সংগীত পরিবেশনে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। সাহিত্য সমাজের অধিবেশনে যেসব নারী প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ফজিলাতুন্নেছা, ফাতেমা খানম, বেগম শামস-উন-নাহার, খুরশীদ জাঁহান বেগম, সুজাতা রায়, করুণাকণা গুপ্তা প্রমুখ। এছাড়া সংগীত পরিবেশন করেছিলেন ঊষাতারা ভট্টাচার্য, সরমা বসু, যূথিকা রায়, প্রতিভা সোম, রমা নাগ, জিয়াউন্নাহার প্রমুখ। সমাজের প্রতিক্রিয়াশীল অংশ ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ এর বিরোধিতায় মশগুল ছিল। এদের হাতেই এক সময় নিগৃহীত হয়েছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাকে কাফের আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ এর এক সভায় এসে এ বিষয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আজ আমি দেখছি এখানে মুসলমানের নতুন অভিযান শুরু হয়েছে। আমি এই বার্তা চতুর্দিকে ঘোষণা করে বেড়াব। আর একটা কথা-এতদিন মনে করতাম আমি একাই কাফের, কিন্তু আজ দেখে আমি আশ্বস্ত হলাম, মৌলভী আনোয়ারুল কাদির প্রমুখ কতগুলো গুণী ব্যক্তি দেখছি আস্ত কাফের। আমার দল বড় হয়েছে, এর চেয়ে বড় সান্ত্বনা আর আমি চাই না। ‘কবিতা ও গানে নজরুল সাহিত্য সমাজের আসর মাতিয়ে তুলেছিলেন। খুবই ব্যতিক্রম হিসাবে নজরুলের দুটি গান শিখা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। ‘খোশ আমদেদ’ ও ‘নতুনের গান’ শিরোনামের গানগুলো হলো যথাক্রমে-আসিলে কে গো অতিথি উড়ায়ে নিশান সোনালি এবং চল্ চল্ চল্ / ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল। বলাই বাহুল্য দুটি গানই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

১৯২৬-১৯৩৮ সাল পর্যন্ত বারো বছর ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ এর কার্যক্রম সচল ছিল। স্বল্পায়ু হলেও এ প্রতিষ্ঠানটি বাঙালি মুসলমানের চিন্তা জগতে প্রবলভাবে ধাক্কা দিতে সক্ষম হয়েছিল। বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে জিজ্ঞাসু মনোভাব তৈরিতে এ সংগঠনটির প্রভাব ছিল অপরিসীম। সংগঠনটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কাজী মোতাহার হোসেনের বক্তব্যে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে-‘আমরা চক্ষু বুজিয়া পরের কথা শুনিতে চাই না, বা শুনিয়াই মানিয়া লইতে চাই না। আমরা চাই চোখ মেলিয়া দেখিতে, সত্যকে জীবনে প্রকৃতভাবে অনুভব করিতে। আমরা কল্পনা ও ভক্তির মোহ আবরণে সত্যকে ঢাকিয়া রাখিতে চাই না। আমরা চাই জ্ঞান-শিখা দ্বারা অসার সংস্কারকে ভস্মীভূত করিতে এবং সনাতন সত্যকে কুহেলিকামুক্ত করিয়া ভাস্বর ও দীপ্তিমান করিতে। আমরা ইসলামের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করিতে চাই না। আমরা চাই বর্ত্তমান মুসলমান সমাজের বদ্ধ-কুসংস্কার এবং বহুকাল সঞ্চিত আবর্জ্জনা দূর করিতে।’

মুসলিম সাহিত্য সমাজের সঙ্গে শুধু মুসলমানরাই সংশ্লিষ্ট ছিলেন এমনটা নয়। তৎকালীন ভিন্ন ধর্মের বহু গুরুত্বপূর্ণ লেখক ও চিন্তক এ সংগঠনটির সভায় উপস্থিত থাকতেন। শিখা পত্রিকার লেখক তালিকায়ও তারা যুক্ত ছিলেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য-শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, মোহিতলাল মজুমদার, রমেশচন্দ্র মজুমদার, বিপিনচন্দ্র পাল প্রমুখ। মুসলিম সাহিত্য সমাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা ধার্মিক ছিলেন, তবে ধর্মান্ধ ও গোঁড়া ছিলেন না। তারা একটি অসাম্প্রদায়িক সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন। হিন্দু-মুসলমানের সত্যিকার মিলনের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল সংগঠনটি। মুসলিম সাহিত্য সমাজ প্রতিষ্ঠার একশ বছর পরে এসেও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারেনি। শিখা গোষ্ঠীর চিন্তা ও রচনাশৈলীর সম্ভাবনাও পুরোপুরি বিকশিত হয়নি।

শতবর্ষ আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে যে আলোকবর্তিকা জ্বলে উঠেছিল তার শিখা কিছুটা স্তিমিত হলেও একেবারে নির্বাপিত হয়নি। আমাদের ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার সংগ্রাম ও সর্বোপরি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে মুসলিম সাহিত্য সমাজ ও শিখা পত্রিকার চেতনা প্রগাঢ় প্রভাব ফেলেছে। এ চেতন্ইা জন্ম দিয়েছে বাংলাদেশ ভূখণ্ডের অস্তিত্ব। আমাদের সামাজিক ও সাহিত্যিক বিকাশের জন্য সর্বস্তরে মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রদীপ্ত আলোর ধারা ছড়িয়ে দিতে হবে। যখনই অজ্ঞতার অন্ধকার আমাদের গ্রাস করার জন্য হা-মুখে ধেয়ে আসবে তখনই পূর্বপুরুষদের সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার আমাদের পথ দেখাবে।

মুসলিম সাহিত্য সমাজ একশ বছর ধরেই বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে প্রবলভাবে প্রশংসিত হয়েছে। চিন্তা ও রচনাশৈলীর দিক থেকে এদের প্রভাববলয়ে থাকা পরবর্তী প্রজন্মগুলোর লেখক সংখ্যাও যথেষ্ট। তবে যে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পরবর্তী বিশ্লেষকরা এ গোষ্ঠীর তৎপরতা ও রচনার পর্যালোচনা করেছেন, তাতে বেশ কতকটা পুনরাবৃত্তি ও সীমাবদ্ধতা লক্ষ করা যায়। বস্তুত প্রধান দুটি বর্গে আমরা এসব বিচার ও মূল্যায়নকে বিন্যস্ত করতে পারি। দুটিই অবশ্য পরস্পরের পরিপূরক। প্রথমটি হলো, বৃহত্তর অর্থে বাঙালি মুসলমান সমাজের আধুনিকায়নের দিক; আর দ্বিতীয়টিকে বলতে পারি, ওই আধুনিকায়নের অভিমুখে খাপ খায় না-এমন পক্ষগুলোর সঙ্গে তাদের বিরোধের দিক। দুটিই খুব গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহ নেই। তবে এ প্রবণতার ফলে দুটি বড় ক্ষতিও হয়েছে। একদিকে পদ্ধতিগত পর্যালোচনার বদলে শিখাগোষ্ঠীর চর্চাকে আদর্শ ধরে নিয়ে কাজ করার ফলে পুনরাবৃত্তি ঘটেছে প্রচুর; অন্যদিকে আরও বিপুল ক্ষেত্রে তাদের রচনা ও তৎপরতার বিচার-বিশ্লেষণ যেভাবে আমাদের সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসকে আলোকিত করতে পারত, সে সুযোগ অনেকটাই অব্যবহৃত থেকে গেছে।

মোহাম্মদ আজম

লেখক, মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমি

উনিশ শতকের শেষদিকে ঢাকাকেন্দ্রিক শিক্ষিত মুসলমান সমাজের প্রচেষ্টায় ‘সমাজ সম্মিলনী’ (১৮৭৯) ও ‘ঢাকা মুসলমান সুহৃদ সম্মিলনী’র (১৮৮৩) ধারাবাহিকতায় ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ জানুয়ারি ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’-এর প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার পেছনে বুদ্ধিবৃত্তিক একটি কর্মযজ্ঞ যুক্ত ছিল। তরুণ গবেষক ও শিক্ষকরা এর প্রাণ প্রতিষ্ঠায় সেদিন জ্ঞান, বুদ্ধি, যুক্তি, মুক্তিকে হাতিয়ার হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন। সংগঠনটি মুসলমানদের শিক্ষা, সাহিত্য, আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চর্চায় নতুনভাবে বিশ্লেষণের প্রয়াস পেয়েছিল। এটা নিছক বা ভুঁইফোঁড় কিংবা গতানুগতিক কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। উভয় বাংলার হিন্দু-মুসলিম প্রগতিশীল চিন্তক ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানকে সংগঠনটি আক্ষরিক অর্থে নাড়া দিয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির প্রাণপুরুষ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষক আবুল হুসেন (১৮৯৭-১৯৩৮)। অন্যদের মধ্যে ছিলেন কাজী আনোয়ারুল কাদীর (১৮৮৭-১৯৪৮), কাজী আবদুল ওদুদ (১৯৮৪-১৯৭০), কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১), মোতাহের হোসেন চৌধুরী (১৯০৩-১৯৫৬), আবুল ফজল (১৯০৩-১৯৮৩), আবদুল কাদির (১৯০৩-১৯৮৪) প্রমুখ। তারা প্রত্যেকেই মুসলিম সমাজকে অজ্ঞতা-কুসংস্কারের অভিশাপ থেকে পরিত্রাণের চেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আজ মুসলমানদের আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চা বিশেষ করে নারী শিক্ষার অগ্রগতির পেছনে ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’-এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। সংগঠনটির সম্মোহনী শক্তি এতটা দৃঢ় ও গভীর ছিল, এর বার্ষিক অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১), শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬-১৯৩৮) ও কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) প্রমুখের মতো বিখ্যাত মনীষীরা আমন্ত্রিত হয়েছেন। এক দশকের কিছু বেশি সময় সংগঠনটি সক্রিয় থাকলেও তার প্রভাব মুসলিম সমাজ মানসে এখনো অক্ষুণ্ন রয়েছে। সংগঠনটির মুখপত্র ছিল ‘শিখা’ (১৯২৭) নামক পত্রিকা, যার স্লোগান ছিল ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’। মাত্র পাঁচটি সংখ্যা (১৯২৭-১৯৩৩) প্রকাশিত হলেও স্বল্পায়ু এ পত্রিকার অন্তর্নিহিত কার্যশক্তি মুসলমানদের মনন পরিশীলনে গভীর ভূমিক রেখেছে। শত বছর ধরে ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’-এর প্রভাব বাঙালি মুসলমান সমাজকে বিকশিত হতে নানাভাবে সহায়তা করেছে।

ড. মো. রিজাউল ইসলাম

অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, বাংলা বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

তাবৎ পৃথিবীতেই আধুনিকতার ইতিহাস এবং ধর্মের সঙ্গে মানুষের বোঝাপড়ার ইতিহাস সমান বয়সি। ইউরোপে এ ঘটনাটা ঘটেছে পঞ্চদশ শতকে। বাঙালি হিন্দু জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ ব্যাপারটা ঘটেছে উনিশ শতকে। এ কারণে উনিশ শতক ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন, সমাজসংস্কার আন্দোলন, বাহাস-বিতর্ক আর পত্রপত্রিকার একটা জমাট কোলাহল তৈরি হয়েছিল বাঙালি হিন্দু সমাজে।

বাঙালি মুসলমান এ মোকাবিলায় শামিল হয়েছে সংগত কারণেই আরও পরে, ঘোষিতভাবে বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে। ১৯২৬ সালে মুসলিম সাহিত্য সমাজ নামে একটি সংগঠনের কিছু সভ্য, যাদের একটা বড় অংশ শিক্ষক, বোধ করেছেন যে, ধর্মীয় গোঁড়ামি আর সম্মোহন বাঙালি মুসলমান সমাজকে আধুনিক জীবন ও সাহিত্যের জগতে প্রবেশের পথে বড় অন্তরায় হিসাবে কাজ করছে। একে মোকাবিলা করা দরকার। তারা ধর্মকে আধুনিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের মাধ্যমে মাটির পৃথিবীতে নামিয়ে আনার তাগিদ অনুভব করেছিলেন। ইউরোপের বিবর্তনের ইতিহাস সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, প্রতিবেশী হিন্দু সমাজের আধুনিকায়নে বিমুগ্ধ এ সভ্যরা মনে করেছিলেন ধর্মকে মানুষের যাপিত জীবনের মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো নামিয়ে আনা দরকার। নতুবা এ জনগোষ্ঠীর অগ্রগতি সম্ভব নয়। এ চিন্তা প্রকাশের জন্য তারা ‘শিখা’ নামে একটি পত্রিকাও প্রকাশ করতেন। উনিশ শতকে হিন্দু সমাজে ইয়ং বেঙ্গলের যে ভূমিকা বিশ শতকে বাঙালি মুসলমান সমাজে মুসলিম সাহিত্য সমাজের সেই ভূমিকা বলে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন। তবে মনে রাখতে হবে, মুসলিম সাহিত্য সমাজের ভূমিকার পটভূমিটা দীর্ঘদিন ধরে তৈরি করেছেন বিচিত্র বাঙালি মুসলমান সাহিত্যিক ও চিন্তক। এ তালিকা দীর্ঘ হবে।

কিন্তু একথা বলতেই হবে, বাঙালি মুসলমান সমাজকে আধুনিকতার পাটাতনে নিয়ে আসার সাধনায় মশগুল মুসলিম সাহিত্য সমাজের লেখক-চিন্তকগোষ্ঠীটি উনিশ শতকের রেনেসাঁসের বরপুত্রদের মতোই ছিল বৃহত্তর সমাজ থেকে অনেক দূরে; ইউরোপীয় শিক্ষায় শিক্ষিত। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে এ আন্দোলনের সংযোগ সীমিত ছিল বলে তাদের প্রচেষ্টার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হয়নি। তবে এ কথা সত্য যে, বাঙালি মুসলমান সমাজের আধুনিক সাহিত্য ও জীবনে প্রবেশের প্রথম দরজাটা নির্মিত হয়েছিল সেই ১৯২৬ সালে মুসলিম সাহিত্য সমাজের ভেতর দিয়ে। তাই এ সংগঠন ও এর সঙ্গে যুক্ত মনীষীদের গুরুত্ব ১০০ বছর পরও অনুভূত হয়।

কুদরত-ই-হুদা

লেখক, বিশেষজ্ঞ, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .