পূর্ববঙ্গের ভাষা : পর্ব ১০
ভাষারীতি ও সুনীতিকুমার
Advertisement
সালেহ মাহমুদ রিয়াদ
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাঙলা ভাষার উদ্ভব, বিকাশ, ব্যাকরণ, প্রকরণ ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট বহু বিষয় নিয়া সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় অত্যন্ত সারগর্ভ ও জ্ঞানগর্ভ গবেষণা করিয়াছেন। বাঙলাভাষা নিয়া বিস্তারিত অনুসন্ধানে তাঁহার ন্যায় মনীষার কোনো জুড়ি নেই; ইহা এক সর্বজনস্বীকৃত সত্য। বলিতে গেলে সুনীতিকুমার বাংলা ভাষাতত্ত্বের আধুনিক ভিত্তি একাই গড়িয়া তুলিয়াছেন। সুতরাং, ভাষারীতি প্রশ্নে তাঁহার অভিমত আমাদের নিকট বিশেষ মূল্য বহন করে। সাধু ও চলিতরীতির কথা বেশ জোরেশোরে সামনে আসিলে তিনি বিচলিত বোধ করেন এবং এ বিষয়ে তাঁহার সুচিন্তিত মতামত তুলিয়া ধরেন। সাধুভাষা সম্পর্কে তিনি বলেন:
‘বাঙ্গলা সাধু-ভাষা ধীরে ধীরে গড়িয়া উঠিয়াছে, ইহা এখনকার ‘পশ্চিম-বঙ্গ’- ও ‘বাংলা দেশ’-নিবাসী দশ [এগারো] কোটির ওপর সমগ্র বঙ্গ-ভাষী জনগণের মাতৃভাষা বিভিন্ন কথ্য ভাষা, বেশ জোরের সঙ্গে বিদ্যমান থাকিলেও, সেগুলিকে এক সাধারণ ভাষার গণ্ডির মধ্যে সাধু-ভাষার-সূত্রে গাঁথিয়া রাখিয়াছে। এই যোগসূত্রকে ছিন্ন করিয়া দিলে ভাষার রাজ্যে ঐক্য-বোধ নষ্ট হইয়া যাইবে। বহু পূর্বে এইভাবে ঢাকার বাঙ্গলা ও কলিকাতার বাঙ্গলাকে পৃথক করিয়া বাঙ্গলা-ভাষী জাতির মৌলিক ঐক্য ধ্বংস করিয়া দিবার চেষ্টা হইয়াছিল-লর্ড কার্জনের আয়োজিত Partition of Bengal বা বঙ্গ-ভঙ্গের দ্বারায়।’(সাংস্কৃতিকী: বাঙ্গলা ভাষা সম্বন্ধে কয়েকটি কথা)
অতঃপর মনে হয় সুনীতিকুমার কিছুটা বিব্রত, কিছুটা বিরক্ত এবং কিছুটা ক্রুদ্ধ হইয়া বলিলেন:
“এই দুই প্রকারের (সাধু ও চলিত: লেখকের নোট) বাঙ্গলা পরস্পরবিরোধী ইহা মনে করিয়া, কতকগুলি বঙ্গ-ভাষানুরাগী, আমার মতে, আমাদের প্রাণের চেয়ে প্রিয় মাতৃভাষা বাঙ্গলার ক্ষতি করিবার কাজে নামিয়াছেন। এই দুই প্রকারের বাঙ্গলাকে কি একেবারে পৃথক করা যায়? সাধু-ভাষার রূপ বাদ দিয়া বাঙ্গলা লিখিত ও মৌখিক উভয়-বিধ সাহিত্য রচনা সম্ভবপর? সাধু-ভাষার বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ কেন? বিদ্যাসাগর ও বঙ্কিমের রচনা হইতে সাধু-ভাষার ব্যাকরণসম্মত রূপগুলিকে বর্জন করিয়া, সেগুলির স্থলে অন্য রূপ বসাইয়া দিয়া, বাঙ্গলা-ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক মনীষাকে এইভাবে অপমান করিবার অধিকার কোথা হইতে আসিল?’ (বাঙ্গলা ভাষা সম্বন্ধে কয়েকটি কথা)
পশ্চিমবঙ্গের সরকারি পর্যায় হইতে সাধুভাষাকে ‘সংস্কার’ করিয়া চলিতরূপ প্রদানের একটি অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সুনীতিকুমার উল্লিখিত মন্তব্য করেন। অতঃপর তিনি সাধুভাষা নিয়া তাঁহার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ঘোষণা করিলেন এই একই প্রবন্ধে:
‘সাধু-ভাষা হইতেছে প্রশস্ত রাজমার্গ। ইহার বাক্যরীতি সরল, যুক্তিযুক্ত, বাঙ্গালীর চিন্তাধারার অনুরূপ। ইহাতে কিছু লিখিলে, একটি পরিচ্ছন্ন মনন ও বিচারশীলতার সহায় সহজেই পাওয়া যায়। সাধু-ভাষা এবং কলিকাতার চলিত-ভাষা ও বিভিন্ন অঞ্চলের কথ্য-ভাষার পরস্পরের সম্পর্ক হইতেছে, বাঙ্গলা লোকোক্তি-মতো, ‘চাটাই-বোনা’ সম্পর্ক’’।
বর্ণিত অভিমত প্রকাশের মধ্য দিয়া তিনি সংশয়হীনভাবে প্রমথ চৌধুরীর ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান ঘোষণা করিয়াছেন। আমরা এ কথা সকলেই বিনাপ্রশ্নে স্বীকার করি যে, বাঙলাভাষা নিয়া যে কোন প্রকার জিজ্ঞাসা বা অনুসন্ধানের বেলায় সুনীতিকুমারের স্থান সকলের উপরে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ মনে করেন, তাঁহার ন্যায় ভাষাচার্য বাংলাদেশে দুর্লভ। সুনীতিকুমার কেবল একজন ভাষাবিজ্ঞানী ছিলেন বলিলে তাঁহার প্রকৃত অবস্থান সম্পূর্ণ হয় না; তিনি সমগ্র বাংলাদেশের সকল প্রকার ভাষারীতি, ভাষারূপ প্রভৃতির প্রত্যক্ষ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেন দীর্ঘসময় গভীর মনোযোগ দিয়া। সাধুভাষা ছাড়িয়া চলিত ভাষা ধরিবার পক্ষে ‘আন্দোলনকারীদের’ সম্পর্কে তিনি একটি কৌতূহলজনক সংবাদ দিয়াছেন। ‘বাঙ্গলা ভাষা সম্বন্ধে কয়েকটি কথা’য় ইহার বিবরণ পাওয়া যায়:
“... সারা বাঙ্গলার সমস্ত জেলার ছাত্রদের হাজার হাজার উত্তর-পত্রের খুঁটিনাটি বিচার করিয়া দেখিয়াছি যে, সাধু-ভাষাতে সহজ, সাবলীলভাবে, বিনা আয়াসে সকলেই যেন লিখিতেছে-এবং যেখানেই আধুনিক হইয়া কলিকাতার চলিত-ভাষায় উত্তর রচনা করিবার চেষ্টা করিতেছে, সেখানেই বিপদে পড়িতেছে,- এমনকি কলিকাতা ও ভাগীরথী নদীর তীরের দেশের ছেলেমেয়েরাও। একটা জিনিস দেখিয়া কৌতুক লাগে-অবশ্য তাহার কারণও মনে হয় খুঁজিয়া পাইতেছি,-যাঁহারা এখন বিশেষভাবে কলিকাতার চলিত ভাষায় আকৃষ্ট হইয়াছেন এবং সঙ্গে সঙ্গে সাধু-ভাষাকে বর্জন করিতে চাহিতেছেন, তাঁহাদের অধিকাংশই পূর্ব-বঙ্গের মানুষ। কলিকাতার ভাষায় লিখিয়া তাঁহারা আনন্দ পান, এবং তাঁহারা বোধ হয় চাহেন, ভাষা-বিষয়ে সর্বত্র বাঙ্গলা দেশ একটি Monolithic State (‘একশৈল বা এক-পাথরিয়া প্রদেশ’) হইয়া যাউক-একটি মাত্র কথ্য ও তাহার আধারে স্থাপিত লিখিত ভাষাই সর্বজন-গৃহীত হউক। ইহা-ই যেন তাঁহাদের কাম্য। কিন্তু যেখানে ২/৩ বা ৩/৪ ভাগ (যথাক্রমে দুই-তৃতীয়াংশ এবং তিন-চতুর্থাংশ: লেখকের নোট) বঙ্গ-ভাষী সহজ-ভাবে ঘরে কলিকাতার বাঙ্গলা বলে না, অন্যান্য উপভাষা বলে যেগুলির মধ্যে কতকগুলি আবার উচ্চারণে, ব্যাকরণে, বাগ্ভঙ্গিতে কণ্ঠের স্বরে কলিকাতার ভাষা হইতে নানা ভাবে স্বতন্ত্র, তাহাদের পক্ষে এই-ভাবে অন্য একটি কথ্য ভাষাকে একেবারে নিজের করিয়া লওয়া যে সম্ভবপর নহে, ইহা তাঁহারা বুঝেন না।... অথচ সকলের সম্পত্তি সর্বজন-বোধ্য সাধু-ভাষা ব্যবহারে কোন ঝঞ্ঝাট হয় না’।
আমাদের প্রজ্ঞাশীল পাঠকগণ নিশ্চয়ই তাঁহাদের মননশীল চিন্তা দ্বারা ভাবিয়া দেখিবেন-ভাষারীতি প্রশ্নের উত্তরে মূলকথা সুনীতিকুমার মহাশয় বেশ ভালো রকম যুক্তি দিয়া বলিয়া দিয়াছেন। এবং আমাদের অনেক কথা বলিবার প্রয়োজন মিটাইয়া দিয়াছেন। তিনি আরও একটি অত্যন্ত মূল্যবান সিদ্ধান্ত ঘোষণা করিয়াছেন। ‘সকলের সম্পত্তি সর্বজন-বোধ্য সাধু-ভাষা’-তাঁহার এই কথা অতি সরলভাবে বিবেচনা করিলেই আমাদের বক্ষ্যমাণ নিবন্ধের মুখ্য অভিপ্রায় পূরণ হইয়া যায়। সাধুভাষা দুর্বোধ বলিয়া প্রমথ চৌধুরীর আনীত অভিযোগের যে কোন ভিত্তি নাই-সুনীতিকুমার তাহা সোজা করিয়া বলিয়া দিয়াছেন।
আপনারা অনেকেই বলিতে পারেন যে সকল মনীষীর ভাষা-ভাবনা নিয়া আমরা এতক্ষণ আলোচনা করিলাম, তাঁহারা সকলেই কলিকাতাকেন্দ্রিক ভাবনালোকে বিরাজ করিতেন। সুতরাং, তাঁহাদের চিন্তা ও মানসিকতায়, আবেগ ও বিবেচনায় কলিকাতার প্রভাব ‘প্রবল’ হইয়া থাকিলে উহা নিয়া অতিমাত্রায় সচেতন ও মুখর না হইলেও চলিবে। তাঁহাদের একটি সংখ্যাগুরু অংশ মনে করেন যে, কলিকাতা রাজধানী বলিয়া ইহার ভাষা সর্বজনীন ভাষারূপে আমরা মানিয়া নিতে পারি; কেহ আবার বেশ জোর দিয়াও এই দাবি তুলিয়াছেন। রাজধানী হইলে উহার ভাষাকে সর্বজনমান্য ভাষারূপে মানিয়া নিতে হইবে-এইরূপ অদ্ভুত ধারণার কথা মুষ্টিমেয় কলিকাতার পক্ষেই বলা সম্ভব। আহা, আজ কলিকাতার সেই ‘মনোহর’ ভাষার রূপ কেমন হইয়াছে-তাহা একবার শুনিলে আর কদাচ শুনিবার ইচ্ছা হইবে না। আমরা কোন নগর, শহর, বন্দর, গ্রাম কিংবা গঞ্জের ভাষার স্বভাব-চরিত্র, ভালো-মন্দ ইত্যাদি বিচার করিতে বসি নাই; উহা আমাদের কর্তব্য নহে।
